বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
ঢাকা সময়: ০১:১৮
ব্রেকিং নিউজ

ঢাকায় আওয়ামী লীগের সূচনা পর্ব

ঢাকায় আওয়ামী লীগের সূচনা পর্ব

  • আনিস আহামেদ
খাজা বাড়ির অনেক লোক এদের সাথে ছিল। একজন মন্ত্রীও উপরের তলায় বসে সব কিছু দেখছিলেন, তাঁর দলের কীর্তিকলাপ। আমি এসে দেখলাম, পুলিশ এসে গেছে। ইয়ার মোহাম্মদকে নিয়ে এরা শোভাযাত্রা করে মহল্লায় যেয়ে মুসলিম লীগ অফিস আক্রমণ করল। কারণ লীগ অফিস রায় সাহেবের বাজারেই ছিল। কয়েকজন গুণ্ডা প্রকৃতির লোক এই মহল্লায় ছিল। গু-ামি করত, ছাত্রদের মারত টাকা খেয়ে। তাদের ধরে নিয়ে মহল্লায় বিচার বসল। ঢাকার মহল্লার বিচার ছিল, মসজিদে নিয়ে হাজির করত এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে মারা হত- এটিই হল এদের কোর্টকাচারী। রায় সাহেবের বাজার দিয়ে কোন ছাত্র শোভাযাত্রা বা আমাদের কর্মীদের দেখলে আক্রমণ এবং মারপিট করা হত। অনেক কর্মী ও ছাত্রকে মার খেতে হয়েছে। এই দিনের পর থেকে আর কোনোদিন এই এলাকায় কেউ আমাদের মারপিট করতে সাহস পায় নাই। (পৃষ্ঠা-১৩০, ১৩১)
ইয়ার মোহাম্মদ খানও এরপর থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে শুরু করলেন। তাতে আমাদের শক্তিও ঢাকা শহরে বেড়ে গেল। আমিও মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে একদল যুবক কর্মী সৃষ্টি করলাম। এই সময় সমসাবাদ ও বংশালের একদল যুবক কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করল। সমসাবাদও আরমানিটোলা ময়দানের পাশেই ছিল। আরমানিটোলার সভার বন্দোবস্ত এখন এরাই করতে শুরু করে। ফলে মুসলিম লীগ শত চেষ্টা করেও আর গোলমাল সৃষ্টি করতে পারছিল না আমাদের সভায়।
১১ই অক্টোবর (১৯৪৯ সাল) আরমানিটোলায় বিরাট সভা হল। সমস্ত ময়দান ও আশপাশের রাস্তা লোকে ভরে গেল। শামসুল হক সাহেব বক্তৃতা করার পর আমি বক্তৃতা করলাম। মওলানা পূর্বেই বক্তৃতা করেছেন। আমি শেষ বক্তা। সভায় গোলমাল হবার ভয় ছিল বলে ভাসানী সাহেব প্রথমে বক্তৃতা করেছেন। ভাসানী সাহেব আমাকে বললেন, শোভাযাত্রা করতে হয় সেইভাবে বক্তৃতা কর। আমি বক্তৃতা করতে উঠে যা বলার বলে জনগণকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলাম, “যদি কোন লোককে কেউ হত্যা করে, তার বিচার কি হবে?” জনগণ উত্তর দিল, “ফাঁসি হবে।” আমি আবার প্রশ্ন করলাম, “যারা হাজার হাজার লোকের মৃত্যুর কারণ, তাদের কি হবে?” জনগণ উত্তর দিল, “তাদেরও ফাঁসি হওয়া উচিত।” আমি বললাম, “না, তাদের গুলি করে হত্যা করা উচিত।” কথাগুলি আজও আমার পরিষ্কার মনে আছে। তারপর বক্তৃতা শেষ করে বললাম, “চলুন আমরা মিছিল করি এবং লিয়াকত আলী খান দেখুক পূর্ব বাংলার লোক কি চায়!”
শোভাযাত্রা বের হল। মওলানা সাহেব, হক সাহেব ও আমি সামনে চলেছি। যখন নবাবপুর রেলক্রসিংয়ে উপস্থিত হলাম, তখন দেখলাম পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে বন্দুক উঁচা করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আইন ভাঙবার কোনো প্রোগ্রাম করি নাই। আর পুলিশের সাথে গোলমাল করারও আমাদের ইচ্ছা নাই। আমরা রেল স্টেশনের দিকে মোড় নিলাম শোভাযাত্রা নিয়ে। আমাদের প্ল্যান হল নাজিরাবাজার রেললাইন পার হয়ে নিমতলিতে ঢাকা মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে নাজিমুদ্দীন রোড হয়ে আবার আরমানিটোলা ফিরে আসব। নাজিরাবাজারে এসেও দেখি পুলিশ রাস্তা আটক করেছে, আমাদের যেতে দেবে না। তখন নামাজের সময় হয়ে গেছে। মওলানা সাহেব রাস্তার উপরই নামাজে দাঁড়িয়ে পড়লেন। শামসুল হক সাহেবও সাথে সাথে দাঁড়ালেন। এর মধ্যেই পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছেড়ে দিল। আর জনসাধারণও ইট ছুঁড়তে শুরু করল। প্রায় পাঁচ মিনিট এইভাবে চলল। পুলিশ লাঠিচার্জ করতে করতে এগিয়ে আসছে। একদল কর্মী মওলানা সাহেবকে কোলে করে নিয়ে এক হোটেলের ভিতরে রাখল। কয়েকজন কর্মী ভীষণভাবে আহত হল এবং গ্রেফতার হল। শামসুল হক সাহেবকেও গ্রেফতার করল। আমার উপরও অনেক আঘাত পড়ল। একসময় প্রায় বেহুশ হয়ে একপাশের নর্দমায় পড়ে গেলাম। কাজী গোলাম মাহাবুবও আহত হয়েছিল, তবে ওর হুঁশ ছিল। আমাকে কয়েকজন লোক ধরে রিকশায় উঠিয়ে মোগলটুলী নিয়ে আসল। আমার পা দিয়ে খুব রক্ত পড়ছিল। কেউ বলে, গুলি লেগেছে, কেউ বলে গ্যাসের ডাইরেক্ট আঘাত, কেউ বলে কেটে গেছে পড়ে যেয়ে। ডাক্তার এল, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করল। ইনজেকশন দিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল, কারণ বেদনায় খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। প্রায় ত্রিশজন লোক গ্রেফতার হয়েছিল। চট্টগ্রামের ফজলুল হক বিএসসি, আবদুর রব ও রসুল নামে আরেকজন কর্মী মাথায় খুব আঘাত পেয়েছিল। তারাও গ্রেফতার হয়ে গিয়েছিল। আমার আত্মীয়, ফরিদপুরের দত্তপাড়ার জমিদার বংশের সাইফুদ্দিন চৌধুরী ওরফে সূর্য মিয়া আমার কাছেই ছিল এবং আমাকে খুব সেবা করল। সে রাত দুইটা পর্যন্ত জেগে ছিল। এমন সময় মোগলটুলীর আমাদের অফিস, যেখানে আমি আছি, পুলিশ ঘিরে ফেলল এবং দরজা খুলতে বলছিল। লোহার দরজা, ভিতরে তালাÑ খোলা ও ভাঙা এত সহজ ছিল না। সাইফুদ্দিন চৌধুরী আমাকে, কাজী গোলাম মাহাবুব ও মফিজকে ডেকে উঠাল এবং বলল, “পুলিশ এসেছে তোমাদের গ্রেফতার করতে।”
আমি যখন ঘুমিয়ে ছিলাম, ইনজেকশন নিয়ে, তখন ভাসানী সাহেব খবর দিয়েছিলেন, আমি যেন গ্রেফতার না হই। আমার শরীরে ভীষণ বেদনা, জ্বর উঠেছে, নড়তে পারছি না। কি করি, তবুও উঠতে হল এবং কি করে ভাগব তাই ভাবছিলাম। শওকত মিয়া আগেই সরে গেছে। রাস্তাঘাট তারই জানা। তিনতলায় আমরা থাকি, পাশেই একটা দোতলা বাড়ি ছিল। তিনতলা থেকে দোতলায় লাফিয়ে পড়তে হবে। দুই দালানের ভিতরে ফারাকও আছে। নিচে পড়লে শেষ হয়ে যাব। তবুও লাফ দিয়ে পড়লাম। কাজী গোলাম মাহাবুব ও মফিজও আমাকে অনুসরণ করল। সাইফুদ্দিন রাজনীতি করে না, তাকে কেউ চিনে না। সে একলাই থাকল। আমরা যখন ছাদ থেকে নামছি তখন পাশের বাড়ির সিঁড়ির উপর একটা বালতি ছিল। পায়ে লেগে সেটা নিচে পড়ে গেল। আর বাড়িওয়ালা চিৎকার করে উঠল। আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পুলিশ দরজা ভাঙতে ব্যস্ত, এদিকে নজর নাই। আমরা বস্তি পার হয়ে বড় রাস্তায় পড়ব এমন সময় পুলিশও দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েছে। আমাদের মৌলভীবাজারের ভিতর ঢুকতে হবে। তিনজন পুলিশ এই রাস্তা পাহারা দিচ্ছিল। একবার তিনজন হেঁটে এপাশে আসে, আবার অন্যদিকে যায়। আমরা যখন দেখলাম, তিনজন হেঁটে সামনে অগ্রসর হচ্ছে তখন পিছন থেকে রাস্তা পার হয়ে গেলাম। ওরা বুঝতে পারল না। মৌলভীবাজার পার হয়ে আমরা এগিয়ে এসে এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। রাতটা সেখানেই কাটালাম। ভোরে ওদের দুইজনকে বিদায় দিলাম। কারণ, ওদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা নাই। সামনে পেলে গ্রেফতার করতে পারে। আমি আবদুল মালেক সর্দারের মাহুতটুলির বাড়িতে রইলাম। সেখান থেকে আমি পরের দিন সকালে ক্যাপ্টেন শাহজাহানের বাড়িতে উপস্থিত হলাম। তার স্ত্রী বেগম নূরজাহান আমাকে ভাইয়ের মত স্নেহ করতেন। তিনি রাজনীতি করতেন না। আমি আহত ও অসুস্থ, কোথায় যাই- আর কেইবা জায়গা দেয় তখন ঢাকায়! ভদ্রমহিলা আমার যথেষ্ট সেবা করলেন, ডাক্তারের কাছ থেকে ঔষধ আনালেন।
দুই দিন ওখানে ছিলাম। আইবির লোকেরা সন্দেহ করল, আমি এ বাড়িতে থাকতে পারি, কারণ প্রায়ই আমি এ বাড়িতে বেড়াতে আসতাম। দুইজন আইবি অফিসার এদের। এখানে এসেছে রাত আটটায়। ঠিক এই সময় একজন কর্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে বেগম নূরজাহানকে জিজ্ঞাসা করতে যাবে আমি কোথায়- আইবি অফিসারদের দেখে তার মুখের ভাব এমন হয়ে গেল যে, তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না, আমি কোথায় আছি! আমি কিন্তু পাশের ঘরেই শুয়ে আছি আর এদের আলাপ শুনছি। বেগম নূরজাহান খুবই চালাক ও বিচক্ষণ। তিনি ওদের চা খেতে দিয়ে আমাকে ডেকে দোতলা থেকে নিচে নিয়ে গেলেন এবং বললেন অবস্থাটা। আমি বললাম, “একটা চাদর দেন।” কারণ, আমার একটা পাঞ্জাবি। ও লুঙ্গি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ভাগ্য ভাল, ভদ্রমহিলা নিজেই দিনে এই দুইটাকে ধুয়ে দিয়েছিলেন। চাদর এনে আমাকে নিয়ে রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। আমি বেরিয়ে আসলাম। আইবিরা তখনও বাড়িতেই বসে আছে। এই অফিসারদের দুইজন গার্ডও বাইরে পাহারা দিচ্ছিল, আমি বুঝতে পারলাম। তাদের চোখকেও আমার ফাঁকি দিতে হল। (পৃষ্ঠা-১৩১, ১৩২, ১৩৩, ১৩৪)
 
(১৯৫০ সাল) আমরা মুন্সিগঞ্জে নেমে মীরকাদিম হেঁটে আসলাম। সেখানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে সন্ধ্যার একটু পূর্বে নৌকায় নারায়ণগঞ্জ রওয়ানা করলাম। সন্ধ্যার পরে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে রিকশা নিয়ে সোজা খান সাহেবের বাড়িতে পৌঁছালাম। জোহা সাহেব খবর পায় নাই, তার ছোট ভাই মোস্তফা সরোয়ার তখন স্কুলের ছাত্র। আমাকে জানত। তাড়াতাড়ি জোহা সাহেবকে খবর দিয়ে আনল। আমরা ভিতরের রুমে বসে বসে চা-নাশতা খেলাম। খান সাহেবের বাড়ি ছিল আমাদের আস্তানা। ক্লান্ত হয়ে এখানে গেলেই যে কোনো কর্মীর খাবার ও থাকার ব্যবস্থা হত। ভদ্রলোকের ব্যবসা-বাণিজ্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রাণটা ছিল অনেক বড়। জোহা সাহেব এসেই ট্যাক্সি ভাড়া করে আনল, আমাদের তুলে দিল। শওকত মিয়ার জন্য একটু দেরিও করেছিলাম। আমরা ঢাকায় রওয়ানা করার কয়েক মিনিট পরে শওকত মিয়াও নারায়ণগঞ্জ এসে পৌঁছাল এবং আমাদের চলে যাবার খবর পেয়ে আবার ঢাকায় ছুটল। আমরা পথে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে রিকশা নিয়ে মোগলটুলী পৌঁছালাম। দেখি আমাদের মালপত্র পৌঁছে গেছে। শওকত মিয়াও এসে পৌঁছে গেছে। শওকত মিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মুজিব ভাই, কি করে লাহোরে পৌঁছালেন, আর কি করে ফিরে এলেন, বলুন শুনি।” আমি বললাম, “প্রথমে বলেন, মওলানা সাহেব ও হক সাহেব কেমন আছেন? কে কে জেলে আছে। আওয়ামী লীগের খবর কি?” শওকত মিয়া যা বলল তাতে দুঃখই পেলাম, কিন্তু অখুশি হলাম না।
আওয়ামী লীগে যে ভদ্রলোকদের মওলানা সাহেব কার্যকরী কমিটির সভ্য করেছি। তাদের মধ্য থেকে প্রায় বার-তেরজন পদত্যাগ করেছেন ভয় পেয়ে। যাঁরা অনেক দিন পুরানা নেতা ছিলেন, তাঁরা শুধু পদত্যাগই করেন নাই, বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগ করেছেন যাতে গ্রেফতার না হতে হয়। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেব সদস্য হওয়ার পরপরই একদিন মওলানা সাহেবও আমাদের সাথে আলাপ করলেন এবং বললেন, “আমি আর্থিক অসুবিধায় আছি। এডভোকেট জেনারেলের চাকরিটা নিচ্ছি। আমার পক্ষে রাজনীতি সক্রিয় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। আপাতত আমি সদস্য থাকব না। তবে আমার দোয়া ও সমর্থন রইল।” আমরা তাঁর অসুবিধা বুঝতে পারলাম। তিনি কষ্ট করে সভায়ও একদিন এসেছিলেন। এই সময় দেখা গেল আওয়ামী লীগে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক সাহেব, আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, আনোয়ারা খাতুন এমএলএ, খয়রাত হোসেন এমএলএ, আলী আহমদ খান এমএলএ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, ইয়ার মোহাম্মদ খান, নারায়ণগঞ্জের আবদুল আউয়াল, আলমাস আলী ও শামসুজ্জোহা এবং আমি ও আরও কয়েকজন রইলাম, যাদের নাম আমি মনে করতে পারছি না।
শওকত মিয়া আমার জন্য থাকার বন্দোবস্ত করেছে। রাতে সেখানে কাটালাম। দিনে ঘরে থাকি, রাতে সকলের সাথে দেখা করি। কি করা যায় সেই সম্বন্ধে পরামর্শ করি। মানিক ভাই মোগলটুলীতেই আছেন, কি করবেন, ঠিক করতে পারছেন না। আবদুল হালিমও আমাকে কয়েকদিন রাখল ওর বাড়িতে। কয়েকজন ভদ্রলোক ওয়াদা করেছিলেন কিছু টাকা বন্দোবস্ত করে দিবেন। একদিন রাতে হঠাৎ আমার এক বন্ধু বড় সরকারি কর্মচারীর বাড়িতে পৌঁছালাম, আমাকে দেখে তো অবাক হয়ে গেলেন। তিনি ভয় পাওয়ার লোক ছিলেন না। আমাকে খুবই ভালবাসতেন। তিনি আমাদের অবস্থা জানতেন, তাঁর সহানুভূতিও ছিল আমাদের উপরে। তাড়াতাড়ি চলে এলাম, এভাবে পালিয়ে বেড়াতে ইচ্ছা হল না, আর ভালও লাগছিল না। আমি আবদুল হামিদ চৌধুরী ও মোল্লা জালালউদ্দিনকে বললাম, তোমাদের কাছেই থাকব। তারা তখন আলী আমজাদ খান সাহেবের পুরানা বাড়ি খাজে দেওয়ানে নিচের তলায় থাকত। আমি চলে আসলাম ওদের কাছে। দিনভর বই পড়তাম, রাতে ঘুরে বেড়াতাম। ঠিক হল, আরমানিটোলা ময়দানে একটা সভা ডাকা হবে। আমি সেখানে বক্তৃতা করব এবং গ্রেফতার হব। যখন সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে, দু’একদিনের মধ্যে সভা ডাকা হবে, দুপুরবেলা বসে আছি, দেখি পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করেছে। দুইজন গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী সাদা পোশাক পরে ভিতরে আসছেন। আমি যে ঘরে থাকি, সেই ঘরে এসে দরজায় টোকা মারলেন। আমি বললাম, ভিতরে আসুন। তারা ভিতরে আসলে বললাম, “কয়েকদিন পর্যন্ত আপনাদের অপেক্ষায় আছি। বসুন, কিছু খেয়ে নিতে হবে। এখন বেলা দুইটা, কিছুই খাই নাই। খাবার আনতে গেছে।”
হামিদ খাবার আনতে গিয়েছিল হোটেল থেকে, পুলিশ দেখে খাবার নিয়ে ভেগে গেছে। ভদ্রলোকেরা কতক্ষণ দেরি করবে? হামিদ যখন আর আসছে না, জালালও বাইরে গেছে, কখন ফিরবে ঠিক নাই তাই আলী আমজাদ খান সাহেবের বড় ছেলে হেনরীকে খবর দিলাম। হেনরী ছুটে এসেছে। আমি যে কিছুই খাই নাই, একথা শুনে বাড়িতে যেয়ে খাবার নিয়ে আসল। কিছু খেয়ে নিলাম। হেনরীর ছোট ভাই শাহজাহান, বোধহয় সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে, সেও এসেছে এবং তার মামুকে গালাগালি করতে শুরু করেছে। তার মামা এই বাড়ির দোতলায় থাকত। শাহজাহান বলতে লাগল, “আর কেউ পুলিশকে খবর দেয় নাই, মামাই দিয়েছে। বাবা বাড়িতে আসুক ওকে মজা দেখাব।” শাহজাহান আমাকে খুব ভালবাসত, সময় পেলেই আমার কাছে ছুটে আসত। আমি যখন পুলিশের গাড়িতে উঠে চলে যাই, শাহজাহান কেঁদে দিয়েছিল। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। শাজাহানের ঐ কান্নার কথা কোনোদিন ভুলতে পারি নাই। পরে খবর পেয়েছিলাম, ওর মামাই টাকার লোভে আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিল। আলী আমজাদ সাহেব ও আনোয়ারা বেগম ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আমাকে লালবাগ থানায় নিয়ে আসল। দুইজন আইবি অফিসার আমাকে ইন্টারোগেশন করতে শুরু করল। প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সে পর্ব চলল। আমি বললাম, “আওয়ামী লীগ করব। আমি লাহোর গিয়েছিলাম কি না? কোথায় ছিলাম? কি কি করেছি? ঢাকায় কবে এসেছি? বাড়িতে কতদিন ছিলাম? ভবিষ্যতে কি করব? সোহরাওয়ার্দী সাহেব কি কি বলেছেন? এইসব প্রশ্নে যে কথা বলার সেইটুকু বললাম, যা বলবার চাই না সে কথার উত্তর দিলাম না। আমাকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার দেখাল এবং সন্ধ্যার পরে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে গেল। রাতে আমাকে থানায় রাখল। জালাল আমার সুটকেস ও বিছানা থানায় পৌঁছে দিল। সন্ধ্যার পরে আনোয়ারা খাতুন এমএলএ, আতাউর রহমান খান সাহেব, আমার বিয়াই দত্তপাড়ার জমিদার শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী এমএলএ আমাকে দেখতে থানায় এসেছিলেন। রাতে জনাব সিদ্দিক দেওয়ান, বোধহয় তখন ইন্সপেক্টর ছিলেন, বাড়ির থেকে বিছানা, মশারি এনে দিলেন। আমার বিছানাও এসে গিয়েছিল, কোনো অসুবিধা হয় নাই। তিনি ও অন্যান্য পুলিশ কর্মচারী আমার সাথে খুবই ভাল ব্যবহার করেছিলেন, যাতে কোনো অসুবিধা না হয় তার দিকে সকলেই নজর দিয়েছিলেন। (পৃষ্ঠা-১৬৫, ১৬৬, ১৬৭)”
 
লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK