বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭
ঢাকা সময়: ২০:২৩

বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সুরেশ্বর দরবার শরীফ জিয়ারত ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

সাইয়্যেদ শাহ সূফী বেলাল নূরী আল সুরেশ্বরী (মাঃ জিঃ আঃ)
 
১৯৭০ সালঃ আমি তখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ভিপি এম. এ. রেজা তখন সেই কলেজের তুখোর ছাত্রনেতা। পরবর্তীতে বাবা জালাল নূরীর জামাতা, মুরিদ ও খলিফা,  মুক্তিযুদ্ধকালিন অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের সেক্রেটারী, আওয়ামী যুব লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনাব এম. এ. রেজা বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।    
বঙ্গবন্ধু এম. এ. রেজার মাধ্যমে সুরেশ্বর দরবার শরীফের পীর সাহেব জালাল নূরী হুজুরের কাছে দোয়া চান। তখন বাবা জালাল নূরী আফিয়ানহু হুজুর বঙ্গবন্ধুকে সুরেশ্বর দরবার শরীফ জিয়ারতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং ১৯৭০ সালের আগষ্ট মাসে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সুরেশ্বর দরবার শরীফে আগমন করেন।
তিনি দরবার শরীফে আসলে বাবা জালাল নূরী তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁর আগমন উপলক্ষ্যে বাবাহুজুরের নির্দেশে আমরা ভাইগণ মিলে কয়েকটি তোরণ নির্মাণ করি। অতঃপর বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে জালাল নূরী হুজুর হযরত সুরেশ্বরী বাবা ও তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র নূরী শাহ বাবার রওজা শরীফ জিয়ারত করেন, পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন এবং বাবা হুজুরের সাথে বঙ্গবন্ধু ও উপস্থিত অসংখ্য জনগণ মোনাজাতে শরীক হন। রওজা জিয়ারত শেষে বঙ্গবন্ধু বাবা জালাল নূরী হুজুরের সাথে তাঁর বসত বাড়িতে যান এবং সেখানে কিছু সময় একান্ত সৌজন্য আলোচনায় শামিল হন। 
বঙ্গবন্ধুর আগমনের খবর জানতে পেরে এরই মধ্যে রওজা শরীফের বিশাল মাঠ প্রাঙ্গন লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। যেহেতু এ আগমন ছিলো অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, তাই কোনো মঞ্চ নির্মাণ করা হয়নি। মঞ্চ নির্মাণ না করায় তাৎক্ষনিকভাবে দরবারের দ্বায়রা শরীফের উঁচু বারান্দা চত্বরকে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং সেখানে একটি চেয়ারে দরবার শরীফের মোতোওয়াল্লী  ও গদীনশীন পীর কেবলা হযরত সাইয়্যেদ শাহ সূফী জালাল নূরী আফিয়ানহু বসেন এবং তারই বাম পাশের চেয়ারে বঙ্গবন্ধু বসেন। সভার সভাপতিত্ব করেন হাজী মমিন আলী বেপারী। আমরা আওলাদগণ এবং বঙ্গবন্ধুর সফরসসঙ্গীরাসহ সকলে তাঁদের পেছনে সাবিদ্ধভাবে দাঁড়ানো ছিলাম। 
উপস্থিত জনগণের উদ্দেশ্যে তখন বঙ্গবন্ধু সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তাঁর নির্বাচনী আরো সফর থাকায় দক্ষিণবঙ্গে যাত্রার উদ্দেশ্যে বক্তব্য শেষে তিনি যাবার জন্য বাবা হুজুরের হাত ধরে দোয়া ও বিদায় চান। 
 
বাবাহুজুর বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ইনশাআল্লাহ আপনি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও উচ্চ মর্যাদা আল্লাহপাক আপনাকে দান করবেন। তবে ক্ষমতায় গেলে আপনি আমাদের জন্য কি করবেন? বঙ্গবন্ধু প্রশ্নের উত্তরে বলেন, হুুজুর, আপনাদের জন্য আমি কি করতে পারি আপনিই বলুন। তখন বাবা হুজুর বললেন, আমরা সূফী-দরবেশরা, তরিকতের পথের পথিকরা শান্তিপ্রিয় সহজ-সরল নির্বিবাদী মানুষ। ইসলামের লেবাসধারী এক শ্রেণীর উগ্র-কট্টরপন্থী তথাকথিত মোল্লাদের দ্বারা আমরা নির্যাতিত, অপদস্থ, তাদের অত্যাচার ও অপ-প্রচারে আমরা জর্জরিত। তাই আমরা যেন নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ ও শান্তিতে ধর্মকর্ম পরিপালন করতে পারি এটাই আপনার কাছে আমার আবেদন। তখন বঙ্গবন্ধু সাথে সাথেই বললেন, আমি কথা দিচ্ছি হুজুর, আমি ক্ষমতায় গেলে এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন পদ্ধতি কায়েম করবো। 
বাবা হুজুর সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুরেশ্বরীয়া সকল ভক্ত-প্রেমিক-আশেক-মুরিদ এবং অন্যান্য দরবার-খানকাসমূহের পীর-মাশায়েখ ও ভক্ত-মুরিদদের প্রতি আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করার জন্য ও ভোট দেয়ার জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর হাতকে শক্তিশালী করার জন্য উদাত্ত আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও জয়োরত সর্ম্পকে তৎকালীন জাতীয় দনৈকি ইত্তফোক পত্রকিাসহ অন্যান্য পত্রকিায় সচত্রি প্রতবিদেন প্রকাশতি হয়ছেেিলা। 
অতঃপর ৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু বিপুল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্তে¡ও তাঁকে ক্ষমতা না দেয়া হলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৭১- এর ৭ মার্চ ভাষণের প্রেক্ষাপট রচিত হয়।
সেদিনের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আমি ও বাবাহুজুর অত্যন্ত মনোযোগের সাথে রেডিও-তে শুনতে থাকি, বাবা হুজুর তখন চক্ষু বন্ধ অবস্থায় অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ছিলেন। ভাষণ শেষে তিনি চোখ খুলে বলেন- এই একটি মাত্র ঐতিহাসিক ভাষণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলোরে বেলাল। এই স্বাধীনতাকে আর কেউ রুখতে পারবে না। আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, তা কি করে সম্ভব, পাকিস্তানের মতো একটি শক্তিশালী সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন কীভাবে সম্ভব? প্রতিউত্তরে বাবাহুজুর বললেন, বাংলার জমিন, আকাশ-বাতাস, নদী-নালা, গাছপালা সর্বত্রই ‘জয় বাংলা’ শোøগানে মুখরিত, সর্বত্রই বাংলার স্বাধীনতা চাচ্ছে। যদি এই স্বাধীনতা রুখতে হয় তবে পাকিস্তানকে বাংলার জমিনের আড়াই হাত নীচ পর্যন্ত মাটি তুলে নিয়ে বঙ্গপোসাগরে ফেলে দিতে হবে। তা করা যেমন সম্ভব নয় তেমনি বাংলার স্বাধীনতাও রুখে দেয়া তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। আমি বাবাহুজুরের কথায় গভীরভাবে আশ্বস্ত হলাম, কারণ, বাবাহুজুরের কথা কখনো বিফলে যেতে দেখিনি।
৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে সুরেশ্বর দরবার শরীফের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধাদেরকে যথাসাধ্য সহযোগীতা করি এবং তাদেরকে খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে সেবা প্রদান করি। বাবাহুজুরের আদেশে আমি বেলাল নূরী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ ও ট্রেনিং গ্রহণের নিমিত্তে আমার ফুফাতো ভাই তৌহিদুল ইসলাম কয়েস ও রাকিবকে সাথে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। কুমিল্লা বেগুনবাড়ি বর্ডার দিয়ে যাত্রা করে আমরা আসামের শিলচরে যেয়ে উপস্থিত হই এবং সেখানে যেয়ে আমরা নানাহ সমস্যার সম্মুখীন হই। এ সময় আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ মিশনের সাথে যোগাযোগ করি। সেই সময়কার স্বাধীন বাংলাদেশ মিশনের ফরেন সেক্রেটারী কামাল সিদ্দিকী সাহেব  একটি চিঠি লিখে দেন যে, এরা তিনজন বিশিষ্ট্য মুক্তিযুদ্ধা, এদেরকে সকল প্রকার প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগীতা করার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ জানাই।    
পরবর্তীতে স্বাধীন সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ সরকার কায়েম হয়। এর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে দুষ্কৃতকারীরা এই মহান নেতা, বঙ্গ শার্দুল, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরবিারর্বগকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ হত্যাকাÐের কিছুদিন পূর্বে আমার বাবা হুজুরের মুরিদ ও দরবারের খাদেম আনোয়ার চাচা একটি দুঃস্বপ্ন দেখেন যে, একদল কালো পোষাক পরিহিত মুখোশধারী দুষ্কৃতিকারী ট্যাংক চালিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। সুরেশ্বরী বাবা তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। তাঁকে (বঙ্গবন্ধুকে) হুশিয়ার করে দাও।’
অতঃপর তার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে তিনি তা তার পীর ক্বেবলা জালাল নূরী আফিয়ানহু (রহঃ) হুজুরকে জানান এবং এই স্বপ্ন বিবরণী শুনে বাবা হুজুর অত্যন্ত চিন্তিত ও বিচলিত হয়ে তাকে সাথে সাথেই আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের কাছে প্রেরণ করেন। রাজ্জাক সাহেব বিষয়টি শুনে অবাক হয়ে যান, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করলে বাবা হুজুর তাকে আওয়ামী লীগের তৎকালিন প্রেসিয়িাম সদস্য ও মন্ত্রী এবং বাবা হুজুরের বিশিষ্ট্য মুরিদ এম. কোরবান আলীর কাছে প্রেরণ করেন। তাঁকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি শুনেই আগুন্তুককে এক ধমক দিয়ে বলেন- তুমি কি বলছো এসব, এটাও কী সম্ভব? স্বপ্নদর্শী আনোয়ার চাচা বলেন, আমাকে পাঠিয়েছেন আপনার মুর্শীদ বাবা জালাল নূরী হুজুর ক্বেবলা এবং এই স্বপ্নের আদেশ স্বয়ং সুরেশ্বরী বাবার। এ কথা শুনে তিনি চুপ হয়ে যান। তারপর যা হবার তা তো হয়েই গেলো।
বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা পরবর্তী সময়ে বাবাহুজুর সবসময় বিচলিত-আনচান অবস্থায় থাকতেন। যখন জানতে পারেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে আছেন এবং বিদেশে আছেন তখন তিনি অনেকটা নিশ্চিন্ত ও স্থির হন। তিনি তাদের জন্য প্রায়ই দোয়া করতেন, যেন আল্লাহপাক তাদেরকে হেফাজতে রাখেন এবং তাদের দ্বারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার তৌফিক যেন আল্লাহপাক তাদেরকে দান করেন। তিনি যখন জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু কন্যা দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন তখন 
তিনি অত্যন্ত খুশী হয়ে আমাকে প্রায়ই বলতেন, তোরা পারলে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে এনে আমাকে দেখা। তাঁর সাথে আমার বিশেষ কিছু কথা আছে। তখন তাঁর বয়স হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা তখন সেই ব্যবস্থা করতে পারিনি।
অনেক চড়াই উৎরাইয়ের পর দীর্ঘ ২১ বছরের দুঃস্বপ্নকাল পেরিয়ে আবার ক্ষমতাসীন হন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, বীর ললনা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দেশ-জনতা ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু সেই সরকারকেও আবার এক টার্মেই বিদায় নিতে হয় বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত¡াবধায়ক সরকারের ছত্রছায়ায় ভোট ডাকাতির এক নীল নকশার নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে। এহেন নির্বাচন পরবর্তী বৈরী পরিবেশের সময় জননেত্রী শেখ হাসিনা সুরেশ্বর দরবার শরীফে ২রা অগ্রহায়ণ ওরশে আমার সাথে মোনাজাতে অংশ গ্রহণ করার সদিচ্ছা ব্যক্ত করেন। এ উপলক্ষে আমি মোবাইল এন্টিনা সংযোগের ব্যবস্থা করলেও নেটওয়ার্ক না পাওয়ায় মাননীয় নেত্রী সেই মোনাজাতে শামিল হতে পারেননি। কিন্তু রাত প্রায় সাড়ে এগারটার দিকে তিনি আবার আমার বিশিষ্ট্য মুরিদ গোপালগঞ্জ নিবাসী গাজী মঞ্জরুর ইসলাম এর মাধ্যমে আমাকে ফোন দেন। 
 
সেই সময়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সাথে আমার দীর্ঘ সময় আলাপ হয়। তখন আমি বঙ্গবন্ধু কন্যাকে আশ্বস্ত করেছিলাম এই বলে যে, আপনি নির্বাচনে পরাজিত হননি, জনগণ আপনাকে ঠিকই ভোট দিয়েছে, কিন্তু আপনার বিজয়কে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এক অদৃশ্য শক্তির কলকাঠিতে। আমি বলেছিলাম, ইনশাআল্লাহ, আগামীতে আপনি ঠিকই আবার ক্ষমতাসীন হবেন, তবে তার আগে আপনি নিয়ত করুন যে, নির্বাচনে জয়ী হলে আপনি সুরেশ্বর দরবার শরীফ জিয়ারতে আসবেন। 
 
আমার কথার উত্তরে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেছিলেন, হুজুর, নির্বাচনে জয়ী হলে তো আসবোই, তবে তার আগেই সুরেশ্বর দরবার শরীফ জিয়ারতে আসবো। তখন আমি তাকে জানয়িিেছলাম, যহেতেু আপনি নয়িত করছেনে তাই যত বাঁধাই আসুক না কনে আপনি কন্তিু সুরশ্বের দরবার শরীফ জয়িারত করে যাবনেই।
 
এই কথা বলার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি দরবার শরীফে আসার সদিচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং আমার আমন্ত্রণে তিনি শরিয়তপুরের কৃতি সন্তান আবদুর রাজ্জাক ও সিনিয়র নেতা সাদেজা চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতাদেরকে সফরসঙ্গী করে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে লঞ্চ কাফেলাযোগে সুরেশ্বর দরবার শরীফ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আগমন করেন ২০০২ সালের ১১ এপ্রিল। আমি নেত্রীসহ সফরসঙ্গীদেরকে সাদর অভ্যর্থনা জানাই এবং তাদেরকে নিয়ে প্রথমেই রওজা শরীফ জিয়ারত করি। 
মাননীয় জননেত্রীর শুভাগমন উপলক্ষে আমি কয়েকটি সুসজ্জিত তোরণ ও মঞ্চ নর্মিাণ করি এবং নেত্রী ও তার সফর সঙ্গীদেরসহ আগত গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করি। আপ্যায়ন পরবর্তী সময়ে আমার ড্রইং রুমে বঙ্গবন্ধু কন্যার সাথে আমার একান্ত আলোচনা হয় প্রায় ঘন্টাকাল ব্যাপী নানাহ বিষয় নিয়ে।
প্রথমে তিনি হযরত বাবা জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী (রহঃ)-র মাজার জিয়ারত ও পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন এবং আমাকে দোয়া করতে অনুরোধ করলে আমি দোয়া ও মোনাজাত করি। সেই মোনাজাতে আমার বড় ভাই কামাল নূরী, ছোট ভাই ইকবাল নূরী, শাহেন শাহ নূরী, আলম শাহ নূরী, শাহ নূরে বোরহান ও বেনজীর নূরীসহ অন্যান্য আওলাদগণ শরীক হন। অতঃপর জননেত্রীকে নিয়ে আমরা আওলাদগণসহ নূরী শাহ বাবা ও জালাল নূরী বাবার রওজা শরীফ জিয়ারত এবং পুষ্পমাল্য অর্পন করি। 
 
আপ্যায়ন পর্ব শেষে জননেত্রীকে নিয়ে বক্তব্য মঞ্চে যাই এবং তিনি উপস্থিত জনগণের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আবেগঘন চিত্তহরণ করা বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী নেতৃবৃন্দের সাথে আমরা আওলাদগণও সভামঞ্চে উপস্থিত ছিলাম। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আমার বড় ভাই, সুরেশ্বর দরবার শরীফের মোতওয়াল্লী সাইয়্যেদ শাহ সূফী কামাল নূরী আল সুরেশ্বরী (মাঃ জিঃ আঃ)। সেই সমাবেশে দরবার শরীফ মাঠ প্রাঙ্গন হাজার হাজার লোক ও এলাকাবাসী উপস্থিতিতে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। 
 
পরর্বতী নর্বিাচনইে তিনি ক্ষমতায় এলে একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে টলেি সংলাপে আমি সুরশ্বের দরবার শরীফ জয়িারতরে কথা তাঁকে স্মরণ করয়িে দেই, তনিি (প্রধানমন্ত্রী) জানান, হুজুর! আপনি তো সবই বুঝনে।তখন আমি চুপ হয়ে যাই। এভাবইে পরর্বতীতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমি এক সৌজন্য সাক্ষাতে আমার মুরিদ গাজী মঞ্জুরুল ইসলাম, মুফতী ইমাম হোসেন নূরী (বাবার মুরিদ) ও আমিনুল হক চৌধুরী স্বপনকে সাথে নিয়ে গলেে দশ মনিটিরে সডিউিল সময়ে পরেয়িে সইে আলোচনা এক ঘন্টা অতিক্রম 
হয়ে যায়। তিনি আমার উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যান, সাথে সাথে একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে আসা অন্যান্য গণ্যমান ব্যক্তি, মন্ত্রী মহোদয়গণও দাঁড়িয়ে যান। তিনি তাঁর ডান পাশের চেয়ারে আমাকে বসতে দেন। তখনকার সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, উনাকে চেনেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হ্যাঁ বলতেই প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকে বলেন, তিনি হলেন সুরেশ্বর দরবার শরীফের পীর সাহেব। তাঁর এ সম্মান দান শুধু আমার মতো একজন সামান্য ফকিরকে দেননি, দিয়েছেন তাবৎ জাহের-বাতেন ওলী-আউলিয়াদেরকে। 
তাঁর পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন আল্লাহর ওলী-আউলিয়া প্রেমিক, দরবার প্রেমিক। ওলী-আউলিয়াদেরকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং একান্ত বিনয়ের সাথে তাদেরকে মহব্বত করতেন। যেখানেই যেতেন সেখানকার ওলীদের মাজার-রওজা তিনি জিয়ারত করতেন। তাঁর রাজনৈতিক গগনচুম্বী সাফল্যের পেছনেও ছিলো ওলীদের রূহানী মদদ। একই মদদে সিক্ত বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। আমার মতো একজন সামান্য ফকিরের প্রতি তার এ সম্মান জানানোর স্মৃতি মনে পড়লেই তাঁর জন্য আমার দোয়া ও আশীর্বাদ আপনা আপনিই মন থেকে জাগুরিত হয়ে উঠে।
এ সময় আমার সাথে থাকা মুফতী ইমাম হোসেন আমার কাছে এসে কানে কানে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে একান্তে কিছু কথা বললে ভালো হয়, এ কথা প্রধানমন্ত্রী শুনে ফেলেন বিধায় আমার বলার আগেই সামনে উপস্থিত থাকা সকলকে তিনি বলেন, আপনারা একটু পাশের রুমে যেয়ে বসুন। 
 
সেই একান্ত সাক্ষাতের সময় আমি বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ২৫ মার্চ পরবর্তী সময়ে আমার দেখা একটি স্বপ্নের কাহিনী জানাই। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলে তা শুনে বাবা জালাল নূরী আফিয়ানহু (রহঃ) অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। সেই সময় এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখি বঙ্গবন্ধু আমাদের নানার বাড়ি হাজী আহমদ আলীর জিনজিরার বাসায় এসে বাবা জানশরীফ সুরেশ্বরী (রহঃ)-র খাটে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। আমি তা দেখে মশারী টানিয়ে দিই। এরই মধ্যে দেখি প্রচÐ ঝড়-বৃষ্টি-বাতাস শুরু হয়েছে এবং জানালা দিয়ে সেই বাতাসের ঝাপটা তীব্রবেগে আসছে। আমি জানালা বন্ধ করে দিয়ে মনে মনে বলছি, বঙ্গবন্ধু এবার নির্বিঘেœ ঘুমাক।’
 
আমার এ স্বপ্নকাহিনী বাবাহুজুর হযরত সাইয়্যেদ শাহ সূফী জালাল নূরী আফিয়ানহু (রহঃ) কে জানালে বাবা হুজুর হঠাৎ তাঁর বিমুর্ষ ভাব ছেড়ে উল্লসিত হয়ে উঠেন এবং বলেন, যাক আর কোনো ভয় নেই, বঙ্গবন্ধু ভালো আছেন, বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান সরকার আর কিছুই করতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ বীরের বেশেই তিনি আবার নিশ্চিন্তে নির্বিঘেœ স্বদেশে ফিরে আসবেন। আমার এ কাহিনী বঙ্গবন্ধু কন্যাকে বললে তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনেন আমাদের জন্য নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও। অথচ, পাশের রুমে তখন অপেক্ষারত ছিলেন অনেক মন্ত্রীসহ শীর্ষ পর্যায়ের আমলা-নেতাগণ। অতঃপর আমাকে সেই পথ দিয়ে যেতে দেয়া হয় যে পথ দিয়ে সরকারের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভিভিআইপি ব্যক্তিত্ব বা রাষ্ট্রদূতরা যান। যাবার পথে মঞ্জু আমাকে বলেন, বাবা জানেন, এটি হলো বিশিষ্ট্য ব্যক্তিদের জন্য যাবার পথ, প্রধানমন্ত্রী আপনাকে সেই একই সম্মান জ্ঞাপনার্থে এ পথ দিয়ে যেতে দিয়েছেন। আমি তো শুনেই অবাক! আশেপাশের সিকিউরিটির লোকজন দৌড়ে আসেন আমার কাছে দোয়া চাইতে, অথচ সাক্ষাতে আসার পথে কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। 
আমাকে এই বিশেষ সম্মাননা জ্ঞাপনে আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিশেষভাবে অভিভূত হয়ে পড়ি এবং তার জন্য মনে মনে দোয়া করতে থাকি আল্লাহপাক যেন তাঁকে এর চেয়েও উচ্চতর সম্মান, প্রভাব ও দেশ গঠনের প্রভূত শক্তি দান করেন। অতঃপর তিনি আজ বিশ্বনেত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত, মহাথীর মোহাম্মদের আধুনিক মালয়েশিয়ার মতো তিনি আধুনিক সোনার বাংলা গড়ে চলছেন লৌহ মানবী মডেলে। যার অন্যতম প্রমাণ পদ্মা সেতু! তারই যোগ্য নেতৃত্বে শত বাঁধা-বিপত্তি, ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর স্বপ্ন আজ বাস্তব রূপ লাভ করেছে। এই দুঃখী বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, তাদের উন্নয়নে তিনি যেভাবে ক্ষমতাকে ইবাদত জ্ঞান করে কাজ করে চলছেন, তা সত্যিই বিরল! আল্লাহপাক তাঁর দ্বারা যেন সত্যিকার সোনার বাংলার পরিচয় বিশ্ব দরবারে উচ্চতর মর্যাদার আসনে অলংকৃত করে দিয়ে যেতে পারেন, তার সরকার যেন দীর্ঘায়ু হয়, সে কামনা ও দোয়া করি।
 
লেখকঃ ইসলামী গবেষক ও চিন্তাবিদ, দরবার শরীফ পরিচালনা কমিটির মহাপরিচালক, মোন্তাজমেে দরবার,গদনিশীন পীর ও মুর্শীদ ক্বিবলা, দরবারে আউলয়িা সুরশ্বের দ্বায়রা শরীফ, থানা- নড়য়িা, জলো- শরীয়তপুর
 
 

 

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK