বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
ঢাকা সময়: ০৪:৪৬
ব্রেকিং নিউজ

যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে কামালপুর হানাদার মুক্ত দিবস

যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে কামালপুর হানাদার মুক্ত দিবস

রাজিয়া সুলতানা : ঐতিহাসিক ধানুয়া কামালপুর হানাদার মুক্ত দিবস, আজ ৪ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী প্রতিরোধের মুখে হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি কামালপুর দুর্গের পতন হয়। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি বাহিনী। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বরাবরের মতো এবারও হানাদার মুক্ত দিবস পালন করা হচ্ছে। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, জামালপুর জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হচ্ছে। আয়োজনের অংশ হিসেবে ধানুয়া কামালপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হবে।
 
জামালপুর জেলার পাহাড় ঘেঁষা বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর অবস্থিত। পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে এখানে শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। এখান থেকেই হানাদার বাহিনী বারবার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। তাদের মূল টার্গেট ছিল উত্তর রণাঙ্গনের ১১ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আঘাত হেনে যে কোনো মূল্যে ওই ঘাঁটি দখল করা। কামালপুর রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসী আক্রমণ ও প্রতিরোধের মুখে আজ ৪ ডিসেম্বর কমান্ডার আহসান মালিকসহ ১৬২ জন পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য আত্মসমর্পণ করে। বলতে দ্বিধা নেই জাতীয় জীবনে কামালপুরের যুদ্ধ এক অনন্য অসাধারণ স্থান দখল করে রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামপর্বে ধানুয়া কামালপুর যুদ্ধ শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উৎসাহের প্রতীকই ছিল না। এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী একটা বার্তা দিতে সক্ষম হয় যে, তারা এখন কেবলই গেরিলা যুদ্ধ নয়, প্রয়োজনে সম্মুখযুদ্ধেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমানতালে লড়তে প্রস্তুত। কমবেশি সম্মুখযুদ্ধ হয়েছে মোট ২০ বার। খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে ১৯৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন অসংখ্য। অন্যদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২২০ জন সেনা নিহত হয়েছেন। বীর উত্তম থেকে বীর প্রতীক মিলিয়ে সর্বমোট ২৯ জন মুক্তিযোদ্ধা সাহসীকতা পদক পেয়েছেন কেবল কামালপুর যুদ্ধের জন্যই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন উদাহরণ আর একটিও নেই।
 
ধানুয়া কামালপুর রণাঙ্গন সম্পর্কে সৃজনশীল ও জনবান্ধব ব্যক্তিত্ব সরকারের অতিরিক্ত সচিব গাজী মো. সাইফুজ্জামান জানিয়েছেন, ‘জাতীয়ভাবে ধানুয়া কামালপুর মুক্তদিবস পালন করা হচ্ছে। কিন্তু এখনো নতুন প্রজন্মকে কামালপুর রণাঙ্গন সম্পর্কে সবিস্তারে জানে না। তাদেরকে জানাতে হবে, এখানে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি যুদ্ধ হয়েছে। সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ বীর উত্তম শাহাদাত বরণ করেন। মির্ধাপাড়া মোড়ে সম্মুখ যুদ্ধে মর্টার শেলের আঘাতে মেজর আবু তাহের পা হারিয়েছেন। এক কথায় কামালপুর মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে রয়েছে।’
 
কামালপুর রণাঙ্গন সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক হারুন হাবীব বলেছেনÑ ‘কামালপুর যুদ্ধে অনেকেই শহিদ হয়েছেন; গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। পাকিস্তানি বাহিনী নির্লিপ্তভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করে বিভিন্ন স্থানে গণকবর দিয়েছে। তবে কারণে আজ পর্যন্ত বকশীগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি। গণকবরগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণও করা হয়নি।’ তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত ধানুয়া কামালপুরের মির্ধাপাড়া মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের পাশাপাশি গণকবরগুলো রক্ষার্থে সরকারী উদ্যোগ নেওয়ার দাবী জানান।
 
বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সদস্য সচিব মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেনÑ ‘মুক্তিযুদ্ধকালে ধানুয়া কামালপুর ছিলো ১১ নং সেক্টরের আওতায়। যুদ্ধে এ সেক্টরের ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের শুরুতেই হানাদার বাহিনী এ অঞ্চলে গড়ে তোলে শক্তিশালী ঘাঁটি। পাক বাহিনীর টার্গেট ছিল ১ নং সেক্টর গুড়িয়ে দেওয়ায়। সম্মুখযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল আক্রমণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এ ঘাঁটির হানাদাররা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এ ঘাঁটি দখলের মধ্য দিয়ে শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও দেশের উত্তর মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোসহ ঢাকা বিজয়ের পথ সহজ হয়ে যায়। ৪ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর অফিসার আহসান মালিকের নেতৃত্বে ১৬২ জন সেনার একটি দল যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসর্মপণ করে। শত্রুমুক্ত হয় ধানুয়া কামালপুর।’
 
তিনি আরো বলেছেনÑ ‘বকশীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বধ্যভূমি রয়েছে। কিন্তু অযত্ন-অবহেলায় তা হারিয়ে যেতে বসেছে। গণকবরগুলো কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের ধানুয়া গ্রামের ৮ নিরীহ মানুষকে হত্যার ঘটনায় গণকবরগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে। শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ধানুয়া কামালপুর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্মৃতি সৌধটি ১১ নম্বর সেক্টরের মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক। মেজর আবু তাহেরের স্মৃতি রক্ষার্থে ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে তাহের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। বকশীগঞ্জ এনএম উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনের গণকবরটি সংরক্ষণ করা হলেও বকশীগঞ্জ সরকারি উলফাতুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাক সেনাদের টর্চার শেলে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষের গণকবর সংরক্ষণ করা হয়নি। বাট্টাজোড় পশ্চিম দত্তের চর গ্রামের গণকবরটি এখনো সংরক্ষণ করা হয়নি।’
 
জামালপুর জেলা প্রশাসক মো. শফিউর রহমান নানা প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে বিডিআরের নিজস্ব অর্থায়নে ধানুয়া কামালপুর স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে ধানুয়া কামালপুর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি ও প্রামাণ্যচিত্র দেখতে আসেন।’  তিনি এক প্রশ্নে জবাবে বলেনÑ ‘ এই অঞ্চলের বেশিরভাগই গণকবর ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে আরো কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের ছাপে বাংলাদেশ নামে একটি মানচিত্র আঁকা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নের সড়কগুলো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করা হচ্ছে।’
 
বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার অহনা জিন্নাত বলেছেন, ‘ডিসেম্বর মাস এলেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মিলন মেলায় পরিণত হয় ধানুয়া কামালপুর। কামালপুর রণাঙ্গন সন্দেহাতীতভাবে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কালের সাক্ষী। কামালপুরের যুদ্ধ যেমন ঐতিহাসিক; তেমনি পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণও ইতিহাস সমৃদ্ধ।’
 
কামালপুর রণাঙ্গনের দুঃসাহসিক নায়ক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বশির আহমেদ [বীর প্রতীক] জানিয়েছেন স্মৃতি বিজড়িত সেই দিনের আত্মসমর্পণের গল্প। তিনি জানিয়েছেন ‘৩ ডিসেম্বর;সারাদেশে ব্যাপক যুদ্ধ চলছে। এখানেও তাই। কিন্তু ওইদিন রাতে মহেন্দ্রগঞ্জে ব্যাটেলিয়ন হেড কোয়ার্টারে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো পরদিন পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেওয়া হবে। নয়তো বিমান হামলা ও স্থল হামলা চালানো হবে।  আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে জীবন বাজি রেখে আমি পাকিস্তানিদের ব্যারাকে যাই। আমার দেরি দেখে সাড়ে তিনটার দিকে সঞ্জুকে পাঠানো হলো। আমাদের ফিরতে দেরি দেখে, বোমা হামলা করা হলো পাকিস্তানি ক্যাম্পে। অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করল। আমরা ক্যাম্পে ফিরে আসলাম। আত্মসমর্পণের চিঠি পৌঁছে দিতেই সবাই আমাকে নিয়ে উৎসবে মেতে উঠল। বলা যায় এই অঞ্চল থেকে দেশ বিজয়ের উৎসব শুরু হয়ে গেল।’ 
 
সাদামাটাভাবে কামালপুর মুক্ত দিবস পালনের সূচনার বন্ধুর পথ ছাপিয়ে এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। বাড়ছে এর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকেও এই দিবসের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে। তারাও নিজেদের নানাভাবে সম্পৃক্ত করছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিজয় এসেছিল ধানুয়া কামালপুর রণাঙ্গন থেকেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও কামালপুর মুক্ত দিবসে সম্পর্কে অবহিত। স্থানীয় প্রশাসনও আন্তরিকভাবে দিবস উদযাপন  করে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম বিজয়সারণী হয়ে রয়েছে কামালপুর রণাঙ্গন।  
উত্তরণবার্তা/আসো
 

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK