বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
ঢাকা সময়: ০৪:১৫
ব্রেকিং নিউজ

আমলিগোলা শাহী মসজিদ : অতীত দিনের কথা

আমলিগোলা শাহী মসজিদ : অতীত দিনের কথা

  • আনিস আহামেদ
প্রাক-কথন
মুসলমানরা এক আল্লাহর ইবাদত করে। এই ইবাদত পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর অন্যতম হলো নামাজ। আমরা সমবেতভাবে নামাজ আদায়ের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে হাজির হই। মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর মদিনার উপকণ্ঠে প্রথম যে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, তার নাম ‘মসজিদে কুবা’। সেই থেকে অদ্যাবধি পৃথিবীর যেখানেই মুসলমানরা বসতি স্থাপন করেছে, সেখানে অগণিত মসজিদ নির্মাণ করেছে। এ পর্যন্ত জ্ঞাত তথ্য অনুযায়ী, ভারতবর্ষে কেরালায় সর্বপ্রথম যে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়, তার নাম ‘চেরামন জুম্মা মসজিদ’। ৭ হিজরিতে (৬২৯ খ্রিষ্টাব্দ) মালিক ইবন দিনার ভারতের কেরালা প্রদেশের কডুঙগাল্লুর তাল্লুকের মেথেলা নামক স্থানে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সে-সময় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স ছিল ৫৯, অর্থাৎ তার জীবদ্দশায় উল্লিখিত মসজিদ নির্মিত হয়। বাংলাদেশে প্রথম যে মসজিদ নির্মাণের সন্ধান পাওয়া যায়, সেটি লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস মৌজায়। মসজিদের প্রাপ্ত শিলালিপি অনুযায়ী ৬৯ হিজরিতে (৬৮৮-৬৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) এটি নির্মিত হয়। পুনর্নির্মিত এই মসজিদের বর্তমান নাম ‘সাহাবা মসজিদ’। রাজধানী ঢাকা শহরে নির্মিত প্রথম স্থায়ী মসজিদ নারিন্দায় সুলতানি আমলে (১৪৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) নির্মিত হয়েছে, তার নাম ‘বিনাত বিবির মসজিদ’।
সুলতানি আমলে নির্মিত ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে (বর্তমান মুগদা থানার মাণ্ডায়) একটি মসজিদ রয়েছে, এটি ‘মাণ্ডা মসজিদ’ নামে পরিচিত। এর শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি নির্মিত হয়েছে ১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দে।
মুঘল আমলে ঢাকা শহরে যেসব প্রাচীন মসজিদের সন্ধান পাওয়া যায়, তার মধ্যে ইসলামপুরের সৈয়দ আওলাদ হোসেন লেনে ‘ইসলাম খাঁ মসজিদ’। মুঘল আমলে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মসজিদের মধ্যে ‘চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদ’ ১৬৪৯ খ্রিষ্টাব্দে, ‘চকবাজার শাহী মসজিদ’ ১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে, ‘মুসা খাঁ শাহী মসজিদ’ ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে, ‘হাজী শাহাবাজ মসজিদ’ ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে, ‘কাওরান বাজার আম্বর শাহ মসজিদ’ ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে, ‘সাত গম্বুজ মসজিদ’ ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে, ‘আমলিগোলা শাহী মসজিদ’ ১৬৮৭-৮৮ খ্রিষ্টাব্দে (১০৯৯ হিজরি), ‘বাবুপুরা বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ’ ১৬৯৮ খ্রিষ্টাব্দে, ‘লালবাগ খান মোহাম্মদ মসজিদ’ ১৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে, ‘লালবাগ শাহী মসজিদ’ ১৭০১-১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এবং ‘আজিমপুর দোতালা শাহী মসজিদ’ ১৭৪৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়।
 
প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধানে
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলার সুবেদার ছিলেন শায়েস্তা খান। উনি দু-দফায় বাংলায় সুবেদারি করেন। প্রথমে ১৬৬৪ থেকে ১৬৭৮ সাল এবং দ্বিতীয়বার ১৬৮০ থেকে ১৬৮৮ সাল পর্যন্ত।
লালবাগ কেল্লা ছিল তার শাসন কেন্দ্র। শায়েস্তা খান পরবর্তী ঢাকার সুবেদারগণ লালবাগ কেল্লায় অবস্থান করেই তাদের শাসনকার্য পরিচালনা করেন। লালবাগ কেল্লার পশ্চিম প্রাচীর সীমানা থেকে পশ্চিমে বর্তমান জগন্নাথ সাহা রোডের উভয় পাশ, লালবাগ রোডের উভয় পাশ এবং সুবল দাস রোডের (চৌধুরী বাজার) উভয় পাশজুড়ে গোলাহ আমিরগঞ্জ বসতি (মহল্লা) এলাকা গড়ে ওঠে। এখানে সুবেদারদের উচ্চ পদস্থ মুসলিম রাজ-কর্মচারীরা সপরিবারে বসবাস করত। ১৭১৭ সালে ঢাকা থেকে সুবা বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হওয়ার পর এই বসতি গুরুত্ব হারিয়ে প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু মুসলিম পরিবারের অবস্থান থাকলেও এলাকাটি দিনে দিনে বহিরাগত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। কালের বিবর্তনে লোকমুখে এই বসতির নাম পরিবর্তিত হয়ে আমির গোলাহ থেকে আমলিগোলায় রূপান্তরিত হয়। তবে ‘আমলিগোলা শাহী মসজিদ’কে কেন্দ্র করে মুসলিম জনবসতি ধারাবাহিকভাবে বিদ্যমান ছিল। বর্তমান আমলিগোলা মহল্লার যারা স্থায়ী বাসিন্দা, তাদের অনেকের ২০০-২৫০ বছরের বংশলতিকা রয়েছে। পুরনো দালারকোঠার অস্তিত্ব নিকট অতীতেও দৃশ্যমান ছিল। এখনও কয়েকটি প্রাচীন হাবেলি কালের সাক্ষ্য বহন করছে।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ঢাকায় নবাব আবদুল গণীর পৃষ্ঠপোষণে ঢাকার মুসলিম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা রাজ অনুমোদিত সামাজিক সংগঠনের মর্যাদা লাভ করে। তখন ঢাকা শহরে সোব্বাসী ভাষা অধ্যুষিত ২২টি ও আঞ্চলিক বাংলা অধ্যুষিত ১২টি মহল্লা পঞ্চায়েত গঠিত হয়। আমলিগোলা মহল্লা পঞ্চায়েত ২২ পঞ্চায়েত অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পঞ্চায়েতের প্রথম সরদার ছিলেন শেখ কাদের বখশ এবং সর্বশেষ সরকারি অনুমোদিত (নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ-র হাতে অভিষিক্ত) সরদার ছিলেন আবদুর রহিম। ১০০ বছরের অধিকালের ধারাবাহিকতায় আমলিগোলা মহল্লার সকল সরদার আমলিগোলা শাহী মসজিদ সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বসতির বাসিন্দা ছিলেন।
আমলিগোলা পঞ্চায়েত সরদারগণ পদাধিকার বলে আমলিগোলা শাহী মসজিদ তথা বড় মসজিদের মোতায়াল্লি ছিলেন। ১৯৫২ সালে প্রথম লিখিত মসজিদ পরিচালনা কমিটির দলিলপত্র রয়েছে। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট গঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন মো. আপ্তাবদ্দিন চৌধুরী এবং সেক্রেটারি ছিলেন সরদার আহমদ উল্লাহ। সেই লিখিত কমিটি গঠনকালে সভার সভাপতিত্ব করেন আমলিগোলা মহল্লা পঞ্চায়েতের সরদার আবদুর রহিম।
১৮০০ সালের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ কোম্পানি আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হলে, আমলিগোলা মহল্লার দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিজাত ও সাধারণ মুসলমান পরিবার বসতি গড়ে তোলে। ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ সৃষ্টি করা হয়। এ সময়ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক মুসলিম-পরিবার আমলিগোলা মহল্লায় বসতি স্থাপন করে। অতঃপর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এলাকার অধিকাংশ হিন্দু দেশত্যাগ করলে এসব সম্পত্তিতে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বসবাস করতে শুরু করে, কর্মসূত্রে এখানে অনেক অস্থায়ী মানুষের আনাগোনা হতে থাকে।
ফলে পুরনো ও নতুন মুসলমান পরিবারগুলোর যৌথ অবস্থানে আমলিগোলা মহল্লায় মুসলমান জনসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। এতে আমলিগোলা শাহী মসজিদের গুরুত্ব ও মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যায়। পুরনো শাহী মসজিদের সীমাবদ্ধ পরিসরে তাদের স্থান সংকুলান কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বাস্তব অবস্থার নিরিখে তখনকার বাসিন্দারা সর্বসম্মতিক্রমে ১৯৬০ সালের ২ ডিসেম্বর, শুক্রবার বাদ জুমা প্রাচীন গম্বুজ ও মিনার ভেঙে নামাজঘরের স্থান বৃদ্ধি করে। ফলে মসজিদটির প্রাচীন রূপ চিরতরে হারিয়ে যায়। প্রাচীন মসজিদটি ভাঙার সময় যদি কোনো ছবি বা চিত্রকর্ম অংকন করে রাখা হতো, তাহলে বর্তমান প্রজন্ম তার প্রতিরূপ দেখতে পেতো। ঢাকার শহরের সুলতানি ও মুঘল আমলের অনেক স্থাপনা এভাবেই কালের গর্ভে লুপ্ত হয়ে গেছে।
মুসলিম আবাসস্থলের চাহিদা অনুযায়ী মুঘল আমলে আমলিগোলায় মহল্লায় দুটি শাহী মসজিদ নির্মিত হয়, তার প্রথমটি ‘আমলিগোলা শাহী মসজিদ’, যার নির্মাণকাল ১৬৮৭-৮৮ সাল (১০৯৯ হিজরি) এবং খান মুহাম্মদ মৃধা মসজিদ ১৭০৫ সাল।
 
নির্মাণশৈলী ও শিলালিপি
আমলিগোলার কৃতী সন্তান আলহাজ্ব নাজির হোসেন তার কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “আমলিগোলা বড় (শাহী মসজিদ) মসজিদটি মুঘল আমলে নির্মিত হয়। এর ফলকটি লালবাগ কেল্লার জাদুঘরে রক্ষিত আছে। (প্রাচীন) মসজিদটি উঁচু প্লাটফর্মের ওপর তৈরি বিধায় এটি দোতলা মসজিদের মতো দেখা যায়। মসজিদের সৌন্দর্য ছিল বিরাটকার গম্বুজ। সেই গম্বুজ আর মিনার ভেঙে দোতলা করায় মসজিদের সে সৌন্দর্য আর নেই।”
 
শিলালিপির সন্ধানে
কিংবদন্তির ঢাকা পড়ে এবং আমলিগোলা মহল্লার মুরুব্বিদের কাছ থেকে জানা শ্রুতে আমি শিলালিপির বিষয়টি জ্ঞাত ছিলাম। অনেক বছর আগে দেখা লালবাগ কেল্লার জাদুঘরে একটি শিলালিপির ক্যাপশনে উল্লেখ ছিল কেল্লার পাশের এলাকা থেকে প্রাপ্ত একটি মসজিদ ও বাগানের শিলালিপি। আমি আমলিগোলা শাহী মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি থাকাকালীন ২০১৯ সালের ১২ জুলাই বিষয়টি উল্লেখ করলে মসজিদ কমিটি আমাকে মসজিদের শিলালিপির অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়। ২০১৯ সালে লালবাগ কেল্লার জাদুঘর পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখতে পাই, সংস্কার-কাজের জন্য জাদুঘর পরিদর্শন বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে আমি আশাহত হয়ে পড়ি।
বিগত ২০২২ সালে অমর একুশে গ্রন্থ মেলার বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্টলে একটি বইয়ের সন্ধান পাই বইটির নাম ‘ঢাকার লালবাগ ইতিহাস ও ঐতিহ্য’, লেখক খন্দকার আলমগীর, উনি একসময় লালবাগ কেল্লার কাস্টিডিয়ান ছিলেন। খন্দকার আলমগীর তখন উক্ত স্টলে উপস্থিত ছিলেন। তার সাথে আমলিগোলা শাহী মসজিদের শিলালিপি নিয়ে কথা বলি, যা লালবাগ জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল। তখন তিনি উক্ত বইয়ের ৪৩নং পাতায় উক্ত শিলালিপির মুদ্রিত ছবি আমাকে দেখান। যার ভাষান্তর তিনি একজন ইরানি স্কলারের হাতে করিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বইটির ২৪নং পাতায় উল্লেখ করেছেন, ‘দুর্গস্থ জাদুঘরে আরও একটি শিলালিপি রক্ষিত আছে। ঢাকার নিকটবর্তী কোনো স্থান থেকে মসজিদ ও বাগান তৈরি-সংক্রান্ত এ শিলালিপিটি সংগৃহীত হয়। আমার বক্তব্যের সঙ্গে খন্দকার আলমগীর একমত পোষণ করেন যে উল্লিখিত শিলালিপিটি আমলিগোলা শাহী মসজিদের। ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের কর্মকর্তা আলী লুতফি শিলালিপির পাঠোদ্ধার ও তরজমা করেছেন। (পৃষ্ঠা-৩০)
 
আমলিগোলা শাহী মসজিদের শিলালিপির বাংলা তরজমা
এ মসজিদ ও বাড়ি, বাগান ও বসতি মুহম্মদ রবি আউয়াল আল্লাহর পথে দান করেছেন। এভাবে তিনি কল্যাণের পথে ব্যয় করতে ও আল্লাহর ইবাদতের কেন্দ্র খানকাহ-এর জন্য ব্যয় করতে বিশ্বাসীদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। দরিদ্র ও মুসাফিরদের জন্য নিজের উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে ব্যয় করার জন্য। এবং এই উদ্যান ও জমিতে ... নির্মাণের অথবা এর মুনাফা নেওয়ার জন্য।
১০৯৯ হিজরির বছরের রবিউল আউয়াল মাসে লিখিত (১৬৮৭-৮৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
 
শিলালিপির বর্ণনামতে, এই মসজিদের ওয়াকফি সম্পত্তির আওতায় মসজিদ ও বাড়ি, একটি বাগান ও গ্রাম (মহল্লা) বিদ্যমান ছিল। উল্লেখ্য, মুঘল আমলে নির্মিত মসজিদসমূহ সুবেদারের পক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। আমলিগোলা শাহী মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা রবিউল আউয়াল সম্ভবত উচ্চপদস্থ আমির ওমরাহ (রাজ-কর্মকর্তা) ছিলেন।
 
লেখক : সাংবাদিক ও ঢাকা গবেষক।
 

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK