বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১
ঢাকা সময়: ১৫:০৩

নতুন প্রজন্মের কাছে এক মুক্তিযোদ্ধার খোলা চিঠি

নতুন প্রজন্মের কাছে এক মুক্তিযোদ্ধার খোলা চিঠি

বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল
 
প্রিয় প্রজন্ম,
তোমরা আমার ভালবাসা নিও। তোমরা লেখাপড়া কর, মানুষের মতো মানুষ হও। তোমরা সৎ ও দেশ প্রেমিক হও। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের পর সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন বাঙালি জাতির বিভিন্ন গৌরবময় অর্জনের মধ্যে অন্যতম। ২৩/০৬/১৭৫৭ তারিখে মীর্জাফরদের ষড়যন্ত্রে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ দ্দৌলার পরাজয় হয়। তাঁকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়। পলাশীর আম্র কাননে স্বাধীনতার সূর্য অস্ত্রমিত হয়। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ দখল করে নেয়। ইহার পর নানা অত্যাচার নিপীড়ন ও জীবন দানেরপর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তোমরা লেখা-পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ সুবিধা মত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। তাহলে বাঙালিদের বীরত্ব গাঁথা ও অন্যান্য জানতে পারবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পূর্বে ব্রিটিশরা ১৯০’ বছর ১ মাস ২১ দিন ভারতবর্ষকে শাসণ শোষণ করেছে। তাদের হাত থেকে স্বাধীণতার জন্য শত শত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, জেল খেটেছেন, দ্বীপান্তরে গিয়াছেন। যে দুইটি অঞ্চলে মুসলমান বেশী সে রকম দুটি অঞ্চল কে নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুইটি অংশ দুই জায়গা। এখন যেটি পাকিস্তান সেটির নাম ছিল পশ্চিম পাকিস্তান এবং আমাদের বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখন্ডের নাম ছিল পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তান। মাঝ খানে ১৬০০ কিলোমিটারের অধিক দূরত্ব এবং ভারত রাষ্ট্রের অবস্থান। শুধু ১৬০০ কিলোমিটার দূরত্ব তা নয়, মানুষ গুলোর ভিতড়ে ছিল দ্রূত্ব। তাদের চেহারা, ভাষা, খাবার, পোশাক, সংস্কৃতি ঐতিহ্য সব কিছু ছিল ভিন্ন, শুধু একটি বিষয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ গুলোর মাঝে মিল ছিল সেটি হচ্ছে “ইসলাম ধর্ম”। আমাদের এই সোনার বাংলাটি ছিল ভারতবর্ষের একটি ভূখন্ড। ১৯৪৭ সালে সংখ্যাগড়িষ্ট মুসলমান অধ্যাষিত দুইটি এলাকা মিলে পাকিস্তান। আর সংখ্যাগড়িষ্ট হিন্দু অধিবাসীদের নিয়ে হিন্দুস্থান বা ভারত স্বাধীন হলো। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে শাসণ করতো পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক। তারা শাসনের নামে পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালিদের বঞ্চিত, শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়ন করতো। তারা আমাদের ন্যায্য অধিকার দিত না। চাকরি ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে আমাদের কে বঞ্চিত করত। তদানীন্তন বাঙালি নেতাগণ তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংগ্রাম ও আন্দোলন করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক পূর্ব-পাকিস্তানের সম্পদ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে কলকারখানা করতো। অর্থনৈতিক নিপীড়ন থেকে অনেক বড় নিপীড়ন হচ্ছে একটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের উপর নিপীড়ন। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠি ঠিক সেটিই শুরু করে ছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা কালীন  শীর্ষ নেতা ও পরবর্তীতে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং জাতির পিতা কায়েদ-এ-আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ঘোষণা করলেন- উর্ধু এবং উর্ধুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।  রাষ্ট্র ভাষা উর্দূ করার প্রতিবাদ করলেন ড.মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সহ বিভিন্ন বাঙালি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক ধাপে ধাপে ১৯৫২ সালে উর্দূকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বাঙালিদের আন্দোলনের কারনে পারে নাই। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রæয়ারী বিহারী পাকিস্তানি শাসকের নির্দেশে পুলিশ বাঙালি ছাত্র মিছিলের উপর গুলি চালায়। বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য সালাম, রফিক, শফিক, বরকত ও জব্বার সহ অনেক বাঙালি শহিদ হয়েছেন। যেখানে আমাদের ভাষা শহিদরা প্রাণ দিয়েছিলেন সেখানে ও সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের ভাষা শহিদদের স্মরণে শহিদ মিনার  তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছর ২১ ফেব্রæয়ারী ভাষা শহিদদের স্মরণে আমরা শহিদ দিবস পালন করতাম। বর্তমানে আমাদের শহিদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পৃথিবীর মানুষ স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে ২১ ফেব্রুয়ারী আমাদের ভাষা শহিদ দিবস সারা পৃথিবী ব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করি। শহিদ মিনার বাঙালিদের ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মারক। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষে পূর্ব বাংলার যে কয়েক জন বরেন্য নেতৃত্বের নাম স্মরণ যোগ্য তাঁদের মধ্যে অন্যতম- শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক ,হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। প্রথম শহিদ মিনার উদ্বোধন করেছেন শহিদ শফিউর রহমানের (পুলিশের গুলিতে যাঁর মাথার খুলি উড়ে গিয়ে ছিল) বৃদ্ধ বাবা। বায়ান্নোর একুশে ফেব্রæয়ারি আমাদের পূর্ব পুরুষরা রক্তদান করে বাঙালি জাতীয়তা বাদের যে বীজ বহন করেছিলেন,ধাপে ধাপে বাঙালিদের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই বীজ কালক্রমে বিশাল মহীরুহে পরিনত হয়েছে। ইতিহাসের ধারাবাহিক তায় অনিবায ভাবে আমাদের ঘরে ঘরে এসেছে স্বাধীনতার জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর হতে বিভিন্ন বাঙালি নেতার আন্দোলন সংগ্রামের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সাধারণ নির্বাচন। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছিল। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের ১৪৩ টিতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী বাঙালিদের এই আধিপত্য মেনে নিতে পারেনি। মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে ষড়যন্ত্র মূলক ভাবে ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে মন্ত্রি সভা ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছিল। ১৯৫৯ সালে আবার পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের সময় আসে। তখন পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ ছিল বাঙালি। নির্বাচনের বাঙালিদের বিজয় হবে চিন্তা করে নির্বাচন যাতে না দিতে হয় সে জন্য ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে। 
১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৫৯-৬১ সালে ছাত্র সমাজের হাত ধরে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষা আন্দোলন ও ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের নিয়ে স্বাধীনতার লক্ষ্যে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ বা নিউক্লিয়ার্স গঠন, ৬৪ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ৬৮ সালে আগরতলা মামলা, ৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থান প্রভৃতি আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। বাঙালিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামের কারণে জাতির পিতাকে প্রায় ১৩ বছর কারা ভোগ সহ বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতন সইতে হয়েছে। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ টি আসনের ১৬০টিতে গণ ভোটে বিজয়ী হয় তৎকালীন বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ।আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের সংরক্ষিত আরো ৭টি মহিলা আসনের অধিকারী হয়। মোট ১৬৭টি জাতীয় পরিষদের আসনের অধিকারী হয়ে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৭ ডিসেম্বর’৭০ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের ২৯৮ আসণে বিজয়ী হয়েছিল। যে স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতা বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করছেন। প্রায় দীর্ঘ ১৩টি বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। বিভিন্ন অত্যাচার নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁর ত্যাগ, আন্দোলন ও সংগ্রামের বিজয় হলো। জনগন স্বতঃফুর্তভাবে জাতির পিতাকে ম্যান্ডেট দিয়ে ছিল। তখন পাকিস্তানের শাসক ছিলেন সামরিক প্রেসিডেন্ট সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান। বাঙালিদের বিজয়ে বিহারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি ভূট্টো ও অন্যান্যদের সাথে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করলেন। সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের পরিকল্পনা করলেন। ২২ ফেব্রুয়ারী’৭১ পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলদের এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপন নির্দেশ দিলেন,৩ মিলিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও তাদের সমর্থকদের হত্যা করুণ। তাহলে বাকিরা আমাদের বস্যতা স্বীকার করবে”। তাঁর ধরণা ছিল নির্যাতন করে ত্রিশ লাখ বাঙালি হত্যা করলেই আন্দোলন থেমে যাবে’। কালক্ষেপন করে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য ১৩ ফেব্রæয়ারী’৭১ ইয়াহিয়া খান মিথ্যা আশ্বাস দিলেন ৩ মার্চ’৭১ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে। ১৬ ফেব্রæয়ারী বঙ্গবন্ধুকে পার্লামেন্টারী নেতা নির্বাচন করা হয়। ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান ১-০৫ মি: জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ভাষণে ৩ মার্চ আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বে-আইনী ভাবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলেন। বেতার ভাষন শুনে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন। ২ মার্চ ছাত্র লীগের উদ্যোগে বিশাল জন সভায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করা হলো এবং সকলের পক্ষে একজন কে দিয়ে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটমুলে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলো। সারা দেশের অধিকাংশ মানুষ বাঁশের লাঠি ও অন্যান্য দেশী অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে এলেন। পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানো শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ৩মার্চ কে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালনের নির্দেশ দিলেন। জাতির পিতার নির্দেশে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩-৬ সারাদেশ ব্যাপী সকাল ৬ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত স্বতঃফুর্ত হরতাল পালন করা হলো। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় জাতীয় সংগীত হিসেবে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের- “আমার সোনার বাংলা...” গানটি নির্বাচিত হলো। বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ও জাতির পিতা/জনক ঘোষণা দেওয়া হল। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের ইশতেহার পাঠ এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলো। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বললেন- “...আজ হতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হলো। ৫৮ হাজার ৫০৬ বর্গমাইল ভৌগলিক এলাকার সাড়ে সাত কোটি মানুষের আবাস ভূমির স্বাধীন সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম হবে “বাংলাদেশ”। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়ানো হলো। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ষড়যন্ত্র জাতির পিতা বুঝতে পারলেন। ৭ মার্চ’৭১ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে) এ ১৮ মিঃ ৩৫ সেকেন্ডের এক ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বললেন- “...এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...। জাতির পিতা বুঝতে পেরে ছিলেন যে যেকোন সময় সামরিক জান্তা তাঁকে গ্রেফতার করতে পারে। তাই তিনি পরবর্তী করণীয় সর্ম্পকেও দিক নিদের্শনা দিলেন। ৭ই মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধুকে বিছিন্নতা বাদি হিসাবে চিহ্নিত করতো। উক্ত সভায় দশ লক্ষাধিক জন সমাবেশ ঘটে ছিল। স্বাধীনতা ঘোষনা দিলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এক যোগে সবাই কে হত্যা করবে। তাই তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষনা দিলেন না। পরোক্ষ ভাবে স্বাধীনতা ঘোষনা দিলেন। তিনি বললেন “ যার কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন।” সকল বাঙালি জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষনার কথা বুঝতে পারলেন। ৬ মার্চ’৭১ বাঙালিদের আন্দোলন সংগ্রাম স্তব্ধ ও নির্যাতনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানি নিষ্ঠুরতম বেলুচি পাকিস্তানি সেনা লেঃ জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক বাহিনী প্রধান করে পাঠালেন। পাকিস্তান সরকার হিন্দুদের শায়েস্থা করতে হবে বলে কিছু অশিক্ষিত অমানবীয় বিহারী যুবকদের সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে বাংলাদেশে পাঠালেন”। ১৪ মার্চ’৭১ জাতির পিতা ৩৫টি নির্দেশ দিলেন। তিনি স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ রাখতে বললেন। ১৫ মার্চ নতুন কুট কর্ম-কৌশল নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ১৬ মার্চ থেকে কাল ক্ষেপন ও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের প্রস্তুতি মূলক কার্যাদি করার জন্য সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রহসন মূলক আলোচনা শুরু করেন। গোপনে গোপনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও গোলা বারুদ আনতে থাকেন। ২১ মার্চ’৭১ পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগড়িষ্ট সাধারণ পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী পিপলস পাটি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো তার ১২ জন উপদেষ্টাসহ আলোচনায় অংশ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশে এলেন। ২৫ মার্চ পৌঁনে ৬টায় আলোচনা অসমাপ্ত রেখে শপথ ভংগ করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট গোপণে বিশেষ বিমান যোগে পশ্চিম পাকিস্তান চলে গেলেন। যাবার পূর্বে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক লেঃ জেনারেল টিক্কাখান ও অন্যদের দিয়ে বাঙালি নিধন যজ্ঞ চালানোর জন্য “অপারেশন সার্চলাইট” পরিকল্পনা চুড়ান্ত করে অনুমোদন দিয়ে গেলেন। অপারেশ সার্চ লাইটের নৃশংসতা দেখার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো তার সফর সঙ্গী সহ ঢাকায় রয়ে গেলেন। পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি সৈনিক, ইপিআর ও অন্যান্যদের নিরস্ত্র করে আটক করতে থাকলো। অবস্থা বুঝে বাঙালি সৈনিক ও ইপিআর গণ অনেকে অস্ত্র নিয়ে কেহ কেহ জীবন বাঁচানোর জন্য খালি হাতে পালিয়ে এলেন। কিছু বাঙালি সৈনিক কে তাদেরই সাথে চাকুরি করা বিহারী পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করলো। ২৫ মার্চ’৭১ রাত সাড়ে ১১টার পর টিক্কা খান মর্টাশেল, কামান ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র নিয়ে “অপারেশন সার্চ লাইট” শুরু করে। তারা একযোগে পিলখানা ইপিআর হেড কোয়ার্টার, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহরুল হক হল), ঢাকা বিশ^ বিদ্যালয়ের অন্যান্য হল ও ঢাকার অন্যান্য স্থানে আক্রমণ করে। ঢাকা সহ অন্যান্য শহরে গণ হত্যা শুরু করে। নিরীহ, ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। পাখির মত লোক হত্যা করে। বস্তি ও অন্যান্য স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাকিস্তানি সামরিক শাসক যেন বাঙালিদের উপর মুক্তিযুদ্ধ চাপিয়ে দিল। দেশের সার্বিক অবস্থা দেখে ও বুঝে ২৬ মার্চ’৭১ রাত সোয়া ১২ টায় বঙ্গবন্ধু গোলাপী ও আকাশি রংয়ের দুইটি কাগজ নিয়ে তাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনাটি এক সিটে ইংরেজি এবং আরেক শিটে বাংলার লেখালেন। তারপর রাত ১২-২০ মিঃ এর পর ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বর নিজ বাড়িতে উপস্থিত নেতা/কর্মীদের সম্মূখে বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। তারপর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণীর কপি ওয়ারলেশে পাঠানোর জন্য ইপিআর হেড কোয়ার্টার ও ঢাকা মগবাজারস্থ ওয়ারলেশ অফিসে পাঠানো হয়েছিল। জাতির পিতার এই স্বাধীনতার ঘোষণাটি ইপিআর এর ওয়ারলেশ ও মগবাজারস্থ অফিসের ওয়ারলেশের মাধ্যমে চট্রগ্রাম সহ সারা দেশে প্রেরণ করা হয়েছিল। জাতির পিতা পরে আর একটি বাণী লিখে বলদা গার্ডেনে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। ৭ মার্চের পর দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে জাতির পিতার নির্দেশে বলদা গার্ডেনে অস্থায়ী একটি ওয়ালেশ বসানো হয়েছিল। বলদা গার্ডেন থেকেও স্বাধীনতা বার্তার ম্যাসেজ টি ট্রান্সমিট করে দেশের সবর্ত্র জানানোর হয়েছিল। মেসেজ টি ট্রান্সমিট করে বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিত করে ছিলেন। উপস্থিত নেতা কর্মীদের সম্মুখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, শেষ বাণী ও মুক্তিযুদ্ধের কথা ঘোষণা করেছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার একটিতে বঙ্গবন্ধু বলে ছিলেন- “এই-ই হয়তো আপনাদের জন্য আমার শেষ বাণী হতে পারে। আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি- যে যেখানেই থাকুন, যে অবস্থাতেই থাকুন এবং হাতে যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। তত দিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান যত দিন না দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বাংলা দেশের মাটি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে এবং চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে। জাতির পিতার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা টি ছিল বাঙালি জাতির জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ও লড়াইয়ের চুড়ান্ত পর্ব। জাতির পিতা মুক্তিযুদ্ধের আহ্বানে বলে ছিলেন-যে অবস্থাতেই থাকুন এবং হাতে যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। তত দিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান যত দিন না দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বাংলা দেশের মাটি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে এবং চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে। জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষণার ওয়্যারলেসের মেসেজ আমাদের তদানীন্তন সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক এ.কে শামসুদ্দিন ২৬ মার্চ সকালে পেয়েছিলেন। তিনি জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষণার ওয়্যারলেসের মেসেজ পাওয়ার পর ১১ টার দিকে এসপি সাহেব কে ডেকে ট্রেজারি খুলে সকল অস্ত্র ও গোলাবারুদ এম.এন.এ জনাব মো: মোতাহার হোসেন তালুকদার ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতা/কর্মীদের হাতে তুলে দিয়ে ছিলেন। আমাদের সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার তদানীন্তন ওসি জনাব মো: আব্দুল হামিদ ২৬ মার্চ সকাল ৮-৩০ টার দিকে জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষণার ওয়্যারলেসের মেসেজ পেয়ে ছিলেন। ওসি সাহেব মেসেজ টি এনে এমপিএ জনাব মো: আব্দুর রহমান সাহেবের কাছ দিয়ে ছিলেন। জনাব মো: আব্দুর রহমান মেসেজটির বঙ্গানুবাদ করে লিফলেট করিয়ে বিলির ব্যবস্থা করে ছিলেন। সবাইকে স্বাধীনতা ঘোষণার কথা জানানোর জন্য তিনি কয়েকটি মাইক নামিয়ে দিয়ে ছিলেন। ২৬মার্চ’৭১ রাত ৮.০০ টার দিকে করাচি থেকে পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণ প্রদান করেন। ঐ বেতার ভাষণে আওয়ামী লীগ কে নিষিদ্ধ এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করার কারণে জাতির পিতাকে দেশদ্রোহী হিসাবে বিচারের ঘোষণা দিয়ে ছিলেন। তিনি বলে ছিলেন- “...মৃত্যুই রাষ্ট্রদ্রোহীতার একমাত্র সাজা ...Sheik Mujib is a traitor and this time he and his party Awami league shall not go unpunished... আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা, ইপিআর, আনসার ও ছাত্র জনতা প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছিলেন। কসাই টিক্কা খান বলে ছিলেনÑ ম্যায়নে শেখ ছাবকা ওহফবঢ়ফবহপব করনা এলান আপনা কানসে শোনাহুয়া... ধৎৎবংঃ যরস রাত ১.১০ টার পর জাতির পিতাকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা সেনা নিবাসের অভ্যন্তরে আদমজী কলেজে রাখা হয়। সকালে ফ্লাগ স্টাফ হাউসে নিয়ে সারা দিন আটকে রাখা হয়। সন্ধ্যায় অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ৩ দিন পরে জাতির পিতাকে পশ্চিম পাকিস্তানেরন করাচি নিয়ে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। ভুট্টো “অপারেশন সার্চ লাইট” দেখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে ছিল। তিনি ২৫ শে মার্চে পাকিস্তানি হানাদারদের নৃশংসতা দেখেন। তিনি ২৬ মার্চ সকালে সামরিক প্রহরায় তার সফর সঙ্গীদের সহ ঢাকা ত্যাগ করেন। তিনি করাচি বিমান বন্দরে পৌছে পাকিস্তানি হানাদার সৈনিকদের নৃশংসতার প্রশংসা করে ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর’৭১ যৌথ বাহিনীর কাছে আত্ম সমর্পণ করে। ২৯/১২/৭১ তারিখে ভূট্টো ব্যর্থ প্রেসিডেন্ট আখ্যায়িত করে ইয়াহিয়া খান এর কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে নেন। ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক প্রধান হন। পরবর্তী নির্বাচনে তিনি পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। জাতির পিতাকে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে রাখা হয়েছিল। ৭ সেপ্টম্বর’৭১ হতে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি জান্তার সামরিক আদালতে প্রহসন মূলক বিচারের মাধ্যমে ৪ ডিসেম্বর’৭১ জাতির পিতার মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয়। ৩ ডিসেম্বর’৭১ বাঙালিদের মুক্তি যুদ্ধকে বিশে^ ভারত- পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নিদেশে যুদ্ধ হিসেবে রূপ দেওয়ার জন্য পাকিস্তান ভারতের বিমান ঘাটিতে আক্রমন করে। ইহার পর অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। চুক্তিটির প্রধান দুইটি শর্ত ছিল (১) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে (২) বাংলাদেশ সরকার যখনই চাইবে তখনই ভারতের সৈন্য বাংলাদেশ ত্যাগ করবে। পাকিস্তান কর্তৃক ভারতের বিমান ঘাটিতে আক্রমনের পর ভারত পাকিস্তানের উপর পাল্টা আক্রমন করে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ভারতের সৈন্য যোগ দেয়। সে দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে পরিনত হয়। ৬ ডিসেম্বর’৭১ প্রথমে ভারত তারপর ভুটান বাংলাদেশ কে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও আমাদের দেশের স্বাধীনতা বিরোধীরা বাঙালিদের মেধাশুন্য করতে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা তৈরী করে। আলবদর বাহিনী নেতৃত্বে ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তালিকা ধরে ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে অমানবীয়- নির্যাতন করে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বর’৭১ কিছু বুদ্ধিজীবীর লাশ রায়ের বাজার বধ্যভূমি, মিরপুর বধ্যভূমি ও অন্যান্য স্থানে পাওয়া গিয়াছিল। ২৬ মার্চ’৭১ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্র টি কালুর ঘাটে স্থানান্তর হওয়ার পর অধিবেশন শুরুতেই দুপুর ১.১০মি. জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষনার বার্তাটি পাঠ করেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এম,এ হান্নান। প্রথমে চট্রগ্রাম এই বেতার কেন্দ্রটির নাম করন করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। পরে বিপ্লবী শব্দটি বাদ দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নাম করণ করা হয়েছিল। এম.এ হান্নান এর জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষণার পাঠ কালুরঘাটস্থ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কয়েকবার পুনঃপ্রচার করা হয়েছিল। ২৭মার্চ সন্ধ্যায় কালুর ঘাটস্থ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার বার্তাটি পাঠ করে ছিলেন তদানীন্তন মেজর জিয়াউর রহমান। পূর্বেই সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সারাদেশ কে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করলো। ৪ এপ্রিল’৭১ মো: নুরুল আমিন ও অধ্যাপক গোলাম আযম সহ ইসলামী দলগুলোর নেতারা ১২ জন টেক্কা খানের সাথে সাক্ষাত করেন। পূর্ব পাকিস্তান সামরিক প্রশাসক টেক্কা খান বলেছিলেন “৭ ডিসেম্বর’৭০ এর সাধারণ নির্বাচন বাতিল করা হবে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করার কারনে প্রেসিডেন্ট  ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগ কে নিষিদ্ধ ও শেখ মুজিব কে দেশদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। প্রেসিডেন্টের সাথে আমার কথা হয়েছে। দেশদ্রোহী হিসেবে শেখ মুজিব এর বিরুদ্ধে মামলা করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। নির্যাতন, ধর্ষণ ও জ্বালাও পোড়াও করে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী ও ভারতের দালাল হিন্দুদের কে শেষ করে দেওয়া হবে। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করুন। পুনরায় সাধারণ নির্বাচন দিয়ে ইসলামী দলগুলোর হাতে পূর্ব-পাকিস্তানের ক্ষমতা দেওয়া হবে....”। টেক্কা খানের কথায় ইসলামী দলগুলোর নেতারা পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করলো। স্বাধীনতা বিরোধীরা পীচ কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও অন্যান্য বাহিনী করে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যোগ দিল। জীবনের ভয়ে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী ও এ দেশের অধিকাংশ হিন্দুরা ভারতে আশ্রয় নিল। ১০ এপ্রিল’৭১ ভারতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীঘ সাধারণ সম্পাদক জনাব এম. এন .এ. ও.১৭ ডিসেম্বর নির্বাচনে নিবার্চিত এম.পি.এদের নিয়ে গন পরিষদ করে বাংলাদেশ সরকার গঠন করল। ১৭ এপ্রিল’৭১ কুষ্টিয়া জেলা মেহেরপুর মহকুমার (বর্তমানে জেলা) বাংলা দেশ সরকার শপথ গ্রহণ করল। বৈদ্যনাথ তলার নাম করণ করা হলো মুজিব নগর। মুজিব নগর কে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী করা হলো। ২৩ এপ্রিল’৭১ বিকালে আমাদের বাঘাবাড়ি ঘাট এর দক্ষিণ পাড়ে পাকিস্তানি সৈন্য এলো। তখন বাঘাবাড়ি ঘাট এর বড়াল নদীতে ব্রীজ ছিল না। ফেড়িতে বাস ট্রাক প্রভৃতি যানবাহন পাড়া পাড় করা হতো। বাঘাবাড়ি ঘাটের উত্তর পাড়ে এস ডি ও এ কে শামসুদ্দিন এর তত্ত¡াবধানে বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, আনসার ও অন্যান্যরা বাঙ্কার করে প্রতিরোধ যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল। পাকিস্তানি সৈন্যরা এসেই মর্টার , এলএমজি ও অন্যান্য ভাড়ি যন্ত্রের মাধ্যমে গুলি ছুড়লো। এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি হল। মর্টারের একটি শেল ডায়া ও একটি নরিনা গ্রামে গিয়ে পড়ে ছিল। এলাকার মানুষ জন ভীত সন্তস্থ হয়ে আত্ম রক্ষার জন্য বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নিলো। পাকিস্তানি হানাদারেরা কিছু নদী পথ দিয়ে পাড় না হয়ে পাবনা ও ঈশ^রদী হয়ে আসার পরিকল্পনা করলো। সকল বিষয় বিবেচনা করে ২৫ এপ্রিল সকাল ৯ টায় আমাদের প্রতিরোধকারীরা ডিফেন্স ছেড়ে দিল। পাকিস্তানি হানাদারেরা নদী পার হয়ে। ত্রাস সৃষ্টি করে রাস্তার আশেপাশের গ্রাম সমূহের বাড়িঘর পোড়াতে পোড়াতে চান্দাইকোনা পর্যন্ত যায়। অন্য একটি পাকিস্তানি সৈন্য এসে স্বাধীনতা বিরোধীদের সহযোগিতায় চড়িয়া গনহত্যা করে। বাঘাবাড়ি ঘাটে পাড় হওয়া পাকিস্তানি সৈন্যরা রাতে চান্দাইকোনা থেকে দল ফিরে এসে উল্লাপাড়া অবস্থান করে। ২৬ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা শাহজাদপুর থানা সদর দখল করলো। স্বাধীনতা বিরোধী কিছু যুবক দিয়ে শাহজাদপুর, দ্বারিয়াপুর, মনিরামপুর বাজার ও পাড়ার হিন্দুদের দোকান ও বাড়িঘর লুটতরাজ করালো। কয়েকটি দোকান আগুন দিয়ে পোড়ালো। পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরা তাদের এদেশীয় দোসরদের সাথে নিয়ে ২৫ মার্চ’৭১ কাল রাত থেকে যৌথ বাহিনীর কাছে মাথা নত করে আত্ম সমর্পন করা পর্যন্ত  সারা দেশে যে হত্যা, গণ হত্যা, জ¦ালাও পোড়াও, নারী ধর্ষণ, নিযার্তন, চাঁদা বাজি,জোর করে হিন্দুদের ধর্মান্ত করণ, নিপীড়ন  সহ বিভিন্ন মানতা বিরোধী জঘন্য তম কাজ করেছে। ইহার কিছু কিছু দৃশ্য সাহসী সাংবাদিক গণ ক্যামেরাতে ধরে রেখে ছিল। স্বাধীনতার পর আমেরিকা সহ বিভিন্ন দেশের টেলিভিশন প্রামান্য চিত্রের কিছু কিছু প্রচার করেছিল। এই নৃশংসতার দৃশ্য দেখানোর পূর্বে বিজ্ঞপ্তি দেখানো হতো “ এই অনুষ্ঠান শিশু এবং দুর্বল চিত্রের বয়স্ক লোকদের দেখা নিষেদ্ধ”। মহান মুক্তিযুদ্ধ কী, কিভাবে যুদ্ধ করতে হবে, কতদিনে দেশ স্বাধীন হবে, একটি প্রশিক্ষিত ও আধুনিক অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত পেশাদার হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধ যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন সম্ভব কিনা। ভারত বহি বিশ্বের চাপে বাংলাদেশ কে সহযোগিতা করতে পারবে কী না ইত্যাদি বোঝার বয়স তখন আমার হয় নাই। আমি তখন রতন কান্দি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। ২৫ মার্চ রাতে “ অপারেশন সার্চ লাইট” এর নৃশংসতা ও পরবর্তীতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গণ হত্যা, লুণ্ঠন, জ¦ালাও পোড়াও , নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণ সহ বিভিন্ন মানবতা বিরোধী কাজের কথা সকলের আলোচনা ও স্থানীয় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এ্যাড.জনাব মো: আব্দুর রহমান স্যারের কাছ থেকে জাতির পিতার স্বাধীনতা ঘোষণা, শেষবাণী ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের আহŸান ও অন্যান্য সব কথা শুনে জাতির ক্রান্তিকালে আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন পণ অংশ গ্রহন করেছিলাম। ২৫ নভেম্বর’৭১ পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের দুস্কৃতিকারী আখ্যা দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ৫০০-২০০০/- টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। ১ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের যাতে কেউ আশ্রয় না দেয় সেই জন্য প্ররিক্ষা অর্ডিন্যান্স ও প্রতিরক্ষা আইন বলবৎ করা হয়।
আমি তিনটি “হিট এন্ড রান” একটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করার জন্য ও পাকিস্তানি আর্মি বাহি ট্রেন আক্রমন করার জন্য এ্যাম্বুস। বেলকুচি থানা আক্রমণ যুদ্ধ, বেলকুচি উপজেলার কল্যানপুর ও শাহজাদপুর থানার ধীতপুর নামক স্থানে পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়েছি। “জয় বাংলা” রণ ধবনি ছিল  আমাদের প্রধান রণধবনি। “জয় বাংলা” রণ ধবনি দিয়ে আমরা পাকিস্তানি সৈণ্য ও রাজাকারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। জয় বাংলা রণধবনি দিলে আমাকে সাহসী ও আত্ম বিশ্বাসী করে তুলতো। আমি প্রেরণা পেতাম। আমি দুই জন গ্রুপ কমান্ডারের অধীনে যুদ্ধ করেছি। ১. জনাব মো: আব্দুল মান্নান,২. বাবু রবীন্দ্র নাথ বাগচী। তোমরা লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। আমরা চাই তোমরা উচ্চশিক্ষিত মানবীয় গুণসম্পন্ন দেশ প্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠো। এ দেশ তোমাদের হাতে দিয়ে গেলাম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়লে তোমরা সব জানতে পারবে। আমার অনুরোধ- “তোমরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসটি জেনে নিও। নিজের কথা ও কাজে সৎ থেকো। মনে রেখো- আমরা রক্তে পাওয়া দেশ ও দেশের পতাকা তোমাদের কাছে দিয়ে যাচ্ছি। তোমরা দেশ কে মায়ের মতো ভালোবাসবে। তোমরাই পারবে দেশ টাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করো। মনে রেখ নিজের কাজটা সততার মাধ্যমে সম্পন্ন করাই সবচেয়ে বড় দেশ প্রেম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমরা আত্ম বিশ্বসী ও ধৈর্যশীল থেকো। দেশটা তোমার শেকড়। সেই শেকড়টাকে। তোমরা ভূলে যেও না। আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ কে হানাদার মুক্ত করেছি। তোমরা সেই সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। 
তোমরা লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। আমরা চাই তোমরা উচ্চশিক্ষিত মানবীয় গুণসম্পন্ন দেশ প্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠো। এ দেশ তোমাদের হাতে দিয়ে গেলাম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়লে তোমরা সব জানতে পারবে। আমার অনুরোধ - “তোমরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসটি জেনে নিও। নিজের কথা ও কাজে সৎ থেকো। তোমরা সুযোগ সুবিধা মতো ঢাকাস্থ মিরপুর জল্লাদ খানা বধ্য ভূমি পরিদর্শন করিও। এই বধ্য ভূমিতে আজ পর্যন্ত ৩৯ জন শহীদের সন্ধান ও পরিচয় পাওয়া গেছে। স্থানীয় জন সাধারণের কাজ থেকে জানা গেছে আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বে  ঢাকার বিভিন্ন বধ্য ভূমিতে ৩৯ জন শহীদ কে নৃশংসভাবে শিরচ্ছেদ্দ করে হত্যা করা হয়েছে। এই সকল শহীদের লাশ এনে মিরপুরের ওয়াসার পানি ভর্তি পাম্প হাউস/গহবরে/ইন্দারায় ফেলেছিল।  তোমরা প্রত্যেকে এলাকার গন হত্যা বধ্য ও নির্যাতন স্থানে যাবে। এখনও বয়স্ক প্রত্যক্ষদর্শী মানুষ জন বেঁচে আছেন। তাদের কাছ থেকে পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নৃর্শসতার কথা শুনবে। এমনে রেখো- আমরা রক্তে পাওয়া দেশ ও দেশের পতাকা তোমাদের কাছে দিয়ে যাচ্ছি। তোমরা দেশ কে মায়ের মতো ভালোবাসো। তোমরাই পারবে দেশ টাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করো। মনে রেখ নিজের কাজটা সততার মাধ্যমে সম্পন্ন করাই সবচেয়ে বড় দেশে প্রেম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তোমরা আত্ম বিশ্বাসী ও ধৈর্যশীল থেকো। দেশটা তোমার শেকড়। সেই শেকড়টাকে। তোমরা ভূলে যেও না। আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ কে হানাদার মুক্ত করেছি। তোমরা সেই সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। চিঠিটি আমি মহান মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ে যা দেখেছি, এম.পি.এ জনাব মো: আব্দুর রহমান স্যারের ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শী কাছ থেকে যা শুনেছি ও পরবর্তীতে বিভিন্ন বই/পত্রিকায় পেয়েছি সেই সব তথ্য লিখেছি। তোমরা সবাই ভালো থাকো।  
  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK