রবিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ৩ মাঘ ১৪২৭
ঢাকা সময়: ০৫:৪০

স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে

আবেদ খান :  একটা বিশেষ ঘটনা দিয়ে শুরু করি। তখন দৈনিক ইত্তেফাক মোনায়েম খানের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে কেবলমাত্র। মুজিব ভাইকে বাংলাদেশের মানুষ পাক-সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে মুক্ত করে এনেছে। সংগ্রামী ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ বিশাল জনসমুদ্রকে সাক্ষী রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ভূষিত করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে। আজ সমগ্র বিশ্বের কণ্ঠে তার এই উপাধি নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে স্থায়ী হয়ে গেছে। বলছি ঠিক সেই সময়টির কথা। যদিও তখন আমরা তাকে ‘মুজিব ভাই’ বা ‘লিডার’ বলে সম্বোধন করতাম।
যেদিনের কথা বলছি, সেদিনের সেই সময়টায় ইত্তেফাক অফিসের বার্তা বিভাগের চেহারাটা কেমন ছিল তার এক ঝলক চিত্র এখানে বর্ণনা করি। বিকেল লুটিয়েছে সন্ধ্যার দেয়ালে। বার্তা বিভাগে কেবল শুরু হয়েছে সন্ধ্যার শিফট। রিপোর্টিং-এর টেবিলগুলো ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে। সেখানে বসে আছেন সৈয়দ শাহজাহান। এসেছেন রিপোর্টার আমির হোসেন আওয়ামী লীগ-সংক্রান্ত রিপোর্টের ঝাঁপি নিয়ে। চিফ রিপোর্টারের চেয়ারে উপবিষ্ট পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু হত্যার এবং কারাগারে চার নেতার হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত তাহের উদ্দিন ঠাকুরও অতিশয় ব্যস্ত। রিপোর্টার নজরুল সাহেবও নিমগ্ন হয়ে আছেন লেখায়।
এদিকে সাব-এডিটর হিসেবে ডেস্কে আছেন শাহাবুদ্দিন ভূঁইয়া, শহিদুল হক, ইয়াহিয়া বখত, আমি। শিফটের দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদউল্লাহ, চিফ সাব-এডিটর আসফুদ্দৌলা রেজা। বার্তা সম্পাদক এবং নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন সিরাজুদ্দিন হোসেন। তিনি তখনও এসে পৌঁছননি।
আমরা সবাই শিফট শুরুর আগে একটু গল্পগুজব করছি। এর মধ্যেই সৈয়দ শাহজাহান উচ্চৈঃস্বরে জানালেন মুজিব ভাই ইত্তেফাক অফিসে আসবেন বলে খবর পাঠিয়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো অফিস চঞ্চল হয়ে উঠল। কখন আসবেন তিনি? ক’টায়? আর কে কে আসছেন?- এসব প্রশ্ন ভেসে বেড়াতে লাগল অফিসময়। আমরা যে যার মতো নিজের নিজের চেয়ারে বসে পড়লাম, সামনে টেনে নিলাম নিউজপ্রিন্টের প্যাড। যেন এখুনি তিনি এসে পড়বেন। সিরাজ ভাই একটু পরে এলেন অফিসে। তার অফিসে প্রবেশটাও বেশ রাজকীয়।
আমরা সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষ। বাঘ যখন জঙ্গলে হাঁটে তখন চারদিক যেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়, সিরাজ ভাই যখন ইত্তেফাক অফিসের চত্বরে পা রাখতেন তখন সেখানকার অবস্থাটা তেমনই হয়ে যেত। তিনি কারও সঙ্গে খুব একটা কথাই বলতেন না। হাতের তর্জনি এবং মধ্যমার ফাঁকে থাকত জ্বলন্ত সিগারেট বা হাতে গোটা চারেক উইলস সিগারেটের প্যাকেট আঁকড়ে তিনি দ্রুত কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সোজা তার পর্দা ঝোলানো রুমটাতে ঢুকে পড়তেন। বগলে আটকে থাকত কিছু বই ম্যাগাজিন। উর্দু, বাংলা, ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত।
সিরাজ ভাই অফিসে ঢোকার পরই সৈয়দ শাহজাহান ভাই সোজা তার কক্ষটিতে ঢুকে আমতা আমতা করে বললেন, একটু আগে জানা গেছে যে মুজিব ভাই এখানে আসবেন খানিক পরে। সিরাজ ভাই খবরটি শুনলেন, তারপর ঘাড় গুঁজে লিখতে শুরু করলেন। আমরাও কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
নেতা আসছেন ইত্তেফাক অফিসেÑ এই খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য। গাড়ির সংখ্যা কমে যাচ্ছেÑ বাড়ছে উৎসুক জনতার প্রতীক্ষা। মাঝে মাঝে নজরুল সাহেব আমির হোসেন জানাচ্ছেন বার্তা বিভাগে, রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি। রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা সবার। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনও সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন হয়নি, রেসকোর্স ময়দান তখনও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে ওঠেনি, বিশ্বসেরা সেই ভাষণ তখনও উচ্চারিত হয়নি। এদিকে বার্তা বিভাগের আমরা সবাই তখন সুবোধ বালকের মতো টেলিপ্রিন্টার থেকে নিউজ গ্যালি ছিঁড়ে বাছাই করছি, সাজাচ্ছি, অনুবাদ করছি। ভাবখানা যেন কাজ নিয়ে কত ব্যস্ত আমরা।
ঠিক এই সময় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। সৈয়দ শাহজাহান ভাই এবং আমীর হোসেন ভাই যেতে দৃপ্ত পদক্ষেপে ঢুকলেন মুজিব ভাই। সঙ্গে এলেন তাজউদ্দীন সাহেব, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ফণীভূষণ মজুমদার, কুদ্দুস মাখন, তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দ আহমেদ- এমনি আরও বেশ কয়েকজন। আমাকে এবং সংশোধনী বিভাগের গোলাম মোর্তজা ভাইকে (জিএম ইয়াকুবের বড় ভাই এবং ন্যাপ নেতা) দেখে প্রাণখোলা হাসি হেসে বললেন, সিরাজ বুঝি সব লালদের আমদানি করেছে ইত্তেফাকে। তারপর আমার মাথার চুলগুলো নেড়ে দিয়ে বললেন, চাচী কেমন আছেন? তার পেটের সমস্যা যায়নি এখনও? আর মন্টুকে বলিস আমার সঙ্গে দেখা করতে। (মন্টু মানে আমার মেজভাই, তার নিঃশর্ত অনুজ প্রতীম সহচর।)
এরপর তিনি অফিসের সবার সঙ্গে দেখা করলেন। বার্তা বিভাগের, সংশোধনী বিভাগের, মফঃস্বল বিভাগের প্রত্যেকের সঙ্গে কাজ নিয়ে কথা বললেন। এর মধ্যে কয়েকবার তিনি সিরাজ ভাইয়ের কথা জানতেও চেয়েছেনÑ বলেছেন সিরাজ বোধহয় লিখছে, ওকে এখন ডিস্টার্ব করার দরকার নেই। আমি এখন তোদের সঙ্গে গল্প করি। ওর কাজ শেষ হলে আমি ওর সঙ্গে কথা বলে তারপর যাব।
মুজিব ভাইয়ের এই একটি ঘটনা থেকে এই দেবতুল্য মানুষটিকে চেনা যায় অনেকখানি। সকলকে আপন করে নেওয়ার এই অসাধারণ গুণ আমি তার দুই কন্যার মধ্যেও প্রত্যক্ষ করেছি।
খুব হালকা মনে পড়ে আরেকটা পুরনো কথা। সেই যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময়। আমরা থাকতাম নারিন্দার বসুবাজার লেন। সেই পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে ঢাকার ঐ অংশটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ব্রিটিশ আমলের অনেক বিপ্লবীর ঠিকানা ছিল ঐ এলাকা। তাদের কেউ কেউ দেশ বিভাগের পরপরও কয়েক বছর থাকতে পেরেছিলেন এদেশে। দেশ বিভাগের কারণে আমার পিতার কর্মস্থল কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল। পিতার কর্মক্ষেত্র ছিল দৈনিক আজাদ। চাচা শ্বশুরের প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। আমাদের ঢাকার বাড়িটি পরিচিত ছিল আজাদ ম্যানেজারের বাড়ি হিসেবে। আর একটা বৈশিষ্ট্য ছিল এই বাড়িটি ঘিরে। সেই আমলের তাবৎ প্রগতিশীল রাজনীতিকদের গোপন আবাস ও কর্মস্থল হয়ে উঠেছিল আমাদের বাড়িটি। পিতা ছিলেন মুসলিম লীগ সমর্থক। মুসলিম লীগের একাংশ আমাদের বাসায় আসতেন আড্ডা দিতে। কিন্তু একই সঙ্গেই আর একটি বিষয়ও খুব জমজমাট ছিল এই বাড়িটিতে। মুসলিম লীগ বিরোধীদের, বিশেষ করে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির বাঘা বাঘা বিপ্লবীদের গুপ্তকেন্দ্র ছিল এই ঠিকানা। এখানে বিভিন্ন সময় এসেছেন তাজউদ্দীন সাহেবের মতো কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাও। আত্মগোপনকারী বাম নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন বাম রাজনৈতিক কর্মী আমার মেজভাই মন্টু খান। আগেই বলেছি, তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের নিঃস্বার্থ ও নিঃশর্ত শিষ্য। আমাদের বাড়িতে প্রায়শই থাকতেন খোকা রায়। তাকে আমরা জানতাম আজিজ ভাই হিসেবে। তার স্ত্রী যুঁইফুল রায় তো থাকতেনই আমাদের পরিবারের সঙ্গে আয়েশা আপা নামের পরিচয়ে। এসব কথা অবশ্য অন্য কোথাও অন্য প্রসঙ্গে বলা যাবে।
আমাদের এই বসুবাজার লেনের ঠিকানায় এক রাতের দিকে একজন এলেন এবং আমার মেজভাই তাকে নিয়ে এলেন মায়ের কাছে। তখন পূর্ব বাংলায় নির্বাচনের আয়োজন চলছে। মুসলিম লীগ তাদের গুণ্ডাপাণ্ডা এবং অর্থবল ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে রীতিমতো মহড়া দিচ্ছে। আমাদের এলাকায় মুসলিম লীগের তেমন হাঁকডাক ছিল না বটে, তবে ছিল গোয়েন্দাদের অদৃশ্য তৎপরতা। আমাদের বাড়ি এবং আশপাশের পাঁচটা বাড়ির ওপর ছিল তাদের প্রবল নজরদারি। এর ভেতরেই মেজভাই তাকে নিয়ে এলেন মায়ের কাছে। মাকে তিনি বললেন, চাচী কোনোভাবেই চাচাকে কিন্তু ভোট দিতে দেবেন না। আমাদের বাড়িতেই তখন কমপক্ষে ২৫-৩০টা ভোট। তবে পিতা ছাড়া মুসলিম লীগের বাক্সে ভোট দেওয়ার কেউ নেই। কেবল আমার মা ‘পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য’ বিবেচনায় যদি দিয়ে ফেলেন সে-জন্যই তার আগমন এবং এই দাবি। আমি ঐ কাহিনি পরে শুনেছি আমার মা এবং মেজভাইয়ের কাছে। তিনি মানে মুজিব ভাইকে ক’দিন পরে ঠিকমতো চিনে আলোড়িত হয়েছি যখন আজাদ পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় যুক্তফ্রন্টের প্রথম নির্বাচিত মন্ত্রীদের শপথ নেওয়ার ছবিটি ছাপা হয়। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল এটাও। কত সহজে তিনি মানবচিত্ত জয় করতে পারতেন, সেটা আমার মায়ের মন বদলানো থেকেই বোঝা যায়। আমার পিতা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া মানেই হ্যারিকেন মার্কায় ভোট দেওয়া। কিন্তু মুজিব ভাই যে কাজটি করলেন, তা হলো নির্বাচনের জন্য অন্দরমহলকে বশীভূত করা। ব্যক্তিত্ব দিয়ে, কথা এবং আন্তরিকতা দিয়ে কণ্ঠের মায়াজাল বিস্তার করে মন্ত্রমুগ্ধ করার অসাধারণ দক্ষতা ছিল তার।
আগেই বলেছি আমাদের বাড়িতে বাম ঘরানার প্রবল প্রতাপ ছিল। ’৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির জন্ম হলো। তখন বাড়ির বেশিরভাগই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সমর্থক হয়ে গেলেন বটে; কিন্তু পরিবারে মুজিব ভাইয়ের প্রভাব বা সমর্থনে এতটুকু ঘাটতি হলো না। যে কোনো রাজনৈতিক প্রয়োজনে মন্টু খানের উপস্থিতি তার কাছে খুবই কাক্সিক্ষত ছিল। আর যে কোনো মিছিল বা মিটিংয়ে মন্টু খান ছিলেন একজন অনিবার্য কর্মী। মিছিলের সামনের সারিতে প্ল্যাকার্ড হাতে এবং স্লোগানে গলা ফাটানোয় তিনি সর্বদা অগ্রগামী। দেশে ধরপাকড় যখনই হতো তখন পুলিশ আসত বাড়ি ঘেরাও করে তাকে তুলে নিয়ে যেতে। গোয়েন্দা গিজগিজ করত চারপাশে। এলাকার মানুষ জানত মন্টু খান, আবদুল হালিম ওদিকে শেখ মুজিব-সমেত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেককেই পুলিশের বাহনে জেলখানায় ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের জন্য আরও একটা আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে শুরু-শিষ্যকে বিভিন্ন সময়ে একই দিনে জেলখানার ভিজিটর রুমে যাওয়া পড়ত। মন্টু খানের ছিল ভারী এক জোড়া গোঁফ। সাক্ষাতের দিনে ওরা দুজনই আসতেন সাদা ধবধবে পোশাক পরে। মন্টু খানের গোঁফ একটু ছেঁটে মুজিব ভাইয়ের মতো একই রকমের করে দুজনই আসতেন একসঙ্গে। গুরু একটু হেসে মায়ের সামনে এসে বলতেন, ‘বলুন তো চাচী, কোনটা মন্টু?’ আমার সরল সোজা মা একটু লাজুক হাসি হেসে নতস্বরে বলতেন, ‘চিনেছি, আর বলতে হবে না।’
এই ছিল আমাদের পরিবারের প্রিয় মানুষটির অসাধারণ রসিকতা। এসব নিয়ে বাড়িতে যে কত চর্চা হতো। এ-কথা জানার কিংবা জানানোর মতো আজ একজনও নেই। জানি না জননেত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিতে মন্টু খানের বা সেই সময়ের কথার ছিটোফোঁটাও মনে আছে কি না? মন্টু ভাই একটা ছবি সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। একটা অসাধারণ ছবি, যেটা এখন বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারের আমলে একটা মিছিলের ছবিÑ ওটা মুজিব ভাইয়ের তোলা। ‘মৃত্যুমুখী মানুষকে বাঁচাও’ স্লোগান-সম্বলিত ফেস্টুন নিয়ে মিছিলের পুরোভাগে আছেন মন্টু খান, বিশাল সেই মিছিলের অন্যদের মধ্যে আছেন আতাউর রহমান খান, মহিউদ্দিন আহমেদ-সমেত বেশ কয়েকজন নেতা। এই ছবিটা আমি ৩২ নম্বরে নিয়ে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের জন্য এবং তা সেখানে সযত্নে সংরক্ষিত হয়েছে।
তার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ দীর্ঘ করে লাভ নেই। একটা সর্বশেষ গুরু-শিষ্য তথ্য দিয়ে এই লেখার ইতি টানি। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে ইত্তেফাক-এর চাকরিতে ঢুকেছি আবার। তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নানাবিধ অত্যাচারে আমাদের পরিবার বিপর্যস্ত। আমি যুদ্ধে যাওয়ার কারণে পরিবারের সদস্যদের ভুগতে হয়েছে অনেকখানি। আর মন্টু খানের ওপর দিয়ে তো রীতিমতো ঝড় বয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক, বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন লেনদেন ইত্যাদি নানান তথ্য তাদের নথিভুক্ত। তিনি কোন্ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন সেটা পর্যন্ত খুঁজে বের করেছে তারা। আমার মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়াটা ছিল তার বিরুদ্ধে একটা বাড়তি অভিযোগ। সব মিলিয়ে যে পর্বতপ্রমাণ তথ্য তাদের ভাণ্ডারে সঞ্চিত হয়েছিল, তার কারণে তিনি পরিগণিত হয়েছিলেন অত্যন্ত বিপজ্জনক মানুষ এবং মুজিবের চর হিসেবে। কাজেই ক্র্যাকডাউনের কয়েকদিন পরেই তাকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। অমানুষিক নির্যাতনের ভেতরে দিয়ে তাকে কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ ৬টি মাস। সে-কাহিনি তিনি লিখে গেছেন তার রচিত ‘হায়েনার খাঁচায় অদম্য জীবন’ গ্রন্থটিতে। পাকি-বর্বরতার এবং পাশাপাশি অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তির একটি অনবদ্য দলিল হিসেবে গ্রন্থটি ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক পুরস্কৃতও হয়েছে।
বেশ কিছুদিন পরে তিনি যখন একটু হাঁটাচলা করতে পারছেন, সেই সময় একদিন আমাকে বললেন, তার সঙ্গে ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে যাওয়ার জন্য। আমি তো তৈরিই ছিলাম এক পা বাড়িয়ে। সময়মতো আমরা দুই ভাই রিকশা করে গেলাম নেতার কাছে। সেদিনের সেই দৃশ্যটির কথা আজও আশ্চর্য রকমের উজ্জ্বল হয়ে আছে স্মৃতিপটে। মুজিব ভাই তার বিভিন্ন সময়ের সাথীকে দেখে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। প্রিয় শিষ্যের নির্যাতনের কাহিনি শুনে এবং দেহের বিভিন্ন স্থানের ক্ষতচিহ্ন দেখে বাকশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন। এক সময় বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘মন্টু, তুই সারাটা জীবন আমার জন্য এত কষ্ট করেছিস। আজ আমার সেই সুযোগটি হয়েছে। তুই শুধু বল্ তোকে আমি কী দেবোÑ কী পেলে তুই খুশি হবি।’ আমার নির্লোভ ভ্রাতা শুধু তার নেতার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লিডার আপনার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা, যে স্নেহ পেয়েছি, তার বেশি কিছুই চাই না আমি।’ বঙ্গবন্ধু তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘এত লোক আমার কাছ থেকে এত কিছু নিয়ে গেল আর তুই কিছুই নিবি না, কিছুই চাইলি না!’ তিনি হাসিমুখে তার নেতাকে বলেছিলেন, ‘আপনি তো আমাকে কিছু চাইতে শেখাননি!’
আমার ভাণ্ডারে এর চাইতে সুন্দর, এর চাইতে সত্য, এর চাইতে পবিত্র স্মৃতি আর কি থাকতে পারে!
 
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

     FACEBOOK