শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ঢাকা সময়: ০৫:০৭
ব্রেকিং নিউজ

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে

৭৫তম জন্মজয়ন্তীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা

একটি অর্থনীতি বা সমাজ যখন এগিয়ে যায়, তখন সেখানে সমস্যা থাকতে পারে এবং বিভিন্ন কারণে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, হয়। শুধু বাংলাদেশে নয়, সব দেশেই এমনটি ঘটে, ঘটছে।
 
 
  • কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ
বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পালন করে চলেছেন। বিগত এক যুগ ধরে বাংলাদেশের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি আমরা লক্ষ করছি, এতে প্রধানত দুটি বিষয় কাজ করেছে। একটি হচ্ছে নেতৃত্ব, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনকল্যাণকামী চিন্তা-চেতনা উদ্ভূত নীতি-কাঠামো ও পারিপার্শ্বিকতা আর অপরটি হচ্ছে সেই অনুকূল পরিবেশে মানুষের শ্রম তথা কৃষক, কৃষি শ্রমিক, শিল্প ও অন্যান্য শ্রমিক, উদ্যোক্তাদের শ্রম। বিশেষ করে অতি ক্ষুদ্র (মাইক্রো) উদ্যোক্তারা যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। অন্যান্য যারা বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় শ্রম ও নেতৃত্ব দেন, তাদের কারণেও উন্নয়ন এগিয়ে চলেছে। সঠিক নেতৃত্ব না থাকলে অনুকূল পারিপার্শ্বিকতা সৃষ্টি হয় না এবং অগ্রগতি হওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। আমি মনে করি, উন্নয়নের অগ্রগতির জন্য অনুকূল পারিপার্শ্বিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে এটি কেমন করে তৈরি হলো? ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি অঙ্গীকার করা হয়। সেটি হচ্ছেÑ এদেশে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ-রাষ্ট্র তৈরি করা হবে। এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশ ও অন্যান্য খাতে যে কার্যক্রমগুলো শুরু করা হলো ২০০৯ সাল থেকে, সেই ধারাবাহিকতায় দেশ এগিয়ে চলে।
কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত দেশ আর্থ-সামাজিকভাবে ক্রমঅগ্রসরমান ছিল। এর মৌলিক ৩টি দিক আছে। এগুলো হচ্ছে : অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত দিক। এই ৩টি কিন্তু সমান্তরালভাবে চলতে হয়। তা না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। আর একটি বিষয় হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অংশ যেমনÑ ধনী, দরিদ্র, নারী, পুরুষ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী সকলকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা না হলেও উন্নয়ন টেকসই হবে না। কল্যাণ-রাষ্ট্র গড়তে হলে এই দুই ধারা সমান্তরালভাবে এগিয়ে যেতে হবে। যে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি বাংলাদেশ ২০১৬ সাল থেকে বাস্তবায়ন করছে, সেটির মূল কথাই হচ্ছে কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে আর্থ-সামাজিক বিকাশ ঘটাতে কাজ এবং সে-সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণও করতে হবে।
এখন পেছনে চলে যাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি মৌলিক দিক হলোÑ এদেশে একটি সমাজ হবে যেখানে সবাই তার অধিকার পাবে। সবাই মানব-মর্যাদায় বসবাস করবে। সেটি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-ভাবনার অনুসরণে প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে ৩টি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে। একটি হচ্ছেÑ এদেশে বৈষম্য থাকবে না। দ্বিতীয়ত; সবাই সমান মানবাধিকার ভোগ করবে। আর তৃতীয়ত; সবাই মানব মর্যাদায় বসবাস করবে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের সে-কথা- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ মানে হলো- নানাভাবে বঞ্চিত সকলের বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রাম। বিজয়ের পর যখন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এলেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন, তখন কিন্তু এ বিষয়টা বারবার বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। একটি ব্যাখ্যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। যদিও অনেকে মনে করতে পারেন, কথাটা খুব সাধারণ কিন্তু আমার কাছে এটি সাধারণ নয়। তিনি বলতেন, ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে।’ এই একটি বক্তব্যের মধ্যে পুরো একটি দর্শন নিহিত আছে। দর্শনটা হচ্ছেÑ সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন সাধন করতে হবে। অর্থাৎ যারা অগ্রসর এবং ধনী তাদের জন্য আমাদের বিশেষ কিছু করার দরকার নেই। তারা এমনিতে এগিয়ে যাবে। যারা বঞ্চিত দুঃখী তারা যাতে এগিয়ে যেতে পারে সে-ব্যবস্থা করতে হবে, তাহলে এই সমাজ একটি সমাজ হিসেবে এগিয়ে যাবে। কাজেই এই যে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে- এ কথার মধ্যে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবকেন্দ্রিক চিন্তা নিহিত আছে। এটি বঙ্গবন্ধুর দর্শন। তার মানবকেন্দ্রিক দর্শন। এতে রয়েছে তার মানবকেন্দ্রিক সমাজ চিন্তা, রাজনৈতিক চিন্তা, উন্নয়ন চিন্তা। সব কাজই করতে হবে মানুষকে কেন্দ্র করে। সেই ধারাবাহিকতা শেখ হাসিনা তার চিন্তা-ভাবনায় ধরে রেখেছেন। তার ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের যে অঙ্গীকারের কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, তা ওই ধারাবাহিকতায় এসেছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়েছে, বিশেষ করে বিগত এক যুগে। এ কথা আমরা সবাই জানি। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিদেশেও নন্দিত। ২০১০ সাল থেকে প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং ২০১৯ সালে তা ৮.১৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। করোনাকালে পৃথিবীর যে মুষ্টিমেয় দেশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, বাংলাদেশ সেগুলোর অন্যতম। রাজস্ব বছর ২০২০-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশে এবং ২০২১-এ ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২২ রাজস্ব বছরে আরও বেড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। মাথাপিছু আয় এই করোনাকালেও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর একটি কারণ রেমিট্যান্স হলেও দেশের অর্থনীতি কঠিন অবস্থায়ও সে-রকমভাবে স্থবির হয়নি; বরং আগের থেকে কম হারে হলেও এগিয়ে যাচ্ছে। এখন মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১০ সালেও ৭৮১ মার্কিন ডলার ছিল। সেখান থেকে এখন আমরা এই জায়গায় এসেছি। দ্বিতীয় হচ্ছে সামাজিক দিক। শিশুমৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে কমেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও এক বছরের কম বয়সী শিশু উভয় ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। মাতৃমৃত্যুর হারও কমেছে। জন্মের সময় প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়ে ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। প্রত্যাশিত গড় আয়ুতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সবার আগে। ভারতে ৬৮ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৭ বছর। নারীর ক্ষমতায়নে এবং উন্নয়নে বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়া সবার ওপরে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এক্ষেত্রে আমাদের যে লক্ষ্য সেখানে আমরা এখনও পুরোপুরি যেতে পারিনি। এখনও অনেক পথ বাকি। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা এগিয়ে আছি এবং এগিয়ে চলছি। অর্থাৎ বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সামাজিক উন্নতি হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি তো হয়েছেই।
২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২০ সালে এসে একটা ধাক্কা খেয়েছে। শুধু বাংলাদেশ একা নয়, সারাবিশ্ব ধাক্কা খেয়েছে। উন্নত হোক আর উন্নয়নশীল হোক, বিশ্বের সব দেশই ধাক্কা খেয়েছে। আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়ার দেশসমূহসহ পৃথিবীর সর্বত্র এই ধাক্কা লেগেছে। এর আগে কোনো মহামারি এ-রকম সারাবিশ্বে ছড়ায়নি। অনেক বড় মহামারি হয়েছে। অনেক মানুষ মারা গিয়েছে। কিন্তু সেগুলো হয়েছে কিছু কিছু অঞ্চলে। এবার সারাবিশ্বে। কোনো দেশই এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। বাংলাদেশও প্রস্তুত ছিল না। কেউ জানত না এ-রকম একটা মহামারি এসে সবকিছু ল-ভ- করে দেবে। তারপরও কিন্তু খুব দ্রুতই বাংলাদেশ সেটি মোটামুটি সামাল দিতে পেরেছে। এক. জীবন রক্ষা অর্থাৎ স্বাস্থ্য, টিকা দেওয়া, আক্রান্তের সেবা করা, আক্রান্তের হার কমিয়ে আনা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপদেশ দেওয়া, হাসপাতালের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, ডাক্তার-নার্সের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। ফলে তিনবার ধাক্কা এলেও সংক্রমণ অনেক দেশের তুলনায় তেমন গড়ায়নি।
উল্লেখ্য, প্রথম যখন বাংলাদেশ টিকা দেওয়া শুরু করে, ওই সময় বিশ্বের ১৩০টি দেশ একটা টিকাও দিতে পারেনি। বর্তমানে যাদের টিকা পাওয়ার কথা, শিশুসহ প্রায় সকলেই অন্তত এক ডোজ টিকা পেয়েছেন। অধিকাংশ দুই ডোজ এবং একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ পেয়েছেন। সবাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকা পেয়েছেন এবং কারও কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে। গৃহীত নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে দায়িত্বপ্রাপ্তরা; কিন্তু নেতৃত্বের ব্যাপারটা অনেক বড় এখানে এবং সেই নেতৃত্ব শেখ হাসিনা দিয়ে আসছেন।
অপর দিক হচ্ছে জীবিকা। লকডাউনের কারণে অর্থনীতি যথেষ্ট স্থবির হয়ে পড়েছিল। লকডাউনের সময় তো বটেই, অন্য সময়েও বিভিন্ন কারণে কাজকর্মে স্থবিরতা দেখা দেয়। কাজেই অনেক মানুষ নতুন দরিদ্র হয়। অনেক দরিদ্র মানুষ নিঃস্ব হয়। অসংখ্য মানুষ কাজ হারায়, বেকার হয় এবং অনেকে খাদ্য সংকটে পড়ে। তবে সার্বিকভাবে অর্থনীতি হ্রাসকৃত হারে হলেও এগিয়ে চলে।
খাদ্য সংকটে নিপতিতদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। সাথে সাথে দেশের বিত্তশালীরাও জনগণের পাশে দাঁড়ান। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে। আমরা সাধারণত কাউকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করি না; বরং অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়াই। তবে বিশেষ দুঃখ-দুর্দশা দেখলে অনেকেই আমরা সাধারণত ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়াই। এটা আমাদের চরিত্রের একটা গুণ। যেমন- বড় কোনো বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় হলে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। করোনাকালেও সে-রকম দেখা গেছে। তবে মানুষ যেমন দুর্দশাগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে তেমনি কিছু মানুষ চুরিও করেছে। এ বিষয়ে কিছুদিন আগে উচ্চারিত শেখ হাসিনার একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘যারা গরিবের ৫ কেজি আটা আর ১০ কেজি চালের লোভ সামলাতে পারে না, তাদের রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে ভিক্ষা করা উচিত।’ অপর দিকে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য সরকার বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দিয়েছে। অবশ্য কুটির ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো সময়মতো তেমন সহায়তা পায়নি। বর্তমানে অবশ্য এই উপখাতও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। যা কিছু পেয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উদ্যোগে- তিনবারে ৫ হাজার কোটি টাকা পিকেএসএফ ও মাঠ পর্যায়ে কাজ করে এমন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। এসব অতিক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পায়নি। কারণ ব্যাংক তাদের কাছে পৌঁছতে পারে না এবং তারাও ব্যাংকের কাছে পৌঁছতে পারে না।
মানুষের দুর্দশা লাঘবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টার আরও একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ২০২০-২১ সালের বাজেটে করোনাকালে অর্থনৈতিক ও খাদ্য সংকটে পড়া মানুষকে সহায়তা করার জন্য খাদ্য সহায়তাসহ সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় করা হয়েছে ৯ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। বাজেট বরাদ্দের প্রায় ৪ গুণ। কারণ মানুষের দুর্দশা লাঘব করতে হবে। এর জন্য খরচ বাড়ানো হয়েছে। এটা শেখ হাসিনার সকলের মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং মানবিক চিন্তা-চেতনার জন্যই সম্ভব হয়েছে। ভুখা মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকট দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সবার কাছেও যে সবকিছু পৌঁছে গেছে তা হয়তো নয়। তবে অবশ্যই বাজেট বরাদ্দ থেকে ৪ গুণ ব্যয় করে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জীবিকা সংরক্ষণের প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। বঙ্গবন্ধুর চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই পদক্ষেপ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের একটা বিশেষ দিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তিনি মানুষের কল্যাণ চান।
তার মানবকল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপের আরও দুটো উল্লেখযোগ্য উদাহরণের কথা বলা যেতে পারে। অসহায় গৃহহীনদের জন্য বাড়ি নির্মাণ। গৃহহীনদের হাজার হাজার বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। তবে দুঃখজনক যে, কিছু ধান্দাবাজ লোক এমনভাবে কিছু বাড়ি বানাচ্ছে যেগুলোর মান যথাযথ নয়। এত ভালো একটা মানবকল্যাণমুখী কর্মসূচিকে যারা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে না; বরং ধান্দা করছে, তাদের অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। অপরটি হচ্ছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্যও পাকা বাড়ি বানিয়ে দেওয়া এবং তাদের কাছ থেকে ভাড়া না নেওয়ার ঘোষণা। এটা দুঃখী মানুষের প্রতি সহানুভূতি উদ্ভূত চিন্তা। এরা কত টাকাই বা বেতন পায়? তারা ভাড়া দিয়ে তো থাকতে পারবে না।
এই পদক্ষেপগুলো শেখ হাসিনার সামগ্রিক চিন্তা-ভাবনার অংশ। সামগ্রিক চিন্তাটা হচ্ছে সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে এই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দারিদ্র্য নিরসনের কথা ধরা যাক। দারিদ্র্য অনেক কমে এলেও ২০১৯ সালে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দেশে দারিদ্র্যাবস্থার আর উন্নতি হয়নি; বরং এর ব্যাপ্তি ও গভীরতায় মহামারিটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু সমবেতভাবে অবস্থার মোকাবিলা করার চেষ্টা রয়েছে সরকারের। দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে অন্যান্য পদক্ষেপের সঙ্গে কৃষিতে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে এক্ষেত্রে কৃষি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দরিদ্র বেশির ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া কৃষির বাইরে অনেক কুটির, অতিক্ষুদ্র (মাইক্রো) শিল্প ও ব্যবসা বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, যেগুলো দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিমালিকানায় এ-রকম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার উৎসাহিত করতেন। তিনি বড় শিল্পকে রাষ্ট্রীয়করণ করেছিলেন এবং কুটির, অতিক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসাকে ব্যক্তি খাতে প্রসার লাভ করার জন্য সহায়তা দিয়েছিলেন।
অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য কৃষি এবং কুটির, অতিক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসার যেমন প্রয়োজন তেমনি দরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং বড় শিল্প ও ব্যবসায় এবং অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পের। সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির ভিত শক্ত করে গড়ে তোলার জন্য যেমনÑ কৃষি ও অকৃষি খাত, বিশেষ করে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ প্রয়োজনীয় তেমনি অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত ও টেকসই করার জন্য বিভিন্ন খাতে উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক বড় প্রকল্পও জরুরি। ভিত গড়ার উল্লিখিত অর্থনৈতিক কর্মকা- ছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি উল্লেখ করতে হয়। তা হলোÑ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা। সারাদেশে ১০০টি এ-রকম অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, বেশ কয়েকটির স্থাপন ইতোমধ্যে এগিয়ে চলছে। এগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্প গড়ে উঠবে। বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর আশপাশে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠবে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ব্যাকওয়ার্ড-ফরওয়ার্ড লিংকেজের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নানান ব্যবসা-বাণিজ্য আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে সহায়ক হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য যেমন সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে তেমনি পরিবেশের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ জরুরি। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা শুধু বাংলাদেশে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন তা-ই নয়, তিনি আন্তর্জাতিক পরিম-লে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন জলবায়ু পরিবর্তন নীতি-নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন, যা ব্যাপকভাবে নন্দিত এবং সেজন্য তাকে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নানা সংকটের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিও প্রভাবিত। বিশেষ করে, প্রয়োজনীয় আমদানি সংগ্রহে খরচ বাড়া, ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়া এবং রপ্তানি বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে। তবে বাংলাদেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় কম। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মতো। আশপাশের দেশগুলোতে এবং উন্নত বিশ্বে তা সাধারণত ৯ শতাংশ বা ততধিক। বর্তমানে রপ্তানি কমছে না বরং বাড়ছে। আগস্ট মাসে গত বছরের এ সময়ের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ৩৮ শতাংশ এবং রেমিট্যান্স বেড়েছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ (ঞযব উধরষু ঊফমব, ৪ ঝবঢ়ঃবসনবৎ ২০২২)। জ্বালানি তেলের দামও আন্তর্জাতিক বাজারে এখন আবার কমছে। ইউক্রেন থেকে রপ্তানি শুরু হওয়া এবং বিভিন্ন দেশে উৎপাদন বাড়ার আভাসের ফলে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের দামও আন্তর্জাতিক বাজারে কমছে। কাজেই আশা করা যায়, বাংলাদেশে আমদানি-সংশ্লিষ্ট মূল্যস্ফীতি আর তেমন বাড়বে না। একই সাথে দেশে যে সকল অসাধু ব্যবসায়ী অকারণে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়, তাদের নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারি তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নতি হওয়ার ফলেই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ এবং ইউক্রেন যুদ্ধ-উদ্ভূত সমস্যা মোকাবিলা করে আবার কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী উন্নয়ন ধারায় দ্রুতই ফিরে যাচ্ছে।
অর্থনীতির উচ্চতর পর্যায়ে উত্তরণ এবং টেকসইভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে কিছু বড় আকারের প্রকল্পের প্রয়োজন দেখা দেয়। যেমনÑ চলাচল এবং মালামাল পরিবহনের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, উৎপাদনে সহায়ক সেবা খাতসমূহ ইত্যাদি অনেক বাড়াতে হবে। এর মধ্যে যদি আমরা চলাচলের বিষয়ে কথা বলি, তাহলে সর্বাগ্রে আসবে পদ্মা সেতুর কথা। বিশ্বব্যাংক বলল তারা এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না। অন্যান্য সম্ভাব্য অর্থায়নকারীও না বলল। তখন শেখ হাসিনা ঘোষণা দিলেন যে, পদ্মা সেতু আমরা নিজেদের অর্থায়নে নিজেরাই তৈরি করব। তার এই একটা বার্তা দেশে তো বটেই, সারাবিশ্বে চলে গেল যে, বাংলাদেশকে আর এদিক-ওদিক ঠেলা দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ এখন শক্ত অবস্থানে। তারপর আইনগতভাবে কানাডার কোর্টে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে বাংলাদেশ যখন জিতে গেল তখন বিশ্ব-পরিম-লে দেশ আরও শক্ত অবস্থানে উন্নীত হলো। সিদ্ধান্ত নিয়েই নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হলো। বর্তমানে তা বাস্তব সত্য। ২৫ জুন ২০২২ প্রধানমন্ত্রী সেতুটি উদ্বোধন করেছেন এবং এখন তা উন্মুক্ত। এই সফলতা বিশ্ব-পরিম-লে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। তবে আসল বিষয় হলো- এই সেতুর ফলে পদ্মা নদী দ্বারা বিভাজিত দেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হলো। তদুপরি আশপাশের দেশ এবং অন্যত্রও দেশের সকল অঞ্চল থেকে সড়ক পথে যাতায়াত সহজতর হলো। ফলস্বরূপ অর্থনীতিতে অগ্রগতির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তারপর রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র। সেটির কাজও খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। অচিরেই জাতি এটা থেকে সুফল পেতে শুরু করবে। উন্নত এমন কী উন্নয়নশীল অনেক দেশে অনেক নদীর নিচ দিয়ে পারাপারের টানেল আছে। নদীর ওপরে পুল দিয়ে যানবাহন পার হচ্ছে, আবার নিচ দিয়েও। যানজট কমছে, দ্রুত চলাচল সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে টানেল হচ্ছে। আমরাও সেই জায়গায় চলে যাচ্ছি। এটিও একটি বড় প্রকল্প। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো ঢাকা মেট্রোরেল। ঢাকা মেট্রোরেলের মাধ্যমে আমরা চলাচলের ক্ষেত্রে আধুনিক যুগে প্রবেশ করছি। মেট্রোরেল ভারতে আছে। কলকাতায় বহু বছর ধরে আছে। বিভিন্ন উন্নত দেশে তো আছেই। এটি খুব দ্রুত চলাচলের জন্য উপযুক্ত। ঢাকার মতো একটি বড় যানজটের শহরের জন্য খুবই উপকারী হবে। শুক্রবার সকালে অর্থাৎ যে-সময় যানজট থাকে না, সে-সময় যেখানে যেতে মাত্র ১০ মিনিট লাগে, অন্য সময় লেগে যায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। প্রচুর সময় নষ্ট হয়। মেট্রোরেল খুব দ্রুত চলবে। শহরে যানজট কমবে নিশ্চয়ই। মেট্রোরেলে চড়ে সময়মতো যাতায়াত করা যাবে। তার মানে সময় বাঁচবে এবং কাজ বাড়বে। তারপর আরও একটি বৃহৎ প্রকল্প হচ্ছে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর। সেটির কাজও এগিয়ে চলছে।
এই যে বড় বড় প্রকল্প, এগুলোর দরকার আছে অর্থনীতি ও সমাজের আধুনিকায়নের জন্য এবং অগ্রগতি ত্বরান্বিত ও টেকসই করার জন্য, তবে খেয়াল রাখতে হবে অগ্রগতি যাতে টেকসই হয়, সে-জন্য সবাই যাতে এই প্রক্রিয়ায় ন্যায্যভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ বিভিন্ন খাত ও আর্থ-সামাজিক সব শ্রেণির সামঞ্জস্যপূর্ণ অগ্রগতি যাতে ঘটে, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। মানে একটি সার্বিকভাবে পরিকল্পিত সর্বজনীন অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। বড় প্রকল্প থেকেও সাধারণ মানুষ উপকৃত হতে পারে। যেমন- মেট্রোরেল অপেক্ষাকৃত কম খরচে সাধারণ জনগণ চলাচল করবে। সাশ্রয়ে এই সেবা পাবে। পদ্মা সেতু দিয়ে বাসে বা অন্যান্য যানবাহনে সাধারণ মানুষ চলাচল করবে। এখন তো আর নৌকার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না, ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, সময়ের অপচয় হয় না। তারপর সেতুর দুই পাশে অনেক অর্থনৈতিক ছোট ছোট কর্মকা- গড়ে উঠবে। সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। প্রাক্কলন করা হয়েছে পদ্মা সেতুর কারণে অর্থনীতির পরিধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে। আমি মনে করি, তা আরও বেশি হবে। কারণ নতুন নতুন অনেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই সেতুর কারণে গড়ে উঠবে। কাজেই পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়ন। আগামীতে নতুন বৃহৎ প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক মানুষের উপকারিতা এবং খরচের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে, যাতে বাজেট এবং বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল বিষয়ে কোনো সংকট সৃষ্টি না হয়। বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয়বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
একটি অর্থনীতি বা সমাজ যখন এগিয়ে যায়, তখন সেখানে সমস্যা থাকতে পারে এবং বিভিন্ন কারণে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, হয়। শুধু বাংলাদেশে নয়, সব দেশেই এমনটি ঘটে, ঘটছে। কাজেই নেতৃত্ব দূরদর্শী হলে বিদ্যমান, এমন কী সম্ভাব্য সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। আমরা দেখছি শেখ হাসিনা সমস্যাও চিহ্নিত করছেন। প্রয়োজনও চিহ্নিত করছেন সে-কথা আগেই বলা হয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আমরা ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বিবেচনা করতে পারি। এতে অনেকগুলো বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে সমাধান করার লক্ষ্যে। চিহ্নিত সমস্যাগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করছি। দেশে দুর্নীতি ব্যাপক। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে, তা কমিয়ে আনতে হবে। ব্যাংক খাতের সমস্যা চিহ্নিত করা আছে। সুশাসনে ঘাটতি আছে, দূর করতে হবে। আইনের শাসনে যা কিছু ঘাটতি আছে, তা দূর করার কথা বলা হয়েছে। তারপর কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার কারণে স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় মানুষ তেমন অবদান রাখতে পারছে না। সেটাও চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এর বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তরুণদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে, কারণ ‘তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’। তারপর নারী উন্নয়নের কথা চিহ্নিত করা আছে। নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। যাতে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন আরও ঘটে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তারপর শহর থেকে গ্রাম পিছিয়ে আছে। গ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। এখানে বলা আছে, ‘আমার গ্রাম আমার শহর’। এর মানে এই নয় যে, গ্রামকে শহর বানাতে হবে। শহরে যে সকল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে গ্রামেও সে-রকম প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলো ছাড়া আরও কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। আমি মনে করি, এই সমস্যা চিহ্নিতকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা ক্ষমতায় থাকেন, তারা সাধারণত সমস্যা দেখেন না; কিন্তু শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি ব্যতিক্রম। হ্যাঁ, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এর পেছনে কিছু নেতিবাচক গল্প রয়েছে। সেই গল্পগুলোর সমাধান দরকার। লক্ষণীয়, এসব সমস্যা চিহ্নিত করার পরেও যারা এগুলো দূর করার লক্ষ্যে কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়োজিত, তারা অনেক সময় যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন না। শেখ হাসিনার সঠিক নীতি ও নির্দেশনা আছে, সাবলীল ও দূরদর্শী নেতৃত্ব আছে। কিন্তু বাস্তবায়নে যারা আছেন, তাদের অনেকে সঠিকভাবে কাজ করছেন না বলে অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। এদের অনেকের মধ্যে গাফিলতি রয়েছে, রয়েছে অকারণে দীর্ঘসূত্রতা, রয়েছে দুর্নীতি ও ধান্দাবাজি। এ-রকম যারা করেন তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারাও এ-পথ থেকে সরে আসেন এবং অন্যরাও সে-পথে না যায়। তখন লক্ষ্যের পথে অগ্রগতি আরও বেশি হবে।
আরও একটা সমস্যা চিহ্নিত করা আছে। সেটি হচ্ছে দক্ষতার ঘাটতি। ২০১১ সালে দক্ষতা উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিভিন্ন খাতে ও পর্যায়ে দক্ষতা ঘাটতি ব্যাপক। যথাযথ জরিপের মাধ্যমে খাত ও পর্যায়ওয়ারী ঘাটতি নিরূপণ করে দক্ষতা উন্নয়ন প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া ব্যাহত হবে।
আমরা নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছেছি ২০১৫ সালে। ২০২০-এর দশক শেষে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছা এবং সকলকে অন্তর্ভুক্ত করে লক্ষ্যভুক্ত কল্যাণ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধনে এগিয়ে যেতে হবে। এ-জন্য নীতি এবং কর্মসূচির যেমন দরকার আছে, তেমনি বলিষ্ঠ নেতৃত্বও অপরিহার্য। শেখ হাসিনা সে-রকম নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। তবে যারা তার নেতৃত্বে নীতি ও কর্মসূচি নির্ধারণ করেন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন, তাদেরও জনকল্যাণে নিবেদিত থেকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে লক্ষ্য নিয়ে এবং যে মানবকিতা ধারণ করে কাজ করেছেন, সেটির বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে।
জাতীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং বিশ্ব-পরিম-লে তার অর্জন এবং মর্যাদার কথা এই লেখা সীমিত রাখার প্রয়োজনে উল্লেখ করা হয়নি। এ যাবৎ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আর্থ-সামাজিক বিষয়ে সফলতার কিছু উদাহরণ উপরে আলোচনা করেছি। তার নেতৃত্বে ভরসা রেখে বলতে চাইÑ আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা একদিন গড়বই এবং সেই পথ রচনায় শেখ হাসিনা সফল হবেন। এই লেখায় যেসব বাধা ও ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো অতিক্রম করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে, দেশের সকলকে ন্যায্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় (বৈষম্যহীন সমাজ, সকলের সব মানবাধিকার নিশ্চিত হওয়া এবং সকলের মানব-মর্যাদায় বসবাস) টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথে দেশের ত্বরান্বিত অভিযাত্রা তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন বলেই আমি বিশ্বাস করতে চাই। তার অব্যাহত নেতৃত্বে বাংলাদেশের এমন পথপরিক্রমা সফলভাবে এগিয়ে চলুক।
৭৫তম জন্মজয়ন্তীতে শেখ হাসিনার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও অশেষ শুভেচ্ছা। তার সুস্থ এবং নেতৃত্বময় দীর্ঘ জীবন কামনা করি।
 
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, অর্থনীতিবিদ, সমাজ চিন্তক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK