শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
ঢাকা সময়: ১৭:২৯

একুশে আগস্ট: ইতিহাসের কালো দিন

একুশে আগস্ট: ইতিহাসের কালো দিন

মোহাম্মদ হানিফ হোসেন
 
২১ আগস্ট ইতিহাসের আরো একটি কালো দিন। বর্বরোচিত ভয়াবহ এক কালো অধ্যায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সুস্পষ্ট মদদে ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত জনসভায় ঘটানো হয়েছিল ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম নারকীয় গ্রেনেড হামলা। যে হামলায় নিহত হয়েছিলেন ২৪ জন। যার মধ্যে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী নারীনেত্রী আইভি রহমানও রয়েছেন। এতে আহত হয়ে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা ভোগ করছেন শত শত নেতাকর্মী। সৌভাগ্যেক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন বর্তমান  প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা  শেখ হাসিনা। এই হামলায় আহত ও নিহত স্বজনদের এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় বিকট শব্দে বিস্ফোরিত বোমা বাজিমাতের ভয়ঙ্কর দৃশ্য। যেন পঁচাত্তরের পনেরোর পুনরাবৃত্তি।
 
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পনুরাবৃত্তি চালিয়ে জাতিকে আবারও নেতৃত্বশূন্য করার ভয়ালতম চক কষেছিল ঘাতকরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশকে অভিভাবকশূন্য করার যে অপচেষ্টা চালিয়েছিল একুশে গ্রেনেড হামলা তারই ধারাবাহিকতা। ১৯৭৫-এ বিদেশ থাকায় সৌভাগ্যেক্রমে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে ফের বেঁচে যান ২০০৪-এর ২১শে আগস্ট গ্রেনেড বিস্ফোরিত স্থান থেকে। তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে সমূলে ধ্বংস করতে উদ্যত্ত ক্ষমতাসীন জোট সরকারের বেহায়াপনা শুধু হামলা আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিতে দেশবাসীর সামনে মঞ্চস্থ করা হয়েছিল ‘জজ মিয়া নাটক’। এছাড়া সদ্য ভারত থেকে পড়ালেখা শেষ করে আসা শৈবাল সাহা পার্থ নামের আরেক তরুণকে আটক করে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। শৈবালের সূত্র ধরে গ্রেনেড ঘটনার দায় পার্শ্ববর্তী দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করারও অপচেষ্টা চালায় গ্রেনেড ক্ষমতাসীনরা। নিরীহ নিরপরাধ মানুষদের উপর দায় চাপিয়ে পাপের বোঝা হালকা করতে চেয়েছিল দুষ্কর্মধারী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।
 
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগকে রাজনীতিশূন্য করার গা শিহরিত মহাপরিকল্পনার অংশ একুশে আগস্ট। সেদিন শক্তিশালী গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের শেষ অবলম্বন শেখ হাসিনাকে ধ্বংস করে শত্রুরা দেশে পাকরাজত্ব কায়েম করতে চেয়েছিল। সেসময়কার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনে তখনকার বিরোধী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা খোলা ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শেষে যখন সমাবেশস্থল ত্যাগ করতে যাচ্ছিলেন তখনই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় গ্রেনেড। দ্রুত একের পর এক বিস্ফোরিত হওয়া গ্রেনেড যুদ্ধক্ষেত্রকেও হার মানিয়েছে। গ্রেনেডের বিদঘুটে শব্দ আর শক্তিশালী আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকা নিস্তেজ দেহের ওপর দিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষের ছুটাছুটি ভীতিকর পরিস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সৃষ্টি করেছে আরেকটি কলঙ্কজনক অধ্যায়।
 
যাঁকে হত্যার জন্য নারকীয় এই আয়োজন করেছিল ঘাতকেরা, সেই শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেন অলৌকিকভাবে। সে দিন শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে ঢাকার প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মোফাজ্জল চৌধুরী মায়াসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা মানববর্ম তৈরি করে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা খুব কাছ থেকে দেখেছেন মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা। রক্তাক্ত হয়েছেন সকলে। গ্রেনেডের বিকট শব্দে ক্ষতিগ্রস্ত কানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এখনো ব্যবহার করতে হচ্ছে ‘হিয়ারিং এইড’। ক্ষমতায় তখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। এই বীভৎস হামলার শিকার আওয়ামী লীগ তখন মামলা দিতে গেলে সে মামলা নেওয়া হয়নি। তার আগে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। ভয়ঙ্করতম এই গ্রেনেড হামলার সঠিক তদন্ত না করে উল্টো তা ভিন্ন দিকে নেওয়ার অপচেষ্টা করে বিএনপি-জামাত জোট সরকার। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি। হামলাকারীরা ভেবেছিল বিরোধী বলয়ের শিকড়সহ ধ্বংস করে আজীবনের ক্ষমতা লোপে নেবে। কিন্তু নাটক সাজিয়েও পার পায়নি তৎকালীন ক্ষমতাবানেরা। 
 
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর, দীর্ঘ ১৪ বছর পরে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায়ে বিএনপি নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান ও সদ্য প্রয়াত হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। উল্লেখ্য, ২১ আগস্টসহ বঙ্গবন্ধুকন্যাকে অসংখ্যবার হত্যার চেষ্টা করেছে ষড়যন্ত্রকারীরা। বার বার আঘাত পেয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক ধারাকে কলুষিত করেছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা অচিরেই গ্রেনেড হামলার অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। আদালতের রায়ের সুত্র ধরেই বলতে চাই, সকল রাজনৈতিক দলকেই উদারনীতি গ্রহণ করা দরকার। কারও জন্য ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। অতীতে যারা ক্ষমতাকালীন সময়ে একুশে আগস্টের ঘৃণ্য ঘটনাসহ আরও অনেক অঘটনের জন্ম দিয়েছে তাদের করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। 
 
লেখক : রাজনৈতিক কর্মী 
 

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK