বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯
ঢাকা সময়: ১৩:১৯
ব্রেকিং নিউজ

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পূর্বাপর ঘটনার পর্যালোচনা ও তাৎপর্য

২য় খণ্ড
শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পূর্বাপর ঘটনার পর্যালোচনা ও তাৎপর্য

২য় খণ্ড

সাত
স্বাধীনতার পর এটা ছিল আওয়ামী লীগে দ্বিতীয় ভাঙন। প্রথম ভাঙনের নায়ক ছিলেন খুনি মোশতাক। মোশতাকের মতোই মিজান চৌধুরী দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের টানতে ব্যর্থ হয়। মোশতাক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে দল গঠন করে ইতোমধ্যে ব্যর্থ হয়ে যায়। শুরু হয় মিজান চৌধুরীর আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করে ধ্বংসের প্রচেষ্টা। মোশতাক দলকে ব্রাকেটভুক্ত করতে পারেনি। কিন্তু মিজান চৌধুরী দলকে ব্রাকেটভুক্ত করতে সক্ষম হন। আওয়ামী লীগ ( মিজান)-এর সঙ্গে তখন মূল আওয়ামী লীগও (মালেক) নামে পরিচিত হতে থাকে। মিজান চৌধুরী আলাদা দল করার পরও আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলতে থাকে।
সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ছাড়াও সব কয়টি বিরোধী দলেই ভাঙনের খেলা চলে। জাসদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ চলছিল। ইউপিপি দল ভেঙে তিন ভাগ হয়। জেনারেল ওসমানীর জাতীয় জনতা পার্টি অন্তত তিন ভাগে বিভক্ত হয়। মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ দ্বিধাবিভক্ত হয়। এক কেন্দ্রের দুই দল ন্যাপ (মো) ও কমিউনিস্ট পার্টি তখন দুই দলে পরিণত হয়। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মোজাফফর আহমদের সমর্থকরা বের হয়ে ছাত্র সমিতি গঠন করে। মোহাম্মদ তোয়াহার সাম্যবাদী দলে ভাঙন হয়। এসব দলাদলি ও ভাঙনে সেনাচক্র কীভাবে কতটা ‘লম্বা হাত’ প্রসারিত করেছিল, তা বাংলাদেশের রাজনীতির গভীর এক অনুসন্ধিৎসার বিষয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের পর সেনাচক্রের সরকার তখন সংসদ নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু করে। কারণ হত্যা-ক্যুসহ অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দিতে অর্থাৎ পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর থেকে সামরিক শাসনের মধ্যে ফরমান বলে সংবিধান সংশোধনসহ যেসব আইন জারি হয়েছে, সেসব জায়েজ করার জন্য সংসদ একান্তভাবেই প্রয়োজন ছিল। তদুপরি সামরিক কর্তাদের শাসনকে বেসামরিক গণতান্ত্রিক মুখোশ পরানোর জন্য প্রয়োজন ছিল রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট। বাস্তবে সরকার আওয়ামী লীগ বিভক্ত না করে সংসদ নির্বাচনে যেতে ভরসা পাচ্ছিল না। আওয়ামী লীগের ভাঙন ঘটিয়েই সরকার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল-জাগদল’কে বিলুপ্ত করে। ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠন করা হয়। সামরিক আইনের মধ্যে ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে ক্যান্টনমেন্টে বসে জিয়া পাকিস্তানি আমলে আইয়ুব খানের মতোই দল গঠন করে।
 
আট
১ ডিসেম্বর জিয়া নিজেকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ঘোষণা করে সেনাবাহিনীর প্রধান পদ পাকিস্তান প্রত্যাগত লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ছেড়ে দেন। এই নিয়োগকে বলা যেতে পারে ইতিহাসের ঘাত-প্রতিঘাতের প্রতিশোধ। এর ভেতর দিয়ে জিয়া অন্য এক সেনাপ্রধানকে দেশের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে টেনে আনার পথ রচনা করেন। এদিকে সংসদ অধিবেশন সামনে থাকা সত্ত্বেও সরকার ১৫ ডিসেম্বর সামরিক ফরমানে সংবিধানে পঞ্চম সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করে। এতে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট থেকে তখন পর্যন্ত সব হত্যা-ক্যু, সামরিক ফরমান আদেশ ও আইন, যুদ্ধাপরাধীদের দল করার অধিকার বৈধ হয়ে যায়। তবে এটা সাংবিধানিকভাবে জায়েজ করার জন্য তখনও প্রয়োজন ছিল সংসদ নির্বাচন ও সংসদ কার্যক্রমের প্রহসন নাটক।
১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ বিজয় ছিল অবধারিত। এই নির্বাচনে বিএনপি পায় ২০৭টি আসন ও ৪১.১৭ শতাংশ ভোট, আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন ও ২৪.৫৭ শতাংশ ভোট এবং মুসলিম লীগ-ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ জোট ২০টি আসন ও ১০.০৭ শতাংশ ভোট। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দাপট মিলিয়ে বিএনপির ভোট ও আসন প্রাপ্তি অনেকটা বাড়তি ছিল। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৭৫.১০ শতাংশ ভোট। এ অবস্থায় একাত্তরের পরাজিত শক্তি নানাভাবে এমন প্রচার চালাতে থাকে, আওয়ামী লীগের অবস্থা হবে পাকিস্তানের মুসলিম লীগের মতো। বাস্তবে তেমনটা বলার মতো অবস্থা হতে যাচ্ছিল।
হুকুমের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট দিয়ে প্রথমেই ইতোপূর্বে জারিকৃত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীকে পাশ করিয়ে নেওয়া হয়। এই আইন পাসসহ জিয়া সরকারের সব কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ নামটাই কেবল থাকে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেশ কার্যত ‘মিনি পাকিস্তান’ হয়ে যায়। এ-সময়ে এসে এই সংশোধনী পাসের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের একাংশ বাস্তবায়িত হয়। ইতোমধ্যে বুঝতে পারা যায় যে, মিজান লীগ আওয়ামী লীগের তেমন ক্ষতি করতে পারবে না। তাই আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে বিধ্বস্ত ও ধ্বংস করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়।
এদিকে সংসদ নির্বাচনের পর দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া আরও বেগতিক আচরণ করতে থাকে। ঘুষ-দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়। জনজীবনে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগ তখন কখনও এককভাবে আবার কখনও ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামে। কিন্তু একদিকে দমন-পীড়ন আর অন্যদিকে দলীয় বিভেদের ফলে তা তেমন প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় না। এদিকে সেনাচক্র ক্ষমতার টোপ দিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বিএনপিতে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করে। যোগদান নাটক চলতে থাকে। এরই মধ্যে আসে ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ দলের কাউন্সিল।
 
নয়
আওয়ামী লীগ কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কোন্দল ও দলাদলি। এই গোলযোগের কতটা সরকারের ঘুঁটির চাল, কতটা নেতাদের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার টানাপোড়ন, তা গভীর অনুসন্ধিৎসার দাবি রাখে। ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংঘর্ষের ফলে অফিস তছনছ হয়ে যায় এবং কেন্দ্রীয় নেতা সালাউদ্দিন ইউসুফ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২৮ জানুয়ারি অফিসের সামনে দুই গ্রুপের শোডাউন হয় এবং সারাদিন লাঠালাঠি চলে। ৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দুজন এবং ছাত্রলীগের কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী যুবলীগের কংগ্রেস দলাদলির কারণে স্থগিত ঘোষিত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হৈচৈ ও বাদবিবাদের মধ্যে পাল্টা দুটো কমিটি ঘোষিত হয়।
স্বাধীনতার পর দুবার দুই ধরনের ভাঙনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে এটা সুস্পষ্ট হবে যে, ওই দুই ভাঙন হয় উপরিতলায়, কেন্দ্রে। কিন্তু এবারের গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে তৃণমূলে। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে এমন বিপাকে দলটি আগে আর পড়েনি। ১৪ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশন শুরুর ভাষণে সভাপতি মালেক উকিল দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার আহ্বান জানান। প্রবাসে থেকে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকুন। ১৫ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিলে স্লোগান-পাল্টা স্লোগানের মধ্য দিয়ে গঠনতন্ত্র সংশোধিত হয়। এতে দলে যৌথ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রেসিডিয়াম পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। গোলযোগ চলতেই থাকে। কী হবে আর কী হবে না এই প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গন আলোড়িত হয়ে ওঠে।
পরদিন দলের ভাঙন রোধকল্পে দিল্লিতে বসবাসরত বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে কমিটি গঠিত হয়। শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন ঐক্যের প্রতীক। পঁচাত্তরে সপরিবারে হত্যা করে খুনি চক্র ও তাদের মাস্টারমাইন্ডরা মনে করেছিল, রাজনীতিতে শেখ মুজিবের কবর রচিত হলো। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল, টুঙ্গিপাড়ায় কবরে ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শায়িত রয়েছেন ঠিকই; কিন্তু রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই। বুলেটবিদ্ধ বঙ্গবন্ধুর রক্ত বাংলার মাটিতে মিশে গিয়েছিল, সেই রক্তই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সময় আবারও ফিরে এসেছে।
 
দশ
কাউন্সিলের সমাপনী ভাষণে মালেক উকিল বলেন, দলে অনেক উপযুক্ত ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও ঐক্য অটুট রাখতে কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। ‘বঙ্গবন্ধুর গন্ধ’ আছে বিধায় তিনি মেনে নিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন। এ বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট যে, নেতৃত্বের মধ্যে কোন্ ধরনের প্রতিকূলতা থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনা সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দেশের মধ্যে ছিল আরও প্রতিকূলতা। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা তখন দিল্লিতে বসবাসরত ছিলেন। তাই শুরু থেকে ভারতের নির্দেশে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বলে প্রচার জোরদার করা হয়। এমনটা স্বাভাবিকই ছিল। কারণ একাত্তরে পরাজিত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মহল ঠিকই বুঝেছিল যে, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ভেতর দিয়ে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হুবহু বাস্তবায়ন আর সম্ভব নয়। ২৪ জানুয়ারি ১৯৮১ শেখ হাসিনাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করানো এবং দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আওয়ামী লীগ নেতারা দিল্লি যাত্রা করেন। ওইদিনই অন্য কোনো বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচারে সামনে আনা হয়, শেখ হাসিনা বিবৃতিতে বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। ২৫ মার্চ থেকে দিল্লিতে নেতাদের সঙ্গে সভানেত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক শুরু হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতারা ঢাকা ফিরে অসেন।
৮ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট জিয়া ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অতীতের ন্যায় বিদেশি সাহায্য-সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।’ সহজেই অনুধাবন করা যায়, ক্ষমতার অন্ধ মোহে সেনাশাসক জিয়া ভুলে গিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে লড়াই-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ভারতে থেকে সেক্টর কমান্ডার হতে পেরেছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া এ-ধরনের কথা বলার পর এমন প্রচার জোরদার হয় যে, ভারতই শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি বানিয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রচারিত হয়, ভারতের লোকসভায় সিপিএম নেতা জ্যোতির্ময় বসু বলেছেন, আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে। সিপিএম নেতার এ-ধরনের বক্তব্য ছিল দুর্ভাগ্যজনক। ওইদিনই আওয়ামী লীগবিরোধী ফ্যাসিবাদী দিবস পালন উপলক্ষে জাসদ নেতা মেজর এমএ জলিল বলেন, যে রাজনৈতিক দলের সভাপতি দিল্লিতে বসবাস করছেন, সে-দলের সঙ্গে ঐক্য গড়তে এদেশের মানুষ ভয় পায়। এটা ঠিক, শেখ হাসিনা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ভয় পেয়েছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তি আর ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকারীরা। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের জনগণ হয়ে ওঠে উজ্জীবিত।
 
এগারো
সব ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে শিশু পুত্র-কন্যাকে ছোট বোন রেহানার কাছে রেখে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। সেদিনের প্রকৃতির রুদ্ররূপী ঝড়-ঝঞ্ঝা আর শোকাহত-ক্ষুব্ধ-আশান্বিত জনতার সমাবেশ-স্লোগান দেশের রাজনীতির ইতিহাসে চির অমøান হয়ে থাকবে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই শুভ মুহূর্তে আবেগমথিত ও প্রত্যয়দৃপ্ত কণ্ঠে আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।… আমার হারাবার কিছু নেই।… জীবনের ঝুঁকি নিতেই হয়, মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’ বঙ্গবন্ধু-কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ১৩ দিন পর চট্টগ্রামে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হন। হত্যা-ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে জিয়া যেভাবে ক্ষমতায় আসেন, সেভাবেই তিনি ক্ষমতা থেকে নিষ্ক্রান্ত হন। দেশ আবারও পড়ে ক্যু আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের জাঁতাকলে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জাতির লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ আর একই সঙ্গে জনগণের সবলতা-সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যান সম্মুখপানে। আওয়াজ তোলেন, ভোট ও ভাতের।
প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সেনাশাসন তথা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ‘আমার শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এবং সীমিত গণতান্ত্রিক অধিকারকে ব্যবহার করার নীতি-কৌশল নিয়ে শেখ হাসিনা যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই কৌশলের সফল প্রয়োগ করে তিনি ‘আওয়ামী লীগের অবস্থা হবে মুসলিম লীগের মতো’ শত্রুদের এ-ধরনের কথার মুখে ছাই দিয়ে ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে দলকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসেন। এরশাদের ‘মিডিয়া ক্যু’ তাতে বাদ সাধে।
স্বৈরাচারবিরোধী গণসংগ্রামের বিজয়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে যান এবং বলেন, ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ হয়েছে। এজন্য তাকে সমালোচনা করা হয়। কিন্তু এটাই বাস্তব, তখনও রাজনীতি ছিল ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। সেই নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তো তখন ক্যান্টনমেন্টে বসেই রাজনীতি করতেন। ক্যান্টনমেন্টের ভূমিকা তখন কী ছিল, তা বিবেচনায় নিলেই শেখ হাসিনার ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’ কথাটার মর্ম উপলব্ধি করা যাবে।
 
বারো
১৯৯১-এর সংসদ নির্বাচনের পরপরই বিশ্ব রাজনীতি পাল্টে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতন ঘটে। ঠাণ্ডা যুদ্ধ যুগের অবসান হয়। সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার নেতৃত্বে এককেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ার যুগ শুরু হয়। যুগধর্ম ধারণ করা ছাড়া যে অগ্রসর হওয়া যায় না এবং বঙ্গবন্ধু যে যুগধর্ম ধারণ করে সেই যুগের বিশ্ব রাজনীতিতে স্থান করে নিয়েছিলেন, তা দূরদৃষ্টি দিয়ে বিবেচনায় নেন। ফলে সমাজতন্ত্রের মূল চেতনা শোষণহীন সমাজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি পরিবর্তন করেন। ১৯ মার্চ ১৯৯২ তিনি মিশ্র অর্থনীতি থেকে প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজার অর্থনীতির কর্মসূচি ঘোষণা করেন। যুগ ও দেশের উপযোগী জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ার কর্মসূচি তিনি সামনে রাখেন।
ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নীতির প্রতি সদাজাগ্রত শেখ হাসিনা দলীয় কর্মসূচি পরিবর্তন করার ভেতর দিয়ে দলকে বিশ্ব ও জাতীয় বাস্তবতায় ক্ষমতায় যাওয়ার উপযোগী করে তোলেন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তিনি ব্যর্থ করে দেন। শুরু হয় রাষ্ট্র ও সমাজকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্ত করার সংগ্রাম। ১৯৯৬ সালের জুনের চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দলকে তিনি পুনরায় ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। এ আমলে তিনি এমন কতক কাজ করেন, যা রাজনীতির ইতিহাসে স্মরণযোগ্য। এক. জাতীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনে প্রতিষ্ঠা করা। দুই. নিরপেক্ষ বলে বিবেচিত ব্যক্তি বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা। তিন. বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত ও বিচার শুরু করা। তিন. দেশের ইতিহাসে প্রথম সংবিধানের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া।
তারপর নানা বাধা-বিঘ্ন, সাহস ও বিচক্ষণতা দিয়ে মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা এখন ক্ষমতায়। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি দুবারে ১৭ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী এবং ১১ বছর বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। ১৯ বার তাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। দল ভাঙারও চেষ্টা করা হয়। শত বাধা-বিঘ্ন ও দলে ‘কাউয়াদের’ উৎপাতের মধ্যেও দেশ আজ উন্নয়নের ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার মধ্যে রয়েছে। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমাদের মতো দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোলমডেল। করোনা-দুর্যোগ ও ইউরোপীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশের জনগণের অভাব-অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত এবং পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে অবিচল। বিশ্ব ও উপমহাদেশের দেশগুলো যখন কেবল দক্ষিণমুখী হচ্ছে, তখন তিনি উজানমুখী ঢেউয়ের উপর দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ নৌকাকে অগ্রসর করে নিতে তৎপর থাকছেন।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য বিবেচনায় নিয়ে তার জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলতে হয়, দেশে ফেরার পর ‘ভোট ও ভাত’-এর যে স্লোগান তিনি তুলে ধরেছিলেন, সেই সেøাগান কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন, তা দিয়ে ইতিহাস তার মূল্যায়ন করবে। জনগণ কায়মনোবাক্যে কামনা করে, তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনের কথাগুলো ‘হারাবার কিছু নেই।… জীবনের ঝুঁকি নিতেই হয়, মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়’ কথাগুলো তিনি আগামী দিনগুলোতে প্রমাণ করবেন।
জয় বাংলা। জয়তু শেখ হাসিনা।
 
লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK