বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯
ঢাকা সময়: ১২:৩৬
ব্রেকিং নিউজ

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পূর্বাপর ঘটনার পর্যালোচনা ও তাৎপর্য

১ম খণ্ড
শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পূর্বাপর ঘটনার পর্যালোচনা ও তাৎপর্য

শেখর দত্ত
 
এক
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার ৪২তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১৭ মে সমাগত। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১৭ দিন আগে ২৯ জুলাই শেখ হাসিনা তার স্বামীর সঙ্গে পুত্র-কন্যা ও ছোট বোন শেখ রেহানাসহ জার্মানি চলে যান। ফলে সৌভাগ্যবশত তারা বেঁচে যান। দেশ নিপতিত হয় হত্যা-ক্যু আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্যে। দেশের চরম অনিশ্চিত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু-পরিবারের সদস্যদের শতভাগ জীবনের ঝুঁকি থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠে। শুরু হয় পরিবারসহ শেখ হাসিনার দুর্ভাগ্যকবলিত দুঃখ-দুর্দশার প্রবাসী জীবন।
পঁচাত্তরের সেই কালরাত্রির পর ক্ষমতার উত্থান-পতন আর ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়া অস্ত্রের জোরে প্রেসিডেন্ট সায়েমকে সরিয়ে ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ প্রেসিডেন্ট পদ দখল করেন। ঠাণ্ডা মাথার সুচতুর সেনাশাসক জিয়া যখন মনে করেন নিজের ক্ষমতা সব দিক থেকে নিরাপদ, কুক্ষিগত-নিরঙ্কুশ-দীর্ঘস্থায়ী; তখন তিনি ও তার সহযোগী সেনাচক্র পাকিস্তানি আমলে আইয়ুব খানের মতো হুকুমের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন করে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু করে। দেশ কার্যত ‘মিনি পাকিস্তান’ হয়ে উঠতে থাকে। জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই মৃত বঙ্গবন্ধু আরও শক্তিশালী হতে পারে মনে করে তার নাম-নিশানা রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবন থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার প্রচেষ্টা চলে। এ অবস্থায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের ঐতিহ্যবাহী সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তখন নেতৃত্বশূন্য ও দিক-নির্দেশহীন হয়ে সবদিক থেকে বিপাকে পড়ে। এ অবস্থায় দলকে সামাল দিতে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে কাউন্সিলে তাকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়।
রাজনৈতিক বিশেষত বঙ্গবন্ধুর সন্তান হিসেবে শেখ হাসিনা ছিলেন দেশপ্রেমে উজ্জীবিত। পিতার আদর্শকে তিনি ধারণ করতেন। প্রবাসে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও পঁচাত্তরের পরাজয়ের পর একাত্তরের রাজনীতি তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনে ফিরিয়ে আনতে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই জীবনের সবৈব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বে শিশু পুত্র-কন্যাকে প্রবাসে রেখে তিনি দেশে ফিরে দলের হাল ধরার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সাহসী-দৃঢ়চেতা-দূরদর্শী পিতার কন্যা হিসেবে এই ঝুঁকি নেওয়াটাই ছিল তার জন্য স্বাভাবিক। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে তার এই সিদ্ধান্ত গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও যুগান্তকারী। শেখ হাসিনার আগমন একাত্তরের পরাজিত প্রতিক্রিয়ার শক্তির আঘাত ও তাদের নীলনকশা বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের প্রগতির শক্তির ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনাবিন্দু। বঙ্গবন্ধু-কন্যার এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে কেন হত্যা করা হয়েছিল, তা প্রথমে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
 
দুই
প্রকৃত বিচারে বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ মনসুর আলী ও কামারুজ্জামানকে হত্যা করার বিষয়টি কেবল জাতীয় গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে উপমহাদেশ ও বিশ্ব রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। কারণ পাকিস্তানি আমলে গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং তারই পরিণতিতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন- সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ছিল বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্র-ধনতন্ত্র ঠাণ্ডযুদ্ধ যুগে কেবল বাংলাদেশের জনগণের নয়, মানব সমাজের শান্তি-স্বাধীনতা-গণতন্ত্র-মুক্তি-প্রগতি তথা মুক্তিসংগ্রামের ফসল।
ক্ষুধা-দারিদ্র্য-শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তন। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে রোমে স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লবের ভেতর দিয়ে মানব সমাজের এই চিরায়ত আকাক্সক্ষা চির বহমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব পরিম-লে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া ও প্রগতির শক্তি যথাক্রমে আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী দেশগুলো প্রথম বিশ্ব বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো দ্বিতীয় বিশ্ব হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়ে শামিল হয়। এই কালপর্বে পরাধীন দেশগুলো স্বাধীনতা লাভ করে এবং মুক্তির আকাক্সক্ষা নিয়ে তৃতীয় বিশ্ব হিসেবে অবস্থান নেয়। ভারত বিভক্তির ভেতর দিয়ে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র পাকিস্তান তৃতীয় বিশ্বের বাইরে থাকে এবং পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি প্রতিক্রিয়ার কারাগার হয়ে ওঠে। এই দুঃসহ অবস্থার বিরুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে জনতার অভূতপূর্ব ঐক্য এবং শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
তাই পৃথিবীর বুকে রক্তস্নান বাংলাদেশের জন্ম ছিল জাতীয় ও বিশ্ব পরিম-লে প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রগতি ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ ফল। আর এই লড়াইয়ের প্রতীক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতাই ছিলেন না। নবজাত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শূন্য অর্থ ও খাদ্যের ভাণ্ডার নিয়ে গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি দিয়ে তিনি দেশবাসীকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্য থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে শামিল করেছিলেন।
দেশি-বিদেশি পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীলরা তাই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়। তাদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ছিল- এক. মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী জাতীয় চার নীতিÑ জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র থেকে সরিয়ে দেশকে পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে যাওয়া; দুই. দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর অর্থনীতির বিপরীতে সাম্রাজ্যবাদনির্ভর ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ নীতি চালু করে লুটেরা পুঁজিপতি সৃষ্টি করা; তিন. বাংলাদেশকে ও দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে দমন-পীড়ন ও কালিমালিপ্ত করে কোণঠাসা কিংবা ধ্বংস করা এবং সেনাকর্তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ শাসন ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া; চার. লোভ-লালসা দিয়ে রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য ‘ডিফিক্যাল্ট’ করা; পাঁচ. রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে সংহত করা; ছয়. প্রগতির বিপরীতে বিশ্ব প্রতিক্রিয়ার শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা।
বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগে এই লক্ষ্য-পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছিল কিংবা দেশের অবস্থা কোন্ পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল আর তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর পরিবর্তনগুলো বিবেচনায় নিলেই অনুধাবন করা যাবে, তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য। ইতোমধ্যে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪১ বছর শেষ হতে চলল। তিনি যখন প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তখন ছিল সাম্রাজ্যবাদ-সমাজতন্ত্রের ঠাণ্ডা যুদ্ধযুগ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিপ্লব বা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ঘাত-প্রতিঘাতে নব্বইয়ের দশকে সেই যুগের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার একচ্ছত্র-এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা যুগ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও এখন বুদবুদে পরিণত হয়েছে। বহুকেন্দ্রিক যুদ্ধোন্মুখ বিশ্ব এখন দৃশ্যমান। দেশে দেশে আজ জাতি ও ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রচেষ্টা এবং ব্যক্তিগত লোভ-লালসা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য বিবেচনায় নিতে হবে।
 
তিন
জীবনের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী তথা বঙ্গবন্ধুসহ লাখ লাখ শহিদের স্বপ্নসাধ বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরবেন- এটা ছিল দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়ার কল্পনারও বাইরে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করেছে। প্রতিক্রিয়ার শক্তি তাদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে। প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খুনি মোশতাক আওয়ামী লীগের হয়েই আওয়ামী লীগকে আরও সর্বনাশ করার পথে টেনে নিয়ে যায়। একদিকে ভয় কিংবা লোভ দেখিয়ে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের মন্ত্রী পদে বসিয়ে নেতৃত্বের বড় অংশকে বিপথগামী ও কলুষিত করে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর একান্ত বিশ্বস্ত সাথী ও নবীন সহযোগী নেতাদেরসহ তৃণমূলের নেতাদের জেলে নিয়ে এবং অপপ্রচার-মিথ্যাপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত ও হতাশ করে। এভাবে পাকিস্তানি আমল ও মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা নেতৃত্বকে উল্লিখিত দুই পন্থায় শেষ করে খুনি মোশতাক নীলনকশার প্রথম ধাপের সমাপ্তি টানেন এবং ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চ থেকে অপসারিত হন।
একটু খেয়াল করলেই অনুধাবন করা যাবে, খুনি মোশতাক সামরিক আইন জারি করলেও সংসদ বহাল রাখেন এবং রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন না। কিন্তু বিচারপতি সায়েমকে সামনে রেখে সেনাপ্রধান জিয়া ক্ষমতা হাতে নিয়েই সংসদ বাতিল ও রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। সব গুছিয়ে ৯ মাস পর তিনি লাইসেন্স নিয়ে দল করার তথাকথিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেন। ইতোমধ্যে তিনি জাতীয় চার মূলনীতি, মানি ইজ নো প্রবলেমের অর্থনীতি থেকে শুরু করে ধর্মকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার অধিকার প্রদানসহ উল্লিখিত লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বাকি কাজগুলো ছকমতো অগ্রসর করে নেন। মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রদানকৃত বীরউত্তম উপাধি ব্যবহার করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণীর মর্মমূলে আঘাত করেন।
খুনি মোশতাক চক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করতে চেয়েছিল; আর জিয়ার সেনাচক্র বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা রাজনীতি থেকে মুছে ফেলার জন্য রাজনীতিতে ‘মৃত বা জীবিত কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভক্তি-বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারা যাবে না’ বলে সামরিক ফরমান জারি করেন। জিয়ার বহুদলীয় রাজনীতির পরিহাস হচ্ছে, যে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হলো সেই দলকে উল্লিখিত ফরমান মেনে রাজনীতি করার লাইসেন্স পেতে হলো এবং তা পেল স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর পর, ৪ নভেম্বর ১৯৭৬। স্বাধীন বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন এমন অবস্থা ছিল যে, বাম-ডান সব দল আছে; কিন্তু আওয়ামী লীগ নেই।
 
চার
লাইসেন্স নিয়ে দল করার বাধ্যবাধকতার অর্থ ছিল, রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর মালিক হচ্ছে সামরিক সরকার। ক্ষমতার পরিচালক হয়ে জিয়ার নেতৃত্বে সেনাচক্র আসলে জনগণের মতামতকে পাত্তা না দিয়ে দেশের মালিকের মতোই আচরণ করতে থাকে। মোশতাক-ওসমানির পছন্দের ফলে সায়েম রাষ্ট্রপতি পদে বসতে পারলেও তিনি ছিলেন সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। রাষ্ট্রপতির এই অবস্থান ক্ষমতালোভী সেনাচক্র সহ্য করেনি। আওয়ামী লীগ অনুমোদন পাওয়ার ১৭ দিনের মাথায় ২১ নভেম্বর জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত, ২৫ দিনের মাথায় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ এবং ছয় মাসের মাথায় ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সায়েমকে অস্ত্রের জোরে সরিয়ে দেন। এ-সময়ে ঠাণ্ডা মাথায় সুকৌশলে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জিয়া দুটো কাজ করেন।
প্রথমত; বাম-ডানের ভারসাম্যের রাজনীতির ঘোরপেঁচে ফেলে কিংবা আরও স্পষ্ট করে বললে আরও ডান প্রতিক্রিয়াশীল জুজুর ভয় দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দুই রাজনৈতিক দল রুশপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ (মো)-কে খালকাটা বিপ্লব ও জিয়ার প্রতি আস্থাভোটে শামিল করে। আর উগ্রবাম সব সময়ের হয় ডান-প্রতিক্রিয়াশীলের মাসতুতো ভাই। চীনপন্থি সব দল-গ্রুপ কার্যত জিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। জনগণের বিভ্রান্তির মধ্যে নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক অঙ্গনে একা হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত; পাকিস্তানি আমলের মতো হালুয়া-রুটির টোপ ফেলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে উসকে দেয়। এক্ষেত্রে লোভ-লালসার সঙ্গে জিয়া দুই ইস্যু তথা বাকশাল ও মোশতাকের মন্ত্রিত্বে যোগদানের ইস্যুকে ক্ষমতার ঘুঁটি চালিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সুকৌশলে ব্যবহার করেন।
ইতোমধ্যে বাকশাল-পূর্ব কমিটির সভাপতি কামারুজ্জামান নিহত হওয়ার কারণে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগ সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান জেলে থাকায় সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করে কাজ শুরু করে। আওয়ামী লীগকে গুছিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ছিল দলীয় কাউন্সিলের। তাই শুরুতে দলের কাউন্সিল দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আহ্বায়ক নির্বাচিত করে প্রস্তুতি কমিটি গঠিত হয়। শুরু থেকে সভাপতির পদ নিয়ে দলাদলি মারাত্মক রূপ ধারণ করে। বিশেষত মিজানুর রহমান চৌধুরী এই পদ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।
প্রসঙ্গত, ত্রাণমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্যতা ও দুর্নীতির দায়ে বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। তাই তাকে খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে হয় না। এই অপবাদ না থাকার এবং প্রবীণ-নবীন নেতৃত্বের বড় একটা অংশ জেলে থাকার সুযোগ গ্রহণ করতে চান তিনি। কিন্তু সুবিধাবাদী-সুযোগসন্ধানী-লোভী হিসেবে চিহ্নিত থাকায় এবং ইতোমধ্যে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের খবর জানাজানি হওয়ায় দলের কাউন্সিলরা তাকে গ্রহণ করেন না। অন্য কোনো নেতাও তখন সভাপতি হিসেবে গ্রহণীয় হন না। সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েও মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ অবস্থায় ৩ ও ৪ এপ্রিল ১৯৭৭ দলীয় কাউন্সিলে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিক্রিয়ার মুখে ছাই দিয়ে এ যাত্রায় আওয়ামী লীগ ভাঙন থেকে বেঁচে যায়।
 
পাঁচ
আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও দিক-নির্দেশহীন থাকলেও আওয়ামী লীগই ছিল তখন জিয়ার পথের কাঁটা। তাই সামরিক সরকার আওয়ামী লীগকে আরও কোণঠাসা করার জন্য জেল-জুলুম ও অপপ্রচার-মিথ্যাপ্রচার অব্যাহত রাখে। তদুপরি দেশব্যাপী এমন বিরূপ ও উগ্র পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখে, যাতে প্রচারসহ বাস্তব কাজে আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে না নামতে পারে। এদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দলাদলি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য-বিভেদ থাকায় দলটি মাঠে নামতে অসুবিধায় পড়ে। বাস্তবে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়া নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হওয়ার উদ্দেশ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের জন্য খালি মাঠ সৃষ্টি করেন। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল-জাগদল গঠন করেন।
ইতোমধ্যে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক নেতাদের আটকাদেশ বাতিল করতে থাকে। এদিকে সামরিক স্বৈরাচারী সরকার গণতান্ত্রিক মুখোশ পরতে চাইলে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে বিচারাধীন রাজনৈতিক বন্দীদের ছেড়ে দিতে থাকলে, আওয়ামী লীগ নেতাদের একাংশ মুক্তি পান। এ অবস্থায় ৩-৫ মার্চ ১৯৭৮ আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে কাউন্সিলারদের চাপে ঐকমত্যের ভিত্তিতে আবদুল মালেক উকিল ও আবদুর রাজ্জাককে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। প্রসঙ্গত, মালেক উকিলও ১৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধু-বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। তাই নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করার ক্ষমতা তার ছিল না।
 
ছয়
২১ এপ্রিল ১৯৭৮ সরকার ঘোষণা করে ৩ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ-সময়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ প্রতিকূল থাকায় আওয়ামী লীগ নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে নামা সংগত মনে করে না। বাস্তবেও তা কঠিন ছিল। তবে বিনা চ্যালেঞ্জে মাঠ সেনাশাসক জিয়াকে ছেড়ে দেওয়াও সঠিক মনে করে না। ন্যাপ (মো), কমিউনিস্ট পার্টি, গণ-আজাদী লীগ, জাতীয় জনতা পার্টি ও পিপলস লীগের সঙ্গে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট গঠন করে নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে দলকে গুছানোর কৌশল নেয়। প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে ওসমানীকে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের প্রার্থী করা হয়।
প্রসঙ্গত, জেনারেল ওসমানী পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে খুনি প্রেসিডেন্ট মোশতাকের সহযোগী ও সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। তবে জিয়া আমলে তিনি জাতীয় জনতা পার্টি গঠন করে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের অঙ্গীকারই ছিল গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের গঠন ও জেনারেল ওসমানীকে প্রার্থী দেওয়ার ভিত্তি। তাই বলা যায়, সময়ের প্রতিকূলতা বিবেচনায় আওয়ামী লীগ অনেক ছাড় দেওয়ার কৌশল নিয়ে ঐক্যজোটে শামিল হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরের দ্বন্দ্ব-বিভেদ আরও প্রসারিত ও প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। মিজানুর রহমান চৌধুরী ও তার সঙ্গের নেতাদের যেসব এলাকা সফরের এবং কর্মিসভা ও জনসভা অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারা তা পালন করেন না। এমন কী দলের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও তিনি বলতে থাকেন, বাকশাল করা ভুল হয়েছিল এবং এই ভুলের জন্য জনগণের কাছে দলের মাপ চাওয়া উচিত।
বস্তুতপক্ষে আওয়ামী লীগ যাতে সংগঠিতভাবে নির্বাচনী কাজে নেমে দলকে গুছাতে এবং জনমতকে পক্ষে টানতে ভূমিকা পালন করতে না পারে, সে-জন্য সরকারের সুতোর টানে পুতুল হিসেবে মিজান চৌধুরী সংগঠনবিরোধী উপদলীয় কার্যকলাপ চালাতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ১০-১৫ জুন কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় মিজান চৌধুরীর কাছে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দাবি করা হয়। কিন্তু তিনি তার বক্তব্যে অনড় থাকেন। পরবর্তীতে ১১ আগস্ট মিজান চৌধুরী তার বাসভবনে সাংবাদিক সম্মেলন করে তার নেতৃত্বে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি গঠনের ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগ (মিজান) নামে দলের জন্ম হয়। ১৭-১৮ আগস্ট আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সংগঠনবিরোধী কাজের জন্য কারণ দর্শাও নোটিস জারি এবং ৪ অক্টোবরের সভায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।.............(চলমান...... )(১ম খণ্ড)
 
 
লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK