রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
ঢাকা সময়: ১৫:০০

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সেবা লেনদেনের স্বাদ পাচ্ছেন গ্রামীণ গ্রাহকেরাও

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সেবা লেনদেনের স্বাদ পাচ্ছেন গ্রামীণ গ্রাহকেরাও

উত্তরণবার্তা প্রতিবেদক : জেলার দাউদকান্দি উপজেলা সদর থেকে অন্তত বিশ কিলোমিটার দূরে থাকেন নাজমা বেগম। স্বামী বিদেশে থাকেন আর ছেলে স্কুলে পড়ে। কিন্তু বিদেশ থেকে আসা টাকা তোলার জন্য তাকে আর উপজেলা সদরে ব্যাংকে যেতে হয়না গত প্রায় ৫ বছর ধরে। আগে তো ব্যাংকে যাইতাম টাকা তুলতে। বছর চারে’ক হইলো নিজ গ্রাম থেকেই এজেন্টের কাছ থেকে টাকা তুলি। পোলার স্কুলের বেতনও ওইখানে জমা দেই, বলছেন তিনি। নাজমা বেগমের মতো অসংখ্য মানুষ যারা প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করেন টাকা জমা দেয়া বা তোলা ছাড়াও নানা ধরণের ব্যাংকিং সেবার জন্য এখন প্রতিনিয়ত ভিড় করেন গ্রামেই বিভিন্ন ব্যাংকের এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে। গ্রামীণ ব্যাংকিং সেবা ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রত্যন্ত এলাকায় বসেই হোয়াটসঅ্যাপে চলছে ব্যাংকিং, মোবাইলে মিলছে ঋণ। ব্যাংক হিসাব খুলছে অ্যাপেই। গত কয়েক বছর ধরেই গ্রামের মানুষদের এমন আরও অনেক সেবা দিচ্ছেন  এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। ২০১৬ সাল থেকে মুঠোফোনে আর্থিক সেবা বিকাশ ব্যবহার করছেন কুমিল্লার কাপড় ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান জনি। এত দিন টাকা পাঠানো, গ্রহণ ও মোবাইল রিচার্জেই সীমিত ছিল বিকাশের ব্যবহার। চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে প্রথমবারের মতো কামরুজ্জামান জনি বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা ঋণ পেয়েছেন।
 
এ জন্য কোনো কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করতে হয়নি তার, শুধু বিকাশের অ্যাপের মাধ্যমে ক্লিক করে আবেদন করেছেন তিনি। একইভাবে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী আমেনা বেগমও বিকাশের অ্যাপসের মাধ্যমে আবেদন করে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঋণ পেয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র আকারের ডিজিটাল ঋণের সূচনা করেছে সিটি ব্যাংক ও বিকাশ। কামরুজ্জামান জনি বলেন, হঠাৎ প্রয়োজনেই বিকাশ থেকে ঋণ পেয়েছি। তিন মাসে শোধ দিতে হবে। এভাবে পেলে খুব উপকার হবে। চড়া সুদে ধারদেনা করতে হবে না। আমেনা বেগম বলেন, গত মাসে হঠাৎ টাকার প্রয়োজন হলো। বিকাশ থেকেই ১ হাজার ৫০০ টাকা পেয়ে গেলাম। প্রতি মাসে ৫০০-এর কিছু বেশি টাকা হিসাবে রাখতে হবে, এমনিতেই কিস্তি কেটে নেবে। এভাবে তিন মাসে ঋণ শোধ হয়ে যাবে। এমন সেবা আমাদের খুব কাজে দেবে। এমন অনেক ডিজিটাল সেবা চালু করেছে ব্যাংকগুলো। এর ফলে ঘরে বসেই অ্যাপসের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকের গ্রাহক হওয়া যাচ্ছে। কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবার নিরাপত্তা পিন ঘরে থেকেই অনলাইনের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। আবার অনলাইন কেনাকাটায় নগদ টাকা বা কার্ডও ব্যবহার করতে হচ্ছে না, স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেন নিষ্পত্তি হচ্ছে। এ ছাড়া আগে থেকে অনলাইনের মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর, মোবাইল রিচার্জ, অনলাইন কেনাকাটা, বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সুবিধা তো রয়েছেই।
 
জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আর্থিক সেবা চালু করেছে দেশের অনেক ব্যাংক। এর মধ্যে অনেক ব্যাংক ঘরে বসে সেবা নিতে নতুন নতুন অ্যাপস চালু করেছে। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার থেকে শুরু করে গ্রামের মুদি দোকানের কেনাকাটা ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে এটিএম কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দ্রুত গতিতে গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ব্যাংকারদের মতে, অ্যাপ ও ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট সার্ভিসের চেয়ে দ্রুত গতিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ সাফল্য ব্যাংকগুলোকে অ্যাপ চালু করতে উৎসাহ দিয়েছে। কারণ অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহক কেবল একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করেই লেনদেন করতে পারছেন। এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ছোট ব্যবসায়ীসহ অনেকের তাৎক্ষণিক ছোট অঙ্কের ঋণ প্রয়োজন হয়। এখন মোবাইলেই তাৎক্ষণিক এ ঋণ পাবেন। এটি চালু হওয়ায় করোনার এ সময়ে ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি, হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছে মানুষ। করোনা ভাইরাসের কারণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেন বেড়েছে। গত তিন বছরের তুলনায় গত তিন মাসে ইস্টার্ন ব্যাংকের অ্যাপ ব্যবহার বেড়েছে। মার্চ মাসে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ইন্টারনেট লেনদেন বেড়েছে ৩০ শতাংশ, জানুয়ারি ও  ফেব্ররুয়ারি মাসের তুলনায় লেনদেনের পরিমানও বেড়েছে। এ বিষয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ বলেন, গ্রাহক যাতে শাখায় না এসেও সেবা গ্রহণ করতে পারেন, সে জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক শাখা পরিচালনার কাজ উন্নত করার চেষ্টা চলছে। সামনে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আরও নতুন নতুন গ্রামীণ সেবা চালু করার কথা ভাবছেন তারা।
 
এদিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক ই-সেবা নামের অ্যাপস চালু করেছে। এর ফলে মুঠোফোন অ্যাপসের মাধ্যমে দুই মিনিটে ঘরে বসেই খোলা যাচ্ছে নতুন হিসাব। আর এ অ্যাপস থেকে টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, সরকারি ভাতা ও ভর্তুকি গ্রহণসহ ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের সব সুবিধা মিলছে। এ অ্যাপের মাধ্যমে করোনকালীন সময়ে নতুন গ্রাহক তৈরি করেছে ব্যাংকটি। এদিকে ব্যাংকটি তার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর ভাতা পাঠানো শুরু করেছে। সোনালী ই-সেবার মাধ্যমে হিসাব খুলেছেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মোজাম্মেল জুয়েল। স্থানীয় একটি বেসরকারি কোম্পানীতে চাকরী করেন তিনি। তিনি বলেন, মোবাইলের মাধ্যমেই এজেন্ট ব্যাংক হিসাব খুলে ফেলেছি। এখন মোবাইল দিয়েই গ্রামে বসেই ব্যাংকের সব সুবিধা মিলছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ঘরে বসেই হিসাব খোলতে পেরেছি। সে জন্য ব্যাংকে যেতে হয়নি। এছাড়াও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ সহজে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যাওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের কুমিল্লা কর্পোরেট অফিসের কর্মকর্তা মোঃ শাহাজাহান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি এ  যুগে মানুষ ঘরে বসেই ব্যাংকিং সুবিধা পেতে পারে সেজন্য আমরা সেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছি। এসব সেবা পুরোপুরি চালু হলে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও এগিয়ে যাবে। গ্রামের মানুষকে পুরোপুরি ব্যাংকিং সেবায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে ডাচবাংলা ব্যাংক। এর মাধ্যমে আমানত গ্রহণ, টাকা পাঠানোর পাশাপাশি ঋণ বিতরণও হচ্ছে। এতে পুরোপুরি ব্যাংকিংয়ের স্বাদ পাচ্ছেন গ্রামীণ গ্রাহকেরা। ডাচবাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা আবু জাফর বলেন, গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংকগুলো শাখা করতে চায় না। এ জন্য এটিএম বুথ ও ফাস্ট ট্র্যাকের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিয়েছি।
 
গ্রাহকদের ঘরে বসে সেবা নিতে ট্রাস্ট মোবাইল মানি অ্যাপ চালু করছে ট্রাস্ট ব্যাংক। ব্যাংকটির সিনিয়র কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম জানান, নগদ টাকা ছাড়া এ অ্যাপের মাধ্যমে সব সেবা পাবেন গ্রাহকেরা। এখন যেকোনো ব্যাংকের ভিসা ও মাস্টারকার্ড থেকে টাকা আনা যাচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন সেবা ‘নগদ’ হিসাবে। তাই যেসব নগদ গ্রাহকের ভিসা বা মাস্টারকার্ড রয়েছে, তাঁদের নিজেদের নগদ হিসাবে টাকা জমার জন্য আর এজেন্টের কাছে যেতে হচ্ছে না। ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড এই তিন ধরনের কার্ড থেকে যেকোনো সময় নগদ হিসাবে টাকা আনা যাচ্ছে। জানা গেছে, এখন হিসাব খোলার পাশাপাশি টাকা স্থানান্তর, পরিষেবা ও ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ, মোবাইল হিসাবে টাকা স্থানান্তরসহ নানা সেবা গ্রামের নিজ ঘরে বসে অনলাইনে করা যাচ্ছে। তবে এই বিষয়ে কুমিল্লা অটোমোবাইল কোম্পানীর পরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ব্যাংকিং কার্যক্রমও সম্পূর্ণ অনলাইন হওয়ায় বেশ সুবিধা হচ্ছে। এতে পণ্যের সহজীকরণ হবে। চাপমুক্ত থাকবে ব্যবসায়ীরা। কুমিল্লার কাপড় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, মাল কিনতে গেলে এখন আর নগদ টাকা সঙ্গে করে নিতে হয় না। আনাচে কানাচে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হওয়ায় আগের মত নগদ টাকা সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে ছিনতাই কারীর কবলে পড়তে হয় না। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এই মনসুর বলেন, প্রযুক্তি বাস্তবায়ন অনেক ব্যয়বহুল হলেও ব্যাংকগুলোর জন্য পরিচালন ব্যয় কমাবে। যারা প্রযুক্তি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন করতে পারবে না তারা বাদ পড়ে যাবে।
উত্তরণবার্তা/এআর

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK
আরও সংবাদ