রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
ঢাকা সময়: ১৪:৪৯

২৫ মার্চের গণহত্যা এক কালো অধ্যায়

২৫ মার্চের গণহত্যা এক কালো অধ্যায়

মোহাম্মদ হানিফ হোসেন
 
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নৃশংসতম এক গণহত্যার দিন। এই দিন রাতে নিরস্ত্র, নিরাপরাধ ও ঘুমন্ত সাধারণ মানুষের উপর বর্বর হামলা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার সেই কালো রাতে ঢাকা শহরের চিত্র ছিল চারিদিকে ধ্বংসস্তুপ আর বিভীষিকা। ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে, জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামেস পরিকল্পিত গণহত্যার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে দমন করতে চেয়েছিল। এই অপারেশনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশে সব বড় বড় শহর দখল করে নেয়া।  রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। সেই পরিস্থিতির কথা আঁচ করতে পেরেছিলো এদেশের মুক্তিকামী মানুষ। সেই দুঃসময়ের চিত্রটি ছিল এরকমÑ আগুন জ্বলছে পলাশীর বস্তিতে, ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে বিদ্রোহ, দাউদাউ করে জ্বলছে বহু প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা। রাতভর কামানের গর্জন। চারদিকে আগুন আর আগুন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানার তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, জহুরুল হক হলসহ সারা ঢাকা শহরে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই হত্যাযজ্ঞের মূল কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা হলেও হত্যাকান্ড চালানো হয় দেশজুড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলোগুলো ছিল হানাদারদের বিশেষ লক্ষ। একমাত্র হিন্দু আবাসিক হল- জগন্নাথ হল পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এতে ৬০০ থেকে ৭০০ আবাসিক ছাত্র নিহত হয়। কিন্তু অকুতোভয় বাঙালিরা পাল্টা প্রতিরোধ সৃষ্টি করে এবং সূচনা ঘটায় স্বাধীনতা যুদ্ধের। বলা যায়, ২৫ মার্চের গণহত্যা বাঙালিকে ক্রুদ্ধ ও প্রতিবাদমুখর করে তোলে। আপামর বাঙালি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায় এবং বাঙালিরা দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীকে বিতাড়িত করার সংগ্রামে লিপ্ত হয়।  উল্লেখ্য, জগন্নাথ হল এবং অন্যান্য ছাত্র হলগুলোতে পাকিস্তানীদের হত্যাযজ্ঞের চিত্র ভিডিওতে ধারণ করেন বিুয়েটের শিক্ষক প্রফেসর নূর উল্লাহ। 
 
বহু বছর ধরেই দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার দাবি জানিয়ে এসেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানবতাবাদী মানুষ। কারণ এ দিন থেকেই সূত্রপাত ঘটে প্রায় নয় মাসের নিষ্ঠুরতা, যাতে সর্বমোট ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন, ধর্ষিত হন তিন লক্ষাধিক বাঙালি নারী। ২০১৭-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির এক আলোচনা সভায় ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করার দাবি ওঠে। সেবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি উত্থাপন করেন প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমদ। দাবি করা হয়, পঁচিশে মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করা হোক। সেদিন সংসদ নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রস্তাবটি সমর্থন করেন এবং একটি দিন নির্ধারণ করে আলোচনার প্রস্তাব করলে তা সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। মাননীয় স্পীকার ১১ মার্চ শনিবার আলোচনার দিন নির্ধারণ করেন। নির্ধারিত দিনে পঁচিশে মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ প্রস্তাবের উপর ৫৬ জন এমপি দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতার পূর্বে গণহত্যার ১৮ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। নৃশংসভাবে খুন হয়ে যাওয়া নারী-পুরুষ-শিশুর লাশ দেখে জাতীয় সংসদে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর অপপ্রচারের কঠোর সমালোচনা করে দীর্ঘ ২৫ মিনিট আবেগাপ্লুত বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর সর্বসম্মতক্রমে রাষ্ট্রীয়ভাবে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত মহান জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। সেই থেকে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে।
 
২৫ মার্চের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিক পর্যায়গুলো। ১৯৪৭ সালের জুন মাসেই শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক। পরবর্তী সময়ে এ দেশে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ধারা থেকেই শুরু আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একদিনে হয়নি। তার সামনে-পেছনে রয়েছে জ্বলন্ত ইতিহাস। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন পেরিয়ে ১৯৫৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশকে একীভূত করে পশ্চিম পাকিস্তান নাম রাখা হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি সম্মেলনে তিনি কার্যসূচিতে তার একটি প্রস্তাব যুক্ত করার দাবি জানান। অন্যরা রাজি না হওয়ায় তিনি সম্মেলন থেকে ওয়াকআউট করে সাংবাদিকদের কাছে ছয়টি ধারাসংবলিত প্রস্তাব তুলে ধরেন। যা ইতিহাসের ছয় দফা। প্রস্তাবিত ছয় দফা ছিল স্বায়ত্তশাসনকেন্দ্রিক। এর পক্ষে প্রবল জনমত গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। ১৯৬৮ সালের জুন মাসে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’য় জড়িয়ে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালায়। ছাত্রদের পাশাপাশি শ্রমিকরাও তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ওই অন্দোলন অনেকটাই পরিষ্কার করে দেয় আগামীর মুক্ত স্বদেশ ভাবনা। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ নতুন করে জারি হয় সামরিক শাসন। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ততদিনে এক দফা। ১৯৭০ সালের ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভায় দলের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন জয় বাংলা। তিনি তখন এক অনন্য উচ্চতায়। তিনি তখন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ জয় পায়। এটা ছিল ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি জনগণের ম্যান্ডেট। ১৯৭১ সালের ১ মার্চের  পর কার্যত পূর্ব পাকিস্তান শব্দটি আর এ দেশে উচ্চারিত হয়নি। তখন থেকেই এটি বাংলাদেশ। ভাষার দাবিতে ২৩ বছর আগে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা স্বাধীনতার দাবিতে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে।  ১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করে। জনতা বিদ্রোহ-ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশে পতাকা উত্তোলন। ৩ মার্চ ঘোষণা হলো পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার, জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। বহুপ্রতীক্ষিত ৭ মার্চ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। অসহযোগ আন্দোলন, যুদ্ধের প্রস্তুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা বাংলাদেশে। তারপর ২৫ দিনের অসহযোগ আন্দোলন, ২৬০ দিনের মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ। এবং স্বাধীন বাংলাদেশ।
 
 ২৫ মার্চসহ পুরো নয় মাসে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা যে দ্রুততায় বাংলাদেশে মানুষ হত্যা করা হয়েছে- তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দৈনিক গড়ে ৬০০০ মানুষ খুন করা হয়েছে ২৬০ দিনে। কম্বোডিয়ার এই হার ছিল ১২০০। খুলনার চুকনগরেই ২০ মে ১৯৭১ একদিনে ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। শতশত বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে।
 
আমরা মনে করি, ২৫ মার্চ কালরাতের সেই ভয়াবহ নৃশংসতা এবং ৯ মাসের হত্যাযজ্ঞের বিবরণ জনসমক্ষে নিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন এই হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ করে একটি দিবস পালন করা। একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে দিনটি নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়। একই সঙ্গে আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ১৯৭১ সালের ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যের বিচারের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠন। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা, সম্পদ ধ্বংস, লুণ্ঠনসহ নারী নির্যাতনের জন্য যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ। পাকিস্তানের কাছে পাওনা সব অর্থসম্পদের হিস্যা আদায় করাও  সময়ের দাবি। শুধু ইতিহাস রক্ষাই নয়, পাকিস্তানি অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবার দায়বদ্ধতা আছে আমাদের; দায়বদ্ধতা আছে গণহত্যার মতো পাশবিক প্রবৃত্তি বোধের। তাই বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে। কেবল ‘গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা বা পালনই নয়, ২৫ মার্চের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিকে বেগবান করা জরুরি। আর্মেনিয়া, রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া, সিয়েরা লিওন, বসনিয়ার মতো বাংলাদেশের গণহত্যাকে বিশ্ব সংস্থার স্বীকৃতি আদায় করতে হবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, বিশ্ববাসী একাত্তরের নৃশংসতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
 
লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK