বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৬ মাঘ ১৪২৮
ঢাকা সময়: ২৩:৩৬
ব্রেকিং নিউজ

চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ

চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ

ড. মাসুদ পথিক
 
আমাদের রক্তধারায় নানা ধাপে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ দিয়েছে স্বাধীনতা, দিয়েছে মুক্তির সোপান। শিল্প-সাহিত্যের অপার, অগাধ মশলা আর প্রেরণার স্ফুলিঙ্গ। গত ২৬ মার্চ আমরা উদযাপন করলাম জাতীয়ভাবে স্বাধীনতার ৫০ বা সুবর্ণজয়ন্তী। এবারে কড়া নাড়ছে চেতনার দরজায় বিজয়ের ৫০ বা সুবর্ণজয়ন্তী। বিজয়ের এমন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কিছু ভাবনা।
তথাপি শিল্পকলার সর্বকনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় শাখাটির নাম চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের যাত্রা ইতিহাসে আজ অবধি নানা বিষয়ে নির্মিত হয়ে আসছে।
প্রেম-বিরহ, দেশপ্রেম, রহস্য ও গোয়েন্দাসহ অতিপ্রাকৃত ভৌতিক, আধি ভৌতিক, জাদু বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা প্রভৃতি। তথাপি মানুষই এখন এর মূল কেন্দ্রবিন্দু। অতএব মানুষের ইতিহাস, বীরত্বে বহুকৌণিক আলো ফেলে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি হচ্ছে। সম্প্রতি প্রযুক্তি দখল করে নিয়েছে সিনেমার একটি বড় অংশ। কিন্তু এত কিছুর ভিড়েও যুদ্ধ-সংগ্রামের ইতিহাস যেন ভিজ্যুয়াল দালিলিক রূপ পেয়েছে সিনেমার কল্যাণে। পৃথিবীর বড় সব বিপ্লব, যুদ্ধ এবং মুক্তিসংগ্রামের ওপর রচিত হয়েছে সাহিত্য। কবিদের কবিতায়, নাট্যকারের নাটকে, গল্পকারের গল্পে কিংবা উপন্যাসে গাথা হয়েছে এবং বিপ্লব-সংগ্রামের নানামাত্রিক বয়ান।
শিল্পের সবচেয়ে আধুনিক মাধ্যম সিনেমাও এক্ষেত্রে কম যায়নি। এসব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বড় অনেক সিনেমা। নির্মিত সব চলচ্চিত্রই যে মান বিচারে নিখুঁত হয়েছে তা নয়। অনেক সিনেমা সাফল্য পায়নি। তবে সংখ্যায় কম হলেও কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সার্থক শিল্প হিসেবে। যা নির্মাণগুণে হয়েছে শিল্পিত, সার্থক এবং কালজয়ী। আবার অনেক চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগও রয়েছে।
তো, হলিউড বলিউড কিংবা উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র বেশ সমাদৃত হচ্ছে কয়েক দশক ধরে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও লেগেছে তার ছোঁয়া।
ভারতীয় উপমহাদেশ তথা পুরো পৃথিবীরই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যা ঘটে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ এই ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রাম করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করে ‘বাংলাদেশ’ নামের লাল-সবুজের দেশ।
যুদ্ধের ৫০ বছর অতিবাহিত হতে চলছে। পাঁচ দশকের এই দীর্ঘ যাত্রায় ঘটনাটি অনেক শিল্প-সাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়েছে বটে; কিন্তু সিনেমা অঙ্গনে আশানুরূপ এখনও কাজ হয়নি।
অর্থাৎ বাঙালি জাতির মহান বীরত্বগাথা নিয়ে এখনও অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। যার থেকে শেখার আছে পৃথিবীর বহু নিপীড়িত বঞ্চিত স্বাধীনতাকামী মানুষের। এছাড়া এটিকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে প্রতিষ্ঠিত করতেও তেমন সিনেমাটিক উদ্যোগ হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারপরও বেশ কিছু কাজ হয়েছে। সেগুলোর আলোকেই আজকের আলোচনার প্রয়াস করছি।
অনেকে দীর্ঘ ৯ মাসের এই রুদ্ধশ্বাস সংগ্রামের চিত্র কখনও যুদ্ধের আকারে, কখনও গ্রামীণ পরিবেশে সেই সময়কার মানুষের জীবনযাপনের মাধ্যমে, আবার কখনও মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের পথচলার গল্প সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করেছেন।
মূলত ময়দানের যুদ্ধ শুরুর আগেই আমাদের চলচ্চিত্রে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যেমনটি আনোয়ার পাশা শুরু করেছিলেন তার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ দিয়ে, ১৯৭০ সালে। এ সময় আমাদের প্রকৃত মুক্তির আকাক্সক্ষা আর সংগ্রামকে যে চলচ্চিত্রটি মূর্ত করে তোলে, তার নাম ‘জীবন থেকে নেয়া’। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র না হলেও মুক্তির আকাক্সক্ষা যে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে প্রবল ছিল এবং সেই বিস্ফোরণ যে কোনো সময় ঘটতে পারে, সেটি আমজাদ হোসেনের লেখনীর মাধ্যমে জহির রায়হান সেলুলয়েডের পর্দায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। বলা যায় এটি এ নির্মাতার জীবনঘনিষ্ঠতায়, মহাকাব্যিক গভীরতায়, সর্বোপরি বিষয়ের মহত্ত্বে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। একই পরিচালক তার ‘আর কতোদিন’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি শুরু করেন যুদ্ধবিরোধী মানবতাবাদী চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। কিন্তু এটি আলোর মুখ দেখেনি। যুদ্ধ চলাকালে জুলাই মাসে জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার জন্য তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। এই প্রামাণ্যচিত্রে যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রাণ বাঁচার আশায় অসহায় মানুষের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণের চিত্র বাস্তব ও মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে। এ নির্মাতার ‘অ্যা স্টেট ইজ বর্ন’ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। প্রায় একই সময় আলমগীর কবির বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ডট্র্যাকে ওভারল্যাপ করে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘লিবারেশন ফাইটার্স’।
শিশুদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা নিয়ে ওই সময় নির্মিত বাবুল চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ও বেশ আলোচিত ছিল।
বলা যায়, জহির রায়হান ছিলেন সমসাময়িক অনেকের চেয়ে এগিয়ে, যুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযুদ্ধকে ফিতায় বন্দি করাসহ যুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।
বায়ান্নর রক্তাক্ত ঘটনার পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে কিছু শিক্ষিত সচেতন সংস্কৃতিসেবী ও বুদ্ধিজীবী পূর্ববঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্প স্থাপন ও নির্মাণের ব্যাপারে সচেতন হন। ১৯৫৬ সালে তৈরি হয় পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। চলচ্চিত্র নির্মাণে জড়িত হন ভাষা সংগ্রামী জহির রায়হান, পরিবেশনা ও প্রযোজনায় জড়িত হন ভাষা সংগ্রামী মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, অভিনয়ে জড়িত হন ভাষা সংগ্রামী জহরত আরা, অভিনয় ও সংগীতে জড়িত হন আলতাফ মাহমুদ। জহির রায়হান ফেব্রুয়ারিতে একটি ছবি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু সরকার তাকে সেই ছবি নির্মাণের অনুমতি দেয়নি।
অতএব ভাটা পড়ে, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের যুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে শুরুর দিকে কিছুটা আগ্রহ থাকলে পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহে ভাটা পড়ে নির্মাতাদের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি হয় মাত্র ৪টি। ১৯৭৩ সালে ৪টি এবং ১৯৭৪ সালে দুটি।
পরবর্তী সময়ে দু-একটি বিচ্ছিন্ন প্রয়াস ছাড়া ঢাকাই চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকে সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে যেগুলো নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে মাত্র কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোর শিল্পমান নিয়ে রয়েছে প্রশ্নের অবকাশ। উল্লেখ করার মতো চলচ্চিত্র হচ্ছে ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এসব চলচ্চিত্রের পর নির্মিত হয় আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’, হারুন অর রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’ ও হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ অনেকটা মানসম্মত।
ইতিহাসের নিরিখে এটা জানা যায়, ১৮৯৫ সালে চলচ্চিত্রের সূচনার ১০ বছরের মধ্যেই আমাদের এই উপমহাদেশে প্রথম যে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় তা ছিল রাজনৈতিক চলচ্চিত্র।
১৯০৫-এর ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতার টাউন হলে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের একটি প্রতিবাদ সভা হয়েছিল, এ ছবিতে তাকেই ক্যামেরাবদ্ধ করেন মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামের হীরালাল সেন। ‘বন্দে মাতরম’ গেয়ে শেষ করা ছবিটির বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থে খাঁটি স্বদেশী সিনেমা’।
১৯৬৮-৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের পটভূমিকায় ১৯৭০ সালে জহির রায়হান নির্মাণ করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’। এ ছবিতে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি ও মিছিল, শহিদ মিনার এবং ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’তে। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার সূত্রগুলোকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় এই চলচ্চিত্রে। এ ছবিতে একগোছা চাবির মধ্য দিয়ে সিম্বলিকভাবে শাসনক্ষমতা বোঝানো হয়। ১৯৭০ সালে নির্মিত ফখরুল আলম পরিচালিত ‘জয় বাংলা’ নামের ছবিটি পাকিস্তানি সেন্সর বোর্ড আটকে রাখে। ১৯৭২ সালে এটি মুক্তি পায়।
বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তর সালে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যে বাঙালির সমগ্র জনজীবনে গভীর ছাপ রেখে যায়। শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের ওপর এর প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। সুতরাং স্বাধীনতার অব্যবহিত উত্তরকালে বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রে যে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব পড়াটাও ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের দেশের অনেক গুণী নির্মাতা এই গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধকে তাদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার ছবি তুলেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল্লাহ। হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার বাসায় পড়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাধারণ মানের ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে গণহত্যার দৃশ্য ধারণ করেন।
জাহির রায়হান ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম চলচ্চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর নির্মাতা।
মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর আবদুল জব্বার খানকে পরিচালক করে একটি চলচ্চিত্র বিভাগ খোলা হলেও মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম সিরিয়াস প্রচেষ্টা হয় বেসরকারি উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব দি ইনটেলিজেনশিয়া’ এবং ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী কলাকুশলী সহায়ক সমিতি’র যৌথ উদ্যোগ ও আর্থিক সহায়তায়। নভেম্বর মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ৪টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়। এগুলো হলোÑ জহির রায়হান পরিচালিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’, আলমগীর কবির পরিচালিত ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ এবং বাবুল চৌধুরীর পরিচালনায় ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার দেড় মাসের মধ্যেই জহির রায়হান নিখোঁজ হন। পরবর্তীকালে আলমগীর কবির এই সিনেমাটি নির্মাণ করেন।
স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গঠিত গেরিলা দলের পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান এবং দেশ স্বাধীন নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটির নাম ‘ওরা ১১ জন’। এই ১১ জনের ১০ জনই বাস্তবের মুক্তিযোদ্ধা, যারা পেশাদার শিল্পী ছিলেন না। এরা হলেনÑ খসরু, মঞ্জু, হেলাল, ওলীন, আবু, আতা, নান্টু, বেবী, আলতাফ, মুরাদ ও ফিরোজ। ১১-দফার ছাত্র আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে মাথায় রেখে প্রতীকী অর্থে এ চলচ্চিত্রের নামকরণ করা হয় ‘ওরা ১১ জন’।
চলচ্চিত্রের শুরুতে টাইটেলে ৬টি কামানের গোলার শব্দ শোনা যায়। নির্মাতার মতে, এই ৬টি শব্দ হচ্ছে ৬-দফা দাবির প্রতীকী শব্দ। এই চলচ্চিত্রে যে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল সবই ছিল সত্যিকারের। ১১ আগস্ট ১৯৭২-এ মুক্তি পায় এই চলচ্চিত্রটি। ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রে ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ এবং ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যাঁরা’ গানগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল।
পরবর্তীকালে ‘ওরা ১১ জন’ ছবির সিক্যুয়েল হিসেবে ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমান-এর পরিচালনায় নির্মিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’। এই চলচ্চিত্রটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর কারণে ব্যাপক সমালোচিত হয়।
১৯৭২ সালের ৮ নভেম্বর মুক্তি পায় সুভাষ দত্তের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। কুসুমপুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাকা-, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ এবং প্রতিবাদে বাঙালিদের মুক্তি সংগ্রামকে কেন্দ্র করে এই চলচ্চিত্র নির্মিত। যুদ্ধশিশুর মতো বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ফুটে উঠেছে এই চলচ্চিত্রে। ছবিটির সেøাগান ছিলÑ ‘লাঞ্ছিত নারীত্বের মর্যাদা দাও, নিষ্পাপ সন্তানদের বরণ কর…’।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নানা চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়ে আসছে। এ দেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশ জুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্রের অনেকগুলোতে সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহতা উঠে এসেছে। যেমন : চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২), ‘সংগ্রাম’ (১৯৭৩), ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭), নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’ (১৯৯৩)।
সময়ের ধারাবাহিকতায় কিছু চলচ্চিত্রে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধকে উপস্থাপন না করে পরোক্ষভাবে এর ভয়াবহতাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপস্থাপন করা হয়েছে যুদ্ধের শিকার হওয়া শরণার্থী বা পালিয়ে বেড়ানো মানুষের জীবনাবেগকে। এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫), হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৩), মোরশেদুল ইসলামের ‘খেলাঘর’ (২০০৬), মাসুদ পথিকের ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ (২০১৪), ‘মায়া : দ্য লস্ট মাদার’ (২০১৯)।
কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে যুদ্ধ-পূর্বকালীন ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে। এর প্রভাবও রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতা নিয়ে। এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্যে আছেÑ জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭১), খান আতাউর রহমানের ‘এখনো অনেক রাত’ (১৯৯৭), নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ (১৯৭৪), হারুন-উর-রশিদের ‘মেঘের অনেক রং’ (১৯৭৬)।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন চলচ্চিত্রকার লিয়ার লেভিন ‘জয় বাঙলা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন; কিন্তু তিনি তা শেষ করতে পারেনি। ‘ডায়েরিজ অব বাংলাদেশ’ নামে ১৯৭২ সালে আলমগীর কবির একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন।
বর্তমান সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার উদ্যোগে চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কাজ এগিয়ে চলছে। যার ধারাবাহিকতায় অধিক পরিমাণে অনুদান, সিনেমা হল নির্মাণে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণে তার আগ্রহ চেতনা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তথাপি, এটাই সত্যি যে, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরবের মহান ঘটনা।
আমাদের জাতীয় জীবনের এই মহান ঘটনাকে আরও নানান ডাইমেনশনে চিত্রিত হয়েছে এবং হচ্ছে। অব্যাহত থাকবে এই নির্মাণ তৎপরতা। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিজ্যুয়ালি রিপেন্টস হবে। বিনির্মাণ হবে।
 
লেখক : কবি ও চলচ্চিত্র গবেষক এবং সহ-সম্পাদক, উত্তরণ

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK