বুধবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ৬ মাঘ ১৪২৮
ঢাকা সময়: ২২:৪০
ব্রেকিং নিউজ

স্মৃতি ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের কামালপুর রণাঙ্গন

স্মৃতি ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের কামালপুর রণাঙ্গন

হারুন হাবীব
 
ময়মনসিংহ তখন বৃহত্তর জেলা। জামালপুর জেলা হয়েছে পরে। তারও পরে শেরপুর। এই দুই জেলার সর্বশেষ উত্তরে কামালপুর। গারো পাহাড়ের পাদদেশে রণক্ষেত্র কামালপুর আমার মতো অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির অঙ্গন- রক্তরঞ্জিত রণক্ষেত্র- যে নামটি আজও রোমাঞ্ছিত করে আমাদের।
কামালপুর আগে ছিল দেওয়ানগঞ্জ থানায়। পরে ভাগ হয়ে বক্সিগঞ্জে গেছে। স্কুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সরওয়ার জাহান মুকুলের বাড়ি সীমান্ত-ছোঁয়া বলে পাহাড় দেখার ইচ্ছে ছিল প্রবল। কিন্তু যাওয়া হয়নি। সেই অপূর্ণতা পূরণ করেছে ১৯৭১। কিন্তু সেই একবারই, সেই থেকে ঘনিষ্ঠতা, প্রথম প্রেমের মতো। কামালপুরের মাটি, বাতাস, গাছপালা সব যেন আমার নিজের। ভারতের সীমান্তরেখা পেরোলেই মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জ। ওখান থেকে মাইল পঞ্চাশেক এগুলেই তুরা শহর। মুক্তিযুদ্ধে আরেক স্মৃতির শহর আমার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের এমএ শেষ পর্বের ছাত্র আমি। পাকিস্তানি সামরিক শাসক আর তাদের বঙ্গীয় দালাল রাজনীতিবিদেরা ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল মানবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হাতে ক্ষমতা ছাড়বে না! অতএব গণবিক্ষোভ প্রতিদিন তুঙ্গে উঠছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া বন্ধ হয়েছে। মিছিল আর বিক্ষোভের জনপদে পরিণত হয়েছে পূর্ব বাংলা। এরই মধ্যে রমনা রেসকোর্সে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সম্ভাব্য যুদ্ধের পথনির্দেশনা পেল বাঙালি। শুরু হলো ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন। পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে পূর্ব পাকিস্তান চলতে থাকল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে।
কিন্তু বাঙালি জানতে পারেনি- ওদের নির্মমতা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। একদিকে চলতে থাকল নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বৈঠক, অন্যদিকে গোপনে বাঙালিদের স্বমূলে ধ্বংস করার প্রস্তুতি। দিন কয়েকের মধ্যেই ঢাকার মাটিতে ঘটল ২৫ মার্চের নারকীয় গণহত্যা। নির্বিচার সেই সামরিক আগ্রাসনে মারা গেল হাজার হাজার নিরীহ ছাত্র-জনতা। ধর্ম ও পাকিস্তানের অখণ্ডতার নামে ওরা এভাবেই দমাতে চেয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অধিকার, গণতন্ত্র ও মানুষের অর্জিত সভ্যতা!
কিন্তু পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। সৈন্যদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শুরু হলো স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। আমি ঢাকা ছাড়ি ২৫ মার্চের আগেই। নিজের এলাকা দেওয়ানগঞ্জে এসে পৌঁছি। চলতে থাকে নিজের এলাকাভিত্তিক সীমিত যুদ্ধ প্রস্তুতি। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে সেনাবাহিনী জামালপুর হয়ে দেওয়ানগঞ্জ দখল করলে ভারত সীমান্তে পাড়ি দেওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা রইল না। কারণ যুদ্ধে নামতে হলে অস্ত্র চাই, প্রশিক্ষণ চাই।
সেই থেকে যুদ্ধের সাথে ৯ মাসের বসবাস। কামালপুরের ইপিআর সীমান্ত চৌকিতে এরই মধ্যেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে পাকিস্তান বাহিনী। সীমান্তের ওপারে ভারতীয় মহেন্দ্রগঞ্জ অঞ্চলে লাখো শরণার্থী ভিড় করেছে। এপ্রিলের শেষ থেকেই মেঘালয়ের পাহাড়গুলোতে গড়ে উঠতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। শুরু হয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। পাহাড়ের গাছপালা কেটে গড়ে উঠতে থাকে মুক্তিবাহিনীর তাঁবু, শরণার্থীদের জন্য শত শত শিবির। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী, প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজন সর্বাত্মক সমর্থন জোগাতে থাকে বাংলাদেশের মানুষকে।
একজন গেরিলা যোদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধে কিছু বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয় আমাকে। মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র ‘জয় বাংলা’ সাপ্তাহিক ও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর রণাঙ্গন সংবাদদাতার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। ফলে নিজের যুদ্ধ অঞ্চলের বাইরেও বহু রণাঙ্গনের এবং বহু সহযোদ্ধার সাহচর্য পেয়েছি; মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকÑ রাজনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠভাবে চিনবার সুযোগ ঘটেছে, ঘুরেছি এক রণাঙ্গন থেকে আরেক রণাঙ্গনে, এক শরণার্থী শিবির থেকে আরেক শিবিরে। এক হাতে প্রিয় স্টেনগান, কাঁধে ঝুলানো ক্যামেরা। কখনও থাকত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া একটি টেপ রেকর্ডার। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে এই ৩টি অস্ত্র ছিল আমার প্রিয় সহচর।
মুজিবনগর সরকার জুলাই মাসে দেশকে ১১টি যুদ্ধ-সেক্টরে ভাগ করে। আমাদের অঞ্চলটির নাম হয় ১১ নম্বর সেক্টর। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া মেজর আবু তাহের নতুন সেক্টরের অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন। এপ্রিল থেকে শুরু করে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত কামালপুর ও ধানুয়া কামালপুর ঘিরে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লাগাতার যে লড়াই চলেÑ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তা এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। চলে একের পর এক রক্তাক্ত লড়াই, ঘটে মৃত্যুর পর মৃত্যু। অগণিত সহযোদ্ধার রক্তে ভেসে গেছে কামালপুরের মাটি। প্রাণ দিয়েছেন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সেনারা, মরেছে পাকিস্তান বাহিনীর অসংখ্য সৈনিক।
ছোট-বড় অসংখ্য যুদ্ধের স্মৃতি বহন করা রণক্ষেত্র কামালপুরের মাটি। নিত্যদিন গুলিবিনিময় হয়েছে ধানুয়ার মুক্তিযোদ্ধা বাংকার ও কামালপুরের মধ্যে। অগণিত যুদ্ধ ঘটেছে উঠানিপাড়া, ঘাসিরপাড়া, গলাকাটি, মৃধাপাড়া, বালুরগ্রাম, দত্তেরচর, যাদুরচর, সাতানিপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে। রক্তাক্ত যুদ্ধ হয়েছে ৩১ জুলাই। ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজের নেতৃত্বে গভীর রাতে সন্তর্পণে এগিয়ে গেছে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল। সেই রাতের যুদ্ধটি ছিল সম্মুখ সমরের ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধ। যে পাকিস্তানিরা বাঙালিকে ‘ভীতু’ ও ‘কাপুরুষ’ বলে উপহাস করছে, সেদিন তারা বিলক্ষণ বুঝেছিলÑ কোন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ছে তারা! দেশপ্রেম এমনই গভীর ও আবেগময় প্রেম- যা অসাধ্য সাধন করতে পারে। সেদিনের যুদ্ধে সালাউদ্দিন মমতাজ পাকিস্তানি সৈন্যদের বাংকারে ঢুকে পড়েন। অসম সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা হাতাহাতির এক সময় যুদ্ধে লিপ্ত হন পাকিস্তানিদের সাথে। পরাস্ত করেন বহু সংখ্যককে। শেষ পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন তিনি আরও কয়েকজনের সাথে।
৮টি ‘সাব-সেক্টর’ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এই বৃহৎ অঞ্চলটি ছিল মূলত সাধারণ ছাত্র-জনতার। সর্বমোট ২২ হাজার যোদ্ধা, যারা প্রায় সকলেই ছাত্র, সাধারণ গ্রামবাসী, না হয় শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী। সদর দপ্তর মহেন্দ্রগঞ্জ। ‘সাব-সেক্টর’ মানকারচর, ডালু, পুরাকাশিয়া, রংড়া, বাগমারা, শিববাড়ি ও মহেশখোলা। এসবের প্রায় প্রতিটিই ঘুরে দেখার সুযোগ হয় আমার। এই যুদ্ধাঞ্চলের পরিধি ছিল কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল থেকে শুরু করে সাবেক বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনার হাওড় অঞ্চল নিয়ে।
সামরিক দিক থেকে কামালপুর হয়ে ওঠে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ঘাঁটির পতন ঘটানো গেলে সুবিধাজনকভাবে বক্সিগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া যাবে। সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের সেভাবে পরিকল্পনাটা গুছিয়েছিলেন। অধিনায়ক তাহের বেশিরভাগ সময় নিজে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। অসম সাহসী এই অধিনায়কের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে নানা যুদ্ধাঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ ঘটে আমার। সেই সুবাদে নানা যুদ্ধক্ষেত্রের সহযোদ্ধাদের সাথে কথা বলেছি, কখনও ছবি তুলেছি। মনে পড়ে, যুদ্ধকালীন সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে আমাদের এলাকায় আসেন ‘ওয়্যার কমিশন’-এর পাঁচজন সামরিক অফিসার। লে. আসাদ, লে. মিজান, লে. তাহের, লে. কামাল ও লে. হাসেম।
মেজর আবু তাহের গেরিলা পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রচলিত যুদ্ধরীতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। শুধু কামালপুর নয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রতিটি জায়গায় ছোট ছোট গেরিলা দল পাঠিয়ে নাস্তানাবুদ করে তুলেছিলেন পাকিস্তানি সৈন্যদের। তার এই যুদ্ধ-কৌশলে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, বাহাদুরাবাদ, দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ি, উলিপুর, চিলমারিসহ গোটা এলাকার পাকিস্তানি বাহিনী।
এসব ‘অপারেশন’-এর সবগুলোর খবর রাখা সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে। সেক্টরের প্রধান গোয়েন্দা কর্মকর্তা সৈয়দ মুনিরুজ্জামান এবং স্টাফ অফিসার ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ুম বরাবর আমাকে সহযোগিতা করেছেন। সেক্টরের প্রধান মেডিকেল অফিসার ডা. প্রেমাংকুর রায়ের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল একটি ফিল্ড হাসপাতাল। সে হাসপাতালে আসতো অসংখ্য আহত মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ। এরা বেশির ভাগই যুদ্ধে কিংবা পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকারের হাতে আহত।
পাকিস্তান বাহিনী কামালপুর বিওপি ঘিরে সুরক্ষিত বাংকার ও মাইন বসিয়ে জায়গাটা বিপজ্জনক করে তুলেছিল। তাদের ঠিক মুখোমুখি অবস্থানে ছিল আমাদের মুক্তিবাহিনীর বাংকার। ধানুয়ায় বাংকারগুলোতে রাইফেল-লাইট মেশিনগান তাক করে মুক্তিবাহিনী মাসের পর মাস কাটিয়েছে। মনে পড়ে, আবু ইউসুফ খান বীরবিক্রম, নুরুল ইসলাম, আবু সাঈদ খানসহ অসংখ্য সহযোদ্ধাকে যাদের সাথে ধানুয়ার ডিফেন্স পোস্টগুলোতে দায়িত্ব পালন করেছি আমরা। কর্নেল তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ খান ছিলেন দুরন্ত দেশপ্রেমিক, সুদূর সৌদি আরব বিমান বাহিনী থেকে পালিয়ে এসে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।
অক্টোবর-নভেম্বর থেকে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে যায়। প্রতিটি এলাকায় গেরিলা আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কামালপুর দখলের চেষ্টা চলতে থাকে। মনে পড়ে, ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে আলোচনা শেষে মেজর আবু তাহের একবার কামালপুর ও বক্সিগঞ্জের পাকিস্তানি ঘাঁটি আক্রমণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন। তাদের সরবরাহ বন্ধ করতে কামালপুর-বক্সিগঞ্জের রাস্তায় বসানো হলো ‘কাট অব পাটি’।
পরিকল্পনা মতে, ১৩ নভেম্বর রাত ২টারও কিছু পরে কামালপুরের ওপর একযোগে আক্রমণ শুরু হলো। লে. মান্নানের নেতৃত্বে আমি ও আবু সাঈদসহ আরও কয়েকজনের অবস্থান হলো কামালপুরের পশ্চিম পাশে ঘাসিরপাড়ার একটি ধানক্ষেতে। স্মরণীয় সেই যুদ্ধে যার যার বাহিনী নিয়ে কামালপুর আক্রমণ পরিচালনা করলেন কোম্পানি কমান্ডার আব্দুস সালাম, হেলালুজ্জামান পান্না, লে. আব্দুল মান্নান, লে. মিজান, লে. মাহফুজ, লে. তাহের, সদরুজ্জামান হেলাল, আবু সাঈদ, জয়নাল আবেদীন, আখতার আহমেদসহ আরও অনেকে। মোট কথা, সেক্টরের প্রায় সবগুলো মুক্তিযোদ্ধা দল এই যুদ্ধে অংশ নিল। এছাড়াও থাকলেন আবু ইউসুফ খান এবং অধিনায়ক আবু তাহেরের দুই ছোট ভাই বাহার ও ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, এনায়েত হোসেন সুজা ও ইয়াকুব তাদের গ্রুপ নিয়ে।
মোট কথা, কামালপুর দখলের লক্ষ্যে ১৩ নভেম্বরের অভিযানটি ছিল বিস্তৃত পরিকল্পনার, যা আমার স্মৃতিতে ভাস্বর। দুই সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ কামালপুর। যে করেই হোক পতন ঘটাতে হবে সুরক্ষিত পাকিস্তানি দুর্গের। সেক্টর হেড কোয়ার্টারে ‘ওয়াকিটকি’ নিয়ে ব্যস্ত সৈয়দ মনিরুজ্জামান। যুদ্ধ পরিচালনা করছেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের নিজে। এ যুদ্ধে তার সাংকেতিক নাম ‘কর্তা’; এ নাম ধরেই তার সাথে ‘ওয়াকিটকি’তে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে সীমান্তের ওপার থেকে আর্টিলারি দিয়ে সাহায্য করতে।
মূলত রাত ১২টা থেকে কামালপুর ঘিরে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ অবস্থান নিলেও আক্রমণ শুরু হলো আরও বেশ পরে। চলতে থাকল বৃষ্টির মতো গোলা ও গুলিবর্ষণ, সেই সাথে চলল ‘জয় বাংলা’ সেøাগান। সর্বাত্মক আক্রমণে হতচকিত পাকিস্তানিরা পাল্টা গুলিবর্ষণ করে জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে থাকল না। গোলাগুলির অবিশ্রান্ত কানফাটা শব্দে ভেঙে দিল শেষ রাতের নিস্তবদ্ধতা। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর বারতা, গা ছুয়ে চলেছে বুলেটÑ শতে শতে। মর্টার ফাটছে একের পর এক। আর্টিলারি সেলগুলো বিকট শব্দে ফেটে মাটি, গাছপালা উপড়ে ফেলছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা দুর্বার। কয়েক ঘণ্টার অবিশ্রান্ত গোলাগুলির পর ভোরের দিকে মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম তার বাহিনী নিয়ে কামালপুর ঘাঁটির কাছে চলে গেলেন। অন্যদিকে ঢুকে পড়েন লে. মিজান তার কোম্পানি নিয়ে। হঠাৎ লে. মিজানের কোম্পানির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। উদ্বিগ্ন অধিনায়ক কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সহযোদ্ধাদের খোঁজ নিতে হাঁটতে থাকেন সামনের দিকে।
১৪ নভেম্বর সকাল। সকাল ৮টা কি সাড়ে ৮টা। পাকিস্তান বাহিনী গোলাগুলি থামিয়ে দিয়েছে। মুক্তিবাহিনী বিজয়ের আনন্দে ভাসছে। সকলেই ধরে নিয়েছে রণক্ষেত্র কামালপুরের আজ পতন ঘটল। কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতি ভিন্নরূপ ধারণ করল। শত্রুপক্ষের একটি মর্টার সেল এসে সেক্টর অধিনায়ককে আঘাত করল। মেজর আবু তাহের মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সে অবস্থাতেও সহযোদ্ধাদের পজিশন নিতে নির্দেশ দিলেন তিনি। কারণ শত্রুপক্ষ যে কোনো মুহূর্তে আবারও আঘাত হানতে পারে।
রক্তাক্ত মেজর তাহেরকে কোনোভাবে মহেন্দ্রগঞ্জের ভারতীয় সীমানায় নিয়ে এলো বাহার, বেলাল, সুজা ও আরও কয়েকজন। ছুটে এলো সেক্টরের ডাক্তার প্রেমাংকুর রায়। এলেন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কয়েকজন সেনা অফিসার এবং ইন্ডিয়ান মেডিকেল কোরের মেজর মুখার্জি। হেলিকপ্টারে তাহেরকে নিকটস্থ ভারতীয় সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলো। বাঁ পা’টা আটকে ছিল কোনোভাবে চামড়ার সাথে। তা কেটে অধিনায়ককে বাঁচানোর চেষ্টা হলো। সেখান থেকে তাহেরকে সরিয়ে নেওয়া হলো পুনার হাসপাতালে। সেখানে তাকে দেখতে গেলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বীরউত্তম আবু তাহের একটি পা নিয়ে দেশে ফিরলেন। না, কামালপুর দখল করা হলো না সেদিন। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও চূড়ান্ত বিজয় মিলল না।
নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হলো যুদ্ধের আরেক পর্যায়। ২৪ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর। তিন সপ্তাহ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অবরুদ্ধ থাকল কামালপুর। নিশ্চিদ্র অবরোধ ভেদ করে পাকিস্তানি সৈন্যদের কোনোরকম সরবরাহ লাভ করা সম্ভব হলো না। বক্সিগঞ্জ-কামালপুরের সংযোগ সড়কে ‘অ্যাম্বুস’ বসানো হলো। ফলে পাকিস্তানিদের বহু যানবাহন ধ্বংস হলো। ভয়ঙ্কর হতাশায় নিমজ্জিত হলো হানাদার বাহিনী।
৩ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিম অংশে আক্রমণ চালালো পাকিস্তান। সেদিন থেকে শুরু হলো দুই দেশের সরাসরি যুদ্ধ। একই দিন গঠিত হলো বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সামরিক কমান্ড। দায়িত্বে থাকলেন লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরা। দলে দলে ভারতীয় সামরিক যান এসে পৌঁছাল সীমান্ত এলাকায়। ভারতীয় ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার এইচ এস ক্লেয়ার এলেন। বার কয়েক আক্রমণ চলালেন কামালপুরে। কিন্তু ঘাঁটির পতন ঘটানো সম্ভব হলো না। পরে দায়িত্ব নিলেন ১০১ কমিউনিকেশন জোনের অধিনায়ক জেনারেল গূরবক্স সিং গিল। কোনোরকম লোকক্ষয় না করে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী সিদ্ধান্ত নিল কামালপুরের পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করাতে।
৪ ডিসেম্বরের ভোরবেলা। আরেক স্মৃতিময় দিন আমাদের। মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে প্রস্তাব রাখা হলো : কে যাবে আত্মসমর্পণের চিঠি নিয়ে কামালপুর ক্যাম্পে? মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল গিল লিখলেন কামালপুরের পাকিস্তানি কমান্ডারকে : নির্ধারিত সময়ে আত্মসমর্পণ করো, নয়তো আক্রমণ চলবে, বিমান থেকে আঘাত করা হবে, অতএব ‘সারেন্ডার’ ছাড়া বিকল্প নেই তোমাদের।
কিন্তু কে যাবে অবধারিত মৃত্যুবরণ করতে? যে কামালপুরে ৯ মাস ধরে বিরামহীন রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে, সেই কামালপুরে কে যাবে! সকলের উৎকণ্ঠা উপেক্ষা করে তরুণ যোদ্ধা বসির আহমদ রাজি হলো, এবং অবধারিত মৃত্যু উপেক্ষা করে চিঠি হাতে সে যাত্রা শুরু করল কামালপুরের পাকিস্তানি ঘাঁটির দিকে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বসির ফিরে না আসায় আরেকটি চিঠি নিয়ে গেল আরেক দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা আনিসুল ইসলাম সঞ্জু। আমরা সে দৃশ্য তাকিয়ে দেখলাম। মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাগণ বিস্ময়ে এই অকূতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ওরা দুজনই পরে বীরপ্রতীক উপাধি পেয়েছে।
কিন্তু দীর্ঘক্ষণ কেটে গেলেও কেউ ফিরে আসে না। সকলেই ভাবতে থাকলেন পাকিস্তানিরা হয় ওদের হত্যা করেছে, নয় মাইনে উড়ে গেছে ওরা। এরই মধ্যে বিমান থেকে কামালপুরের ওপরে কয়েক দফা আঘাত হানা হলো। পাকিস্তানিরা প্রমাদ গুনলো। বেশ খানিকটা পর ফিরে এলো সঞ্জু। বসির রয়ে গেল ক্যাম্পেই। সঞ্জু এসে জানাল, পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছে।
এরপর ঘটল ৪ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ। ক্যাপ্টেন আহসান হামিদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান বাহিনীর প্রথম আত্মসমর্পণ। সাদা পতাকা উড়িয়ে, হাত উপরে তুলে নিজেদের ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এলো পরাস্থ পাকিস্তানি সৈন্যরা। পরাজয়ের গ্লানি চোখে-মুখে। দীর্ঘ ২১ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর আত্মসমর্পণ করল ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের একজন জেসিও, ৬০ জন বিভিন্ন পদবির সৈন্য, ৪০ জন রেঞ্জার ও রাজাকার। আমরা লক্ষ করলাম, ওরা মুক্তিবাহিনীর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার চেষ্টা করল।
আমাদের চোখে তখন পানি। বিজয়ের আনন্দ এভাবেই চোখের পানিতে সয়লাব করে দেয় সব কষ্ট। হানাদার সৈন্যদের ভীতসন্ত্রস্থ দেখে বুঝলাম, ওরা জীবন নিয়ে আতঙ্কিত। কিন্তু ভারতীয় সৈন্যরা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ওদের নিরাপত্তা বিধান করল। হায়, এরাই সেই হানাদারÑ যারা ৯ মাস ধরে নির্বিচার গণহত্যা, লুণ্ঠন আর নারী নির্যাতন চালিয়েছে! এখন প্রাণভিক্ষা চাইছে! এরই মধ্যে কাঁধে ঝুলানো ক্যামেরাটা বের করে আত্মসমর্পণের চিঠি বহনকারী দুই সাহসী সহযোদ্ধার ছবি তুললাম আমি।
এই কামালপুর রণাঙ্গনে বীরবিক্রম সালাউদ্দিন মমতাজ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান তসলিমসহ প্রায় ২০০ মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। সেক্টর অধিনায়কসহ আহত হন ৪০০-র বেশি মুক্তিযোদ্ধা। ২০০-র বেশি নিহত হয় পাকিস্তানের পক্ষে। ভারতীয় মিত্রবাহিনীরও বেশ কয়েকজন মারা যায়। মেজর আবু তাহের-সহ এই রণাঙ্গনের ২৯ জন বীর যোদ্ধাকে বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, কামালপুর রণক্ষেত্রের পতন মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক বিজয়কে কতটা ত্বরান্বিত করেছিল। খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই হাজার হাজার মানুষ জয় বাংলা স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তুলল। ৬ ডিসেম্বর। শেষবারের মতো ছেড়ে এলাম একাত্তরের প্রিয় মহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্প। মুক্তি ও মিত্রবাহিনী এরপর একযোগে অগ্রসর হতে লাগল জামালপুরের পথে। একই দিন মুক্ত হলো শেরপুর। ক্যাপ্টেন আজিজের নেতৃত্বে অগ্রবর্তী অভিযানে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩টি কোম্পানি। সামান্য প্রতিরোধের পর ১০ ডিসেম্বর মুক্ত হলো জামালপুর এবং ময়মনসিংহ। টাঙ্গাইলে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ছত্রীসেনা নামল। কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী এবং সহ-যৌথবাহিনীর হাজার হাজার সৈন্য এরই মধ্যে পৌঁছে গেল ঢাকার উপকণ্ঠে। ময়মনসিংহের এক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার কারণে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা রেসকোর্সের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দেখার সুযোগ হলো না আমার। পড়ে রইলাম ময়মনসিংহের এক হাসপাতালে। রমনা রেসকোর্সে পাকিস্তানিদের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দেখিনি আমি; কিন্তু কামালপুরের মাটিতে পাকিস্তানিদের প্রথম আত্মসমর্পণ দেখেছি, যা এক বড় প্রাপ্তি জীবনের।
 
লেখক : কামালপুর রণাঙ্গনের অন্যতম যোদ্ধা, ১১ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধ সংবাদদাতা এবং বিশিষ্ট লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK