সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৮
ঢাকা সময়: ০১:৪১

গ্রিন টি যেভাবে আমাদের হৃদপিন্ডের সুরক্ষা করে

গ্রিন টি যেভাবে আমাদের হৃদপিন্ডের সুরক্ষা করে

সালাহউদ্দীন আহমেদ আজাদ

একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেল গ্রীন টি’র একটি উপাদান আপনাকে এথেরোস্ক্লেরোসিস (atherosclerosis) থেকে রক্ষা করতে পারে। এথেরোস্ক্লোরোসিস হচ্ছে একটি রোগ যখন ধমনির ভিতরে প্ল্যাক (plaque) জমা হয়।  ধমনি (artery) হচ্ছে রক্তনালি যার মাধ্যমে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত হৃদপিন্ডে পৌঁছে। প্ল্যাক তৈরি হয় রক্তে জমা হওয়া চর্বি, কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম, এবং অন্যান্য উপাদন দ্বারা। সময়ের সাথে সাথে প্ল্যাক শক্ত হতে থাকে এবং ধমনিকে সরু ক’রে ফেলে। এর ফলে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে পৌঁছুতে পারে না। এথেরোস্ক্লেরোসিসের কারণে হার্ট এটাক, স্ট্রোক এবং মৃত্যু হতে পারে।
 
যেসব কারণে এথেরোস্ক্লেরোসিস হ’তে পারে সেগুলো হ’লঃ শরীরে অতিরিক্ত মেদ, ডায়াবেটিস, এবং উচ্চ রক্তচাপ অথবা রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরোল। এথেরোস্ক্লেরোসিসের কারণ সমূহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই বিজ্ঞানীরা উপায় খুঁজছেন কিভাবে এথেরোস্ক্লেরোসিস বন্ধ করা যায়।
 
গ্রীন টি চা (black tea), গ্রীন টি (green tea), উলং টি (oolong tea) এবং হোয়াইট টি (white tea) – সব চায়ের উৎপত্তি। কিন্তু একটিই আর তা হ’ল ক্যামেলিয়া সাইনেসিস (Camellia sinensis) নামের গাছের পাতা। যে কারণে এগুলো আলাদা হয় তা হচ্ছে এদের প্রক্রিয়াকরণ (Processing)। ব্ল্যাক টি (যা আমাদের দেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয়) সবচেয়ে বেশী সময় প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, তাই এটা বেশী strong আর গ্রীন টি কম সময় প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। গ্রীন টি’র জন্ম চীন দেশে, তবে এখন এটা বাংলাদেশ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশেও প্রক্রিয়াকরণ হয়।
 
গ্রীন টিতে আছে ক্যান্সার রোধ ও ওজন কমানোর মত স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি অসংখ্য গুণাবলি। তাই গ্রীনৎ টি’কে বলা হয় জীবনের মহৌষধ। তবে কিছু কিছু গবেষক গ্রিন টি’র গুণাবলীকে সমর্থন করেন না। এলিসন হর্নবি, ব্রিটিশ ডায়াটেটিক এসোসিয়েশনের কর্মকর্তা গ্রীন টি’র উপকারিতার ব্যপারে ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেনঃ “বেশীরভাগ রোগের ক্ষেত্রেই এই প্রমাণগুলো (গ্রিন টি’র স্বাস্থ্য উপকারিতা) পর্যাপ্ত নয়।“
 
গ্রীন টি’র উপর গবেষণা
একটি সাম্প্রতিক গবেষ্যণায় দেখা যায় গ্রীন টি কিছু কিছু মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।
কিন্তু, যেহেতু গ্রীন টি’তে আছে অসংখ্য উপাদান তাই বিজ্ঞানীরা এগুলোতে কি কি বায়োএক্টিভ কম্পাউন্ড আছে তা যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন।
 
এমন একটি মিশ্রনের (compound) খোঁজ তাঁরা পেয়েছেন যার নাম এপিগ্যালোকাটেকিন ৩ গ্যালেইট (epigallocatechin-3-gallate EGCG)। এটা আছে গ্রীন, ব্ল্যাক এবং হোয়াইট টি’তে, কিন্তু এটা বেশী পরিমাণে পাওয়া যায় গ্রীণ টি’র শুষ্ক পাতায়।
 
বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে এই উপাদানটি এপোলিপোপ্রোটিন এ-১ apolipoprotein A-1 (apoA-1) নামে এক প্রোটিনের সাথে লেগে থাকে এবং এর কার্যকারিতায় দেখা যায় এটা অনেকটা আলযহাইমার্স রোগীদের মগজে পাওয়া বেটা এমিলয়েড প্ল্যাক এর মত। এর কারণে EGCG কে আলযহাইমার্স রোগ সারানোর গবেষনায় কাজে লাগানো হয়।
 
খুব সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কেস্টার ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অফ লীডস এর বিজ্ঞানীরা দেখতে চেষ্টা করেন কি EGCG এথেরোস্ক্লেরোসিস রোধে ব্যবহার করা যায় কিনা। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে EGCG apoA-1-কে ভেঙ্গে ফেলতে পারে। এটা মনে রাখতে হবে যে রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণে EGCG রাখতে প্রচুর পরিমাণে গ্রীন টি পান করতে হবে যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।
 
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের এসোসিয়েট মেডিকেল ডাইরেক্টর প্রফেসর জেরেমি পিয়ারসন বলেন, “আমাদের শরীর খুব ভালভাবে EGCG ভাংতে পারে, তাই এক কাপ গ্রীন টি খুব একটা পার্থক্য আনবে না। কিন্তু উপাদানটি ইঞ্জিনিয়ার করে আমরা হার্ট এটাক ও স্ট্রোকের কোন ঔষধ প্রস্তুত করতে পারি।“ যদিও গবেষণা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে তবুও বিজ্ঞানীরা EGCG এর ভবিষ্যতের ব্যপারে আশাবাদী। এই গবেষণাটি জার্নাল অফ বায়োলজিক্যাল কেমিস্ট্রিতে প্রকাশিত হয়।
 
লেখক: খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক গবেষক

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK