রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
ঢাকা সময়: ০২:০৫

সাত কেজির মহাশোল প্রতি কেজির দাম তিন হাজার

সাত কেজির মহাশোল  প্রতি কেজির দাম তিন হাজার

উত্তরণবার্তা প্রতিবেদক : ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই দুর্গাপুর পৌর শহরের বাজারে স্বাভাবিক দিনের মতোই শুরু হয়েছে মাছের কেনাবেচা। দূরদূরান্ত থেকে পাইকাররা প্লাস্টিক ড্রাম, বাঁশের খাঁচা সহ বিভিন্ন মাধ্যমে মাছ নিয়ে আসছেন বাজারে। নদী, বিল, হাওরের ছোট-বড় মাছে জমে উঠেছে বাজার। সকলের পাইকারি মাছ বিক্রির পালা শেষ করে বাজারে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে সাধারণ ক্রেতাদের আনাগোনা। এর মাঝেই মোটরসাইকেলে করে দুজন ব্যক্তি প্লাস্টিক বস্তায় বড় একটি মাছ নিয়ে আসেন বাজারে। বড় মাছ দেখে বাজারের পাইকাররাও এগিয়ে এসেছেন এই মোটরসাইকেলের কাছে। কি মাছ, ওজন কতো, দাম কতো নানা প্রশ্নের জালে বন্দি মাছ নিয়ে আসা বিক্রেতারা। সকলের প্রশ্নের ভিড়ে বস্তা থেকে বের করে বড় মাছটি রাখলেন বাজারের মাঝ বরাবর।

লম্বাটে দেহ বড় বড় গোলাকার আঁশে ঢাকা, সোনালী রং, তাতে উজ্জ্বল রূপালী ফোঁটা। সবার কাছেই বেশ পরিচিত। এটি নেত্রকোণার দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর ঐতিহ্যবাহী মহাশোল! সকালে দুর্গাপুর পৌর শহরের মেছুয়া বাজারে মাছটি আসার খবরে অনেকেই মাছটি দেখতে ভিড় জমান বাজারে। ভিড় জমান সাধারণ ক্রেতারাও তবে মাছটির দামের কাছে লাগান পাইনি কেউ। গত কয়েক বছরে বাজারে এইরকম বড় আকারের মহাশোল মাছ তেমন একটা দেখা যায়নি বলেও জানান ক্রেতারা।

জানা যায়, মাছটির ধরা পড়েছে পার্শ্ববর্তী উপজেলা কমলাকান্দা পাহাড়ি একটি নদীর থেকে। গতকাল রাতে মাছটিকে ধরার পর স্থানীয় কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী জেলেদের কাছ থেকে তা কিনে নেন অধিক দামের আশায়। বাজারে আনার পর অনেক দরদাম শেষে সাত কেজি ওজনের মহাশোলটি কিনে নেন স্থানীয় আরেক মাছ ব্যবসায়ী আনিসুল হক। পরে আবার খুচরা বিক্রির জন্য তিনি প্রতি কেজির দাম হাঁকেন তিন হাজার টাকা।

স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ি ঝর্ণাধারার বড় বড় পাথরের নিচে এই মাছগুলোর আবাসস্থল। পানির স্রোতে মাছগুলো নদীতে ভেসে আসে। তাই একসময় সোমেশ্বরী নদীতে বড় বড় আকৃতির মহাশোল ধরা পড়তো। কিন্তু এখন কালের বিবর্তনে এই মাছগুলো চোখে দেখা যায় না। এগুলো এখন বিলুপ্ত প্রায়। মাঝে মধ্যে দু'একটা চোখে পরলোও তাও থাকে একেবারে ছোট। এই মাছগুলো সোমেশ্বরী নদী তথা দুর্গাপুরে ঐতিহ্যবাহী একটি মাছ। হঠাৎ করে মাছগুলো বিলুপ্ত হওয়ায় পিছনের অন্যতম কারণ হচ্ছে সরকারিভাবে মাছগুলো সংরক্ষণে নদীগুলোতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


এছাড়াও সোমেশ্বরী নদীতে বিগত ১১ বছর ধরে যত্রতত্র বাংলা ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে প্রভাব পড়েছে মাছের অভয়াশ্রমে। অবৈধ এইসব ড্রেজার মেশিনের বিকট শব্দ ও পোড়া তেল মবিল পানিতে মিশিয়ে একদিকে যেমন নষ্ট করছে জলজ পরিবেশ তেমনি বাতাসে মিলেও নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। বিগত কয়েক বছরে এই নদী থেকে মহাশোল ছাড়াও লাচু, পাবদা, নানী, মলা, ভেলা সহ বিভিন্ন প্রজাপতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মাছ ব্যবসায়ী আনিসুল রহমান জানান, "বাজারে অনেক মহাশোল মাছ আইতে দেখতাম। কিন্তু এখন আর একটাও দেখি না। মাঝেমধ্যে দুই-একটা আয়ে তাও আবার ছোট ছোট চাষের মাছ। বড় প্রাকৃতির মাছ তেমন একটা আর দেখা যায় না। আজকে বাজার একটা মাছ মোটামুটি বড় আকৃতির মহাশোল মাছ আসছে পার্শ্ববর্তী উপজেলা কমলাকান্দা থেকে। মাছটা আসার খবর শুনে আমি বাজারে আইসা দামাদামি করে মাছটা কিনছি। এখন মাছটা আমার কাছে আছে। আমি খুচরা বিক্রির জন্য এর দাম চাইছি তিন হাজার টাকা কেজি দরে। আশা করি ভালো ক্রেতা পাইলে এই মাছটি বিক্রি করে মোটামুটি লাভবান হওয়া যাবে।"  

মৎস্য কর্মকর্তা সুমন কুণ্ড জানান, সোমেশ্বরী নদীর মহাশোল মাছের উপর ইতিমধ্যে আমাদের মৎস্য ইনস্টিটিউটে গবেষণা চলমান রয়েছে। আমরা স্থানীয়ভাবে বেশ কিছু মাছ সংগ্রহ করে মৎস্য ইনস্টিটিউটে প্রেরণ করেছি। এই মাছগুলোর রেনু থেকেই পোনা উৎপাদনে আমাদের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। আশা করি এই গবেষণা সফল হলে অন্যান্য মাছের পোনার মতোই ঐতিহ্যবাহী মহাশোল মাছ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এছাড়াও প্রাকৃতিক ভাবে যে সব মাছ পাওয়া যাচ্ছে তা খুবই কম সংখ্যক।
উত্তরণবার্তা/এআর

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK