রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
ঢাকা সময়: ০২:৫৫

উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে গ্রাম

উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে গ্রাম

মোহাম্মদ হানিফ হোসেন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সময়ই গ্রাম এবং গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা বলতেন। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর চিন্তাও পিতার মতো। তাঁর চিন্তা, কিভাবে গ্রামের জন্য শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। তাঁর ভাবনা- উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা হিসেবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা হবে দেশের গ্রামগুলো। পর্যায়ক্রমে তা বাড়িয়ে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বাংলাদেশের সকল গ্রামকেই এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই চিন্তা আজ বাস্তবের পথে। তাঁর নেতৃত্বে উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে গ্রামের অবয়ব।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮-এ গুরুত্বপূর্ণ একটা অঙ্গীকার ছিল- ‘আমার গ্রাম আমার শহর’।  লক্ষ্য দেশের প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগরসুবিধার সম্প্রসারণ। অঙ্গীকারের সবচেয়ে ইতিবাচক হলো, উন্নয়ন চিন্তার মধ্যে গ্রামকে স্থান দেওয়া। নাগরিক আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা এবং নাগরিক অধিকার গ্রামেও নিশ্চিত করা। গ্রামের স্বকীয়তা বজায় রেখে শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রামেই যাতে পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করা। নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-ডোবা অক্ষত রাখা; তেমনি গাছপালা, বন-বাদাড়, তরুণ, লতাগুল্ম, দিগন্তবিস্মৃত মাঠ, খেতখামার, বনবীথি-সব রেখেই পরিবেশবান্ধব আধুনিক বাংলাদেশ গড়া। প্রতিশ্রুতি ছিল দলটি সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে। শহরের সম্ভাব্য সব ধরনের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেয়া হবে। প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। পাকা সড়কের মাধ্যমে সকল গ্রামকে জেলা-উপজেলা শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।

ছেলেমেয়েদের উন্নত পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। সুপেয় পানি এবং উন্নতমানের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সুস্থ বিনোদন এবং খেলাধুলার জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। কর্মসংস্থানের জন্য জেলা-উপজেলায় কলকারখানা গড়ে তোলা হবে। ইন্টারনেট, তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা হবে। বলতে দ্বিধা নেই যে, প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কিছু সুবিধা ছাড়া বাংলাদেশে গ্রাম আর শহরের ব্যবধান অনেকটাই ঘুচে গেছে। এটি হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, জনসংখ্যার বৃদ্ধির গতি-প্রকৃতিতে শ্রমদানে সক্ষমদের সংখ্যা বাড়লে এবং একই সঙ্গে পুঁজির পরিমাণে স্থিতি থাকলে উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এখন উৎপাদনমুখী। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় নারীরাও অনেক ক্ষেত্রেই আশাতীত এগিয়েছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি এখন নারী। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এবং ভূমিকা এখন গর্ব করার মতো। সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় শিক্ষা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষমতা এবং নীতি-নির্ধারণে নারীরা ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এটা দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারে অংশ এবং বঙ্গবন্ধুর কণ্যা শেখ হাসিনার দেশপ্রেমের চিত্র। এসবই বাংলাদেশের এগিয়ে চলার মূলশক্তি এবং প্রেরণা।
 
বাংলাদেশে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার কাঠামোগুলো আজ গ্রামপর্যায়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। গ্রাম পরিষদও সাধারণের নাগালের মধ্যে,তাই সাধারণ মানুষের অধিকার নিশ্চিতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গ্রামের কৃষক, খেতমজুর, ভূমিহীনসহ দরিদ্র মানুষের উপকার হচ্ছে। সরকারের মূল পরিকল্পনা, আগামী ২০৪১ সালে হবে উন্নত বাংলাদেশ। সেভাবেই সকল ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ক্রমান্বয়ে শহর ও গ্রামের ব্যবধান ঘোচানো। নাগরিকদের প্রাপ্য সকল প্রকার সুবিধা নিশ্চিত করতে যৌথভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। শহরের নাগরিকদের দেয়া সরকারের সকল প্রকার সেবার সুযোগ দেয়া হবে গ্রামে বসবাসকারীদের। উন্নত বিশ্বের ন্যায় দেশের প্রতিটি গ্রামকেই শহরের আদলে তৈরি করা হবে। প্রতিটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামে বিদ্যুত, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নত স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক রাস্তা ঘাট, মার্কেট, খেলার মাঠ, পার্ক এবং বিনোদন কেন্দ্র তৈরি করা হবে। প্রাপ্য সকল নাগরিক সুবিধা দিয়ে তৈরি করা হবে ‘মডেল গ্রাম’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী উন্নত বাংলাদেশ গঠনে, তাঁর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে এমন আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকেই সরকার এগোচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে দেশের প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়ার জন্য অনেক আগেই ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী সরকারের কয়েকটি মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করেছে। মূলত নাগরিকদের শহরমুখিতা ঠেকাতে এবং শহর ও গ্রামের ব্যবধান ঘোচাতেই এমন উদ্যোগের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নের দিকেই এগোচ্ছে সরকার। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে মূল নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। যার কাজে সহায়তা করবে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতর বা প্রতিষ্ঠান। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে শহরের ওপর চাপ কমবে। কাজের উদ্দেশ্যে গ্রাম থেকে ছুটে আসতে হবে না সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে। গ্রামেই তৈরি করা হবে নানা নাগরিক সুবিধাযুক্ত উন্নত জীবনের জন্য সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। বেকারত্ব দূর করতে শিল্প কারখানা স্থাপনসহ নানা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে গ্রামেই তৈরি করা হবে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান।

কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি অকৃষি খাত, বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রামীণ পরিবহন ও যোগাযোগ এবং গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারের আয় ও কর্মসংস্থানে অকৃষি খাতের অবদান বাড়ছে। সেকারণে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বেশ বৈচিত্র্য এসেছে। দেশের কৃষিজ কাজ যেমন সম্প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি অকৃষিজ খাতও ব্যাপক সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে কৃষি উৎপাদন অনেক বেড়েছে। বাজারে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। এই জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, হচ্ছে। এখন গ্রামেও ব্যাংকে নানা ধরনের ইলেকট্রনিক ব্যাংকিংও শুরু হয়েছে। ইন্টারনেট এখন গ্রামেও সহজলভ্য। মোবাইল ফোন, স্মার্টফোন গ্রামের লোকজনের আছে। অপারেটরগুলো নানা ইন্টারনেট প্যাকেজ দিচ্ছে। গ্রামের নিরক্ষর মহিলা সহজেই ইংরেজি অক্ষর টিপে ডিজিটাল মাধ্যমে কল করতে পারে। এর মাধ্যমে সাক্ষরতারও সম্প্রসারণ ঘটছে। কৃষক কৃষি সম্পর্কে জানতে পারে। সবদিক থেকে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটেছে, ঘটছে। সরকার সার্থকভাবে এসব কাজ করছে বলেই আজকে গ্রামেও পরিবর্তনের হাওয়া বইছে।

আজকে গ্রামে নানাভাবে তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে, কেউ কেউ নিজেরা স্বাবলম্বী হচ্ছে। তরুণরা নিজের গ্রাম, নিজের জেলা ও নিজের দেশ সম্পর্কে সচেতন। এই তরুণদের সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এই চিত্র আরও প্রসারিত হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জানেন গ্রামের মানুষকে অবহেলিত রেখে উন্নত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই তাঁর নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে গ্রামীণ অর্থনীতি অকল্পনীয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা সড়ক টেকসইভাবে নির্মাণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। সে কারণে গ্রাম ও শহরের মধ্যে পার্থক্য কমে আসছে। গ্রামের আর্থিক ও সামগ্রিক অবস্থা আগের তুলনায় অনেক ভাল হচ্ছে।
এদেশের মানুষ উন্নয়নের পথে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ ঐক্যবদ্ধ। তাই সরকারি সেবাগুলো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও নজরদারি বাড়ানো দরকার। তাহলেই জাতির পিতার স্বপ্ন ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রতির বাস্তবায়ন সফল ও সার্থক হবে।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

 

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK