রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
ঢাকা সময়: ০২:২১

স্মৃতির ক্যানভাসে বর্বরোচিত ২১ আগস্ট

স্মৃতির ক্যানভাসে বর্বরোচিত ২১ আগস্ট

আনিস আহামেদ
অশ্রুভেজা আগস্ট মাস বাঙালি জাতিকে বারবার বেদনায় বিহ্বল করে। একই মাসে দুটি বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ এদেশের রাজনৈতিক ক্যানভাসকে কালিমাদীপ্ত করেছে। তার একটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা এবং অন্যটি ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা। দুটি ঘটনাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতিকে চিরতরে ধ্বংস করার নীল নকশা। গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতাদের হত্যা করে দেশকে রাজনৈতিক মেধা শূন্য করার পায়তারা করেছিল তারা; কিন্তু তাদের এ প্রচেষ্টা সফল হতে পারেনি। দেশ আজ বঙ্গবন্ধু-আত্মজা যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চলছে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কাক্সিক্ষত শিখরে।
 
২১ আগস্ট- বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ কলঙ্কময় দিন। দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করার জঘন্য অপচেষ্টার দিন। বাঙালি জাতির জীবনে আরেক মর্মন্তুদ অধ্যায় রচনার দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে আজকের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড ছুড়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে তাকে বাঁচাতে পারলেও মহিলা লীগের তৎকালীন সভাপতি আইভি রহমান, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীসহ ২৪ জন নেতাকর্মী এই ভয়াবহ, নৃশংস, নিষ্ঠুর-নির্মম গ্রেনেড হামলায় মারা যান। আর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হয়। সেদিন বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রাণে বেঁচে গেলেও তার দুই কান ও চোখ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপূরণীয় ক্ষতি হয় তার শ্রবণশক্তির। অলৌকিকভাবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন তিনি। এছাড়া আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দসহ দলের অগণিত নেতাকর্মী গ্রেনেড হামলার স্প্লিন্টার দেহে বহন করে চলছে দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়ে। এর মধ্যে ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, অভিজ্ঞ পার্লামেন্টেরিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ অনেকেই গ্রেনেড হামলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
 
সারাদেশে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের অব্যাহত সন্ত্রাস ও পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২১ আগস্ট বিকালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকাল ৫টায় পৌঁছালে, একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২১ মিনিটের বক্তৃতা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা মঞ্চ থেকে নিচে নেমে আসার মুহূর্তেই শুরু হয় মঞ্চ লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গ্রেনেড হামলা। মাত্র দেড় মিনিটের ব্যবধানে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। গ্রেনেডটি ট্রাকের বাঁ-পাশে পড়ে বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ হাসিনা ট্রাকের ওপর বসে পড়েন। তার সঙ্গে থাকা অন্য নেতারা এ সময় মানবঢাল তৈরি করে তাকে ঘিরে ফেলেন। আরও দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর (অব.) শোয়েব, ব্যক্তিগত স্টাফ নজীব আহমেদসহ দেহরক্ষীরা শেখ হাসিনাকে ধরে ট্রাক থেকে দ্রুত নামিয়ে তার মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে তুলে দেন। শেষ টার্গেট হিসেবে চক্রান্তকারীরা ওই গাড়ি লক্ষ্য করেও গুলি ছুড়েছিলেন।
 
গ্রেনেড হামলায় চারদিকে নারকীয় পরিবেশ। রাস্তায় পড়ে ছিল জমাটবাঁধা রক্ত, মানুষের লাশ, হতাহতদের শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়া নাড়িভুঁড়ি, রক্তাক্ত দলীয় পতাকা-ব্যানার, আর পরিত্যক্ত অসংখ্য জুতা-স্যান্ডেল। আহতদের দলীয় কার্যালয়ের ভেতর থেকে বের করে ভ্যানে উঠানো হচ্ছিল। উদ্ধারকারীরাও আহতদের শরীর থেকে বের হওয়া রক্তে ভিজে একাকার। ঠিক শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না কে আহত আর কে উদ্ধারকর্মী। আহতদের চিৎকার, উদ্ধারকর্মীদের হৈচৈ, বিক্ষোভকারীদের স্লোগানের শব্দে একাকার হয়ে যাচ্ছিল অ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ। ঘটনার পর আহতদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে রাজধানীর হাসপাতালগুলো। নেতাকর্মী আর স্বজনদের ভিড়ে জমেছিল হাসপাতালগুলো। আহতদের আর্তচিৎকার আর স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। গ্রেনেড হামলার পরপরই বিবিসি থেকে ফোন করা হয় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে। সেদিন তিনি নিজের কথা ভুলে প্রথমেই বলেছিলেন, ‘আমার কর্মীরা জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন। গ্রেনেড যখন বিস্ফোরিত হচ্ছিল, তখন নেতাকর্মীরা আমাকে ঘিরে রেখেছিলেন। তাদের অনেকেই আহত হয়েছেন। এখনও আমার কাপড়ে তাদের রক্ত লেগে আছে।’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সরকারের মদতে সারাদেশেই বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে। আমাদের এই মিছিলটাও ছিল বোমা হামলা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। এজন্যই তারা জবাব দিল গ্রেনেড মেরে। আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে-মুহূর্তে আমি সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাড়িতে উঠব, ঠিক তখনই ওই জায়গাটাই হামলাকারীরা টার্গেট করেছিল। আমাদের মহিলাকর্মীসহ অনেকে নিহত হয়েছেন। এতগুলো মানুষ মারা গেছেন। মানুষের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই?’
 
ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলাটির প্রথমে তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে তদন্তের দায়িত্ব পড়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হাতে। অবশ্য এর মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী আরও দুটি মামলা করেছিলেন। পরে এসব মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। মাত্র এক মাস ১০ দিনের মাথায় বিএনপি সরকার ১৬২ পৃষ্ঠার তথাকথিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল। অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছিল ভাড়া করা দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে। সাজানো আসামি বানিয়ে ২০০৫ সালের ৯ জুন এই মামলায় আটক করে নিরীহ জজমিয়াকে। গণমাধ্যমে ফাঁস হয় যে জজমিয়ার বিষয়টি পুলিশের সাজানো। নানা ঘটনাপ্রবাহের পর ২০০৮ সালে তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। এরপর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আখন্দ। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তিনি বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।
 
এ ঘটনায় ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনে (সংশোধনী-২০০২) অন্য একটি মামলায় ৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ষড়যন্ত্র, ঘটনায় সহায়তাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আনীত মামলায় ৫২ জন আসামি করা হয়েছিল। গ্রেনেড হামলার সাথে জড়িত থাকার দায়ে বিএনপি নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদ- দিয়েছেন ঢাকার একটি বিশেষ দ্রুত আদালত। রায়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এছাড়া অন্য মামলায় ফাঁসির কারণে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ (মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ- কার্যকর), মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সী (ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর), শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী দিয়েছেন ২২৫ জন। অন্যদিকে, আসামি পক্ষে সাক্ষী দিয়েছেন ২০ জন।
 
২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পুনরায় তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের এক পর্যায়ে বেরিয়ে এসেছে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ও বিএনপির নেতাদের তত্ত্বাবধানে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জেহাদ-এর মাধ্যমে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। আর বিস্ময়করভাবে প্রমাণিত হয়েছে হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড এসেছিল পাকিস্তান থেকে।
 
বিশেষ ট্রাইব্যুনালে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় আসামির বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ২৮ মার্চ। আদালত ৬১ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন। এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ঘটনার ১৪ বছর এক মাস ২০ দিন পর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
 
বছর ঘুরে আসে আগস্ট মাস। আসে বেদনাসিক্ত পরিবেশ। আসে জাতির পিতাকে সপরিবারে হারানোর সবচেয়ে কালো অধ্যায়- সেই মাসে আরেকটি কালোদিন, ২১ আগস্ট সত্যিই শোকার্ত-বেদনা-বিধুর করে তোলে বাঙালি জাতিকে।
লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ ও সাংবাদিক-সাহিত্যিক

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK