রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮
ঢাকা সময়: ১৭:৩৭

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও জনগণের প্রত্যাশা

আওয়ামী লীগ,  বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও জনগণের প্রত্যাশা

আবুল মোমেন
 
দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এ-বছর ৭৩ বছরে পদার্পণ করল। দলটি এই বাংলার জনগণের রাজনৈতিক অভিযাত্রার মুখ্য নির্মাতা এবং প্রধান সাক্ষী। কালের প্রবাহে অনেক উত্থান-পতন ভাঙা-গড়া পেরিয়ে দলটি এখন ভালো অবস্থানেই রয়েছে। তবে রাজনীতির বিচারে হয়তো এর সাথে আরও দু-কথা যোগ করতে হবে।
সেই আলোচনার আগে আমরা বুঝে নিতে পারি আওয়ামী লীগ কোন কারণে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এতদূর সফলভাবে পাড়ি দিতে সক্ষম হলো যেখানে মুসলিম লীগসহ বহু রাজনৈতিক দল ইতিহাসের গর্ভে প্রায় তলিয়ে গেল। সবাই জানি আওয়ামী লীগের জন্ম মুসলিম লীগের ভিতর থেকেই, সেই দল ও তার রাজনীতিকে অস্বীকার করে তার অগ্রযাত্রা। এর মর্ম বুঝতে আমরা বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র আশ্রয় নিতে পারি- “শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা মুসলিম লীগকে জনগণের লীগে পরিণত করতে চাই, জনগণের প্রতিষ্ঠান করতে চাই। মুসলিম লীগ তখন পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় নাই। জমিদার, জোতদার ও খান বাহাদুরদের প্রতিষ্ঠান ছিল।” (পৃ. ১৭) তারপরে তিনি বলেছেন- “আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নেই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।… একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলবে না।” (পৃ. ১২০)
নবাব-জোতদার প্রমুখের কায়েমি স্বার্থ রক্ষার দল বঙ্গবন্ধু কেন করবেন? ১৯৪৯-এ তরুণ নেতা হয়েও তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতাই তাকে সময়ের দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে। মজলুম জননেতা নামে খ্যাত প্রবীণ রাজনীতিক মওলানা ভাসানীকে সভাপতির আসনে ও দক্ষ সংগঠক এবং জ্যেষ্ঠ নেতা শামসুল হককে সম্পাদক করে গঠিত হলো আওয়ামী মুসলিম লীগÑ অর্থাৎ গড়ে উঠল নতুন এক মুসলিম লীগ যেটি কায়েমি স্বার্থবাদীদের বাদ দিয়ে আম জনগণকে নিয়েই ও তাদের কল্যাণে রাজনীতি করবে। বঙ্গবন্ধু যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে থাকলেও আমরা বুঝতে পারি এ উদ্যোগ ও সাংগঠনিক কাজে তিনিই ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়।
 
২.
ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ক্রমেই বোঝা গেল বাঙালির রাজনীতি ধর্ম বা সম্প্রদায়ভিত্তিক পথে চলবে না, তার গতিপথ তৈরি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক উদার মানবতাবাদী ধারায়, যার একদিকে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের পথ ও অন্যদিকে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রশস্ত সরণি। এবারে বিকল্প প্রতিবাদী নতুন মুসলিম লীগ যেন তার সঠিক যাত্রাপথের সন্ধান পেয়ে গেল, দলের নাম থেকে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে বিশেষণ আওয়ামীকেই নামবাচক বিশেষ্য রূপে গ্রহণ করা হলো। তার পরিচয়ে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ থাকা চলবে না, কারণ আগুয়ান জনগণ ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের পথ ধরেছে ততদিনে। মুসলিম লীগের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা সংগঠন আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে নবরূপে আবির্ভূত হলো। সেই সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ শুরু হলেও তখনও একে ঘিরে রাজনৈতিক অভিলাষ বা স্বপ্ন তৈরি হওয়ার দেরি আছে।
নেহেরুর নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রী-সমাজতন্ত্রী ভারতের বিপরীতে পাকিস্তান যেন পশ্চিমা বিশ্বের জন্যে এক বিকল্প অবলম্বন হিসেবে গণ্য হচ্ছিল। ফলে মার্শাল প্ল্যান, কলম্বো প্ল্যান ইত্যাদির সূত্রে দেশটি মার্কিনী বলয়ে প্রবেশ করতে থাকে, সামরিক জোট সিয়াটো-সেন্টোতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এদিকে তখন ইরানে মোসাদ্দেক সরকারের পতন, মিশরের সুয়েজ দখলকে নিয়ে অন্যায় যুদ্ধসহ এমন বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনাও আমাদের রাজনীতিতে স্থান করে নিচ্ছিল। এ-সময় আওয়ামী লীগ নেতা ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাক-সরকারে যুক্ত হয়েছিলেন। বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর কেবিনেটে আইনমন্ত্রী হিসেবে তার যোগদান শেখ মুজিব পছন্দ করেননি এবং তা সরাসরি নেতাকে জানিয়ে দিতে দ্বিধাও করেননি- “তিনি (সোহরাওয়ার্দী) বললেন, রাগ করছ, বোধহয়।” বললাম, “রাগ করব কেন স্যার, ভাবছি সারাজীবন আপনাকে নেতা মেনে ভুলই করেছি কি না?” (ঐ পৃ. ২৮৬)
দলের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে কথা ওঠে, কারণ মুসলিম লীগবিরোধী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বাম ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী অনেকেই তখন এ দলের মধ্যে রয়েছেন। তাছাড়া বিশ্ব পরিস্থিতিতে অনেকেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে এই ধারার রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আমরা দেখি তরুণ শেখ মুজিব মুসলিম লীগ করেও যেমন ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক তেমনি তখনকার মতো দলের অবস্থান যা-ই হোক, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সমাজতন্ত্রের প্রতি ছিলেন আস্থাশীল। কথাটা তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন আত্মজীবনীতেÑ “আমি নিজে কম্যুনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না।” (ঐ, পৃ. ২৩৪) কিন্তু ১৯৫৭ সালে খোদ সভাপতি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ-সমাজতন্ত্র প্রশ্নে দলে ভাঙন দেখা দিলে শেখ সাহেব তা রোধের চেষ্টা করেছেন, দলকে আগলাতেই চেয়েছেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে আমরা বুঝি রাজনীতির গতিপ্রবাহ কখন কীভাবে প্রবাহিত করতে হবে সেটা তিনি ভালোই বোঝেন। ফলে এই ভাঙন ঘটল এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলো। কিন্তু তাতে আওয়ামী লীগের গতিপথ রুদ্ধ হয়নি।
 
৩.
১৯৬০-এর দশক হলো বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্থানের দশক। তিনি ৩টি মূল বিষয়কে দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রে রাখলেন-বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যা হয়ে উঠেছিল জনতার প্রাণের দাবি, যার প্রকাশ ঘটেছে ছোট্ট ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে; গণতন্ত্র তার দ্বিতীয় মুখ্য বিষয়, যা শিক্ষিত ও গণমানুষ উভয়েরই রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল; তৃতীয় বিষয় হয়ে উঠল সমাজতন্ত্র, যা ছাত্র-তরুণসহ সচেতন মহলের আগ্রহের ও অঙ্গীকারের বিষয় হয়ে উঠেছিল। এর উপজাত সঙ্গী হয়ে এসেছে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা- অবশ্যই ধর্মহীনতা নয়।
রাজনৈতিক আদর্শ বা চেতনার এই যে উত্তরণ, তা ঘটেছে সময়ের ও জনগণের দাবির সাথে সামঞ্জস্য রেখে। একে নেতৃত্বের চিন্তার সৃজনশীলতা বলি কি গতিশীলতা বলি- যে নামেই ডাকি, এর ভিত্তি নেতা মুজিবের রাজনৈতিক চিন্তাজগতের মধ্যেই ছিল, যা তার আত্মজীবনীতে পেয়ে যাই। গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যেমন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বইয়ে তেমনি নিজের অসাম্প্রদায়িক বিশ্বাসও স্পষ্ট করেছেন- একজন হিন্দু রাজবন্দিকে আশ্বস্ত করে তরুণ মুজিব বলেছেন- “চিন্তা করবেন না, আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই, সকলেই মানুষ।” (ঐ, পৃ. ১৯১)
শেখ মুজিব গোড়া থেকে যথার্থ নেতৃত্ব দিয়ে সময়ানুবর্তী আদর্শিক ধারায় আওয়ামী লীগকে গঠন-পুনর্গঠন-নবায়ন করেছেন। এর ফলে দলের জন্যে টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়েছে। এতে মুসলিম লীগ বা অন্য অনেক দলের মতো সংগঠনে স্থবিরতা আসেনি, নতুন চিন্তা বা পরিস্থিতির ধাক্কায় নেতৃত্ব বিমূঢ় হয়নি, দল সাংগঠনিক সংকটে পড়েনি।
 
৪.
তবে স্বাধীনতার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হয়নি। নিজেদের একটি স্বাধীন দেশ প্রাপ্তি, রণাঙ্গনে সত্যিকারের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, দেশের ভিতরে ও শরণার্থী শিবিরের মানবিক বিপর্যয় ইত্যাদি অভূতপূর্ব ঘটনার সবই ঘটেছে প্রায়-অপ্রস্তুত জনগণের চোখের সামনে, প্রায়ই নিজেদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে- এমন প্রত্যক্ষ রক্তভেজা, বারুদমাখা অগ্নিগর্ভ অভিজ্ঞতা কোনো মননের জন্যই সহজপাচ্য বিষয় নয়। হয়তো তাই স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, প্রত্যাশার উড়াল ছিল সীমাছাড়া, দাবির চাপ ছিল প্রবল। এর অভিঘাত নিজ দলের তরুণদের মধ্যেও পড়েছিলÑ অস্থিরতা, বেপরোয়াভাব, কিছু একটা করার উদ্দীপনা যেন কেবল নিয়ম ভাঙতে চাইছিল। তখনই তরুণদের প্রবল আকাক্সক্ষাকে একটি রাজনৈতিক জোয়ারের রূপ দিয়ে দৃশ্যপটে নিয়ে এলো জাসদ নামের রাজনৈতিক সংগঠন। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের তরুণদের একটি অংশ এতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছে। সেটি ১৯৭৩ সাল। পরবর্তী কয়েক বছর এ দলে বিপ্লবের মোহগ্রস্ত স্বাপ্নিক তরুণদের প্রবেশ ছিল ব্যাপক হারে। সব মিলে আওয়ামী লীগে নিশ্চয় ঝাঁকুনি লেগেছিল তখন, রাজনীতিও পড়েছিল চ্যালেঞ্জে। আমরা লক্ষ করব, বঙ্গবন্ধু প্রশাসনিক পথে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেও রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার দিকেও মনোযোগ দিয়েছিলেন বিশেষভাবে। এরই ধারাবাহিকতায় সবাইকে নিয়ে বাকশাল গঠনের উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন।
এরপরেই ঘটল এদেশের ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনাটি- সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-। এটি দীর্ঘ জটিল ষড়যন্ত্রের ফল, যাতে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা ছাড়াও সিআইএ, আইএসআই-সহ আরও অনেকের যুক্ত থাকার আলামত পাওয়া যায়। এই ঘটনাপ্রবাহের জের ধরে দেশে উত্থান ঘটল সামরিক স্বৈরশাসকদের, যারা তাদের রাজনৈতিক অভিলাষের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে স্বভাবতই আওয়ামী লীগকেই গণ্য করেছে, আওয়ামী লীগের সহযোগী বাম প্রগতিশীল দলগুলোকেও রেখেছিল বিপক্ষ শিবিরে। প্রায় দীর্ঘ দুই দশক জবরদস্তি শাসন চলেছে। এই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, নানামুখী টানাপোড়েন ঘটেছে, আবার ভাঙন ও দল ছাড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া অনেক জনপ্রিয় নেতাই সামরিক জান্তার জেল-জুলুমের শিকার হওয়ায় নেতৃত্বের সংকট গভীর হয়েছিল তখন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতির শূন্যতা বিশাল হওয়ারই কথা এবং মাত্রই স্বাধীন দেশে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে পরম নির্ভর সর্বক্ষণের পথপ্রদর্শক নেতার মৃত্যু ছিল অভাবনীয়, এর জন্য কোনো প্রস্তুতি ছিল না কারও, থাকার কথাও নয়। দুই নারীনেত্রী জোহরা তাজউদ্দীন এবং বেগম সাজেদা চৌধুরী এই দুঃসময়ে মূলধারাটি আগলে রাখার, এগিয়ে নেওয়ার কাজে যে আন্তরিকতা নিয়ে মাঠে সক্রিয় থেকেছেন তার কথা বলতেই হবে। আর ১৯৮১ সালে তৃতীয় নারী শেখ হাসিনা এলেন দলের ঐক্যের প্রতীক হয়ে, দীর্ঘদিনের জন্য হাল ধরার দায় মাথায় নিয়ে। শেখ হাসিনা কীভাবে আকস্মিক ঝড়ে মর্মান্তিকভাবে ছিন্নভিন্ন হওয়া সত্তাকে গুছিয়ে ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রনেতার পর্যায়ে পৌঁছলেন সেই ইতিকথা আজকের বিষয় নয়, আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর সংগঠন আওয়ামী লীগের কথা বলছি।
 
৫.
দীর্ঘ দুই দশকের দুঃসময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রবল নির্যাতনের বিরুদ্ধে টিকে থাকার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রমাণ দিল তার সাংগঠনিক শক্তি সহজে ক্ষয় হওয়ার নয়, মাথা নোওয়াবারও নয়। এর মূলে ছিল নিবেদিতপ্রাণ অকুতোভয় লড়াকু কর্মীবাহিনীÑ তাদের প্রাণপণ সংগ্রামে বোঝা গেছে সংগঠনের গভীরতা ছিল এতটাই যে নানামুখী আক্রমণ, এমনকি অন্তর্দলীয় কোন্দল ও পরিস্থিতির চাপে নানা অবক্ষয় সত্ত্বেও এ দলকে শেষ করা দূরের কথা দমানোও সম্ভব নয়। আদর্শহীনতার যুগে কোথাও যেন আদর্শের সূত্রেও কর্মীরা বাঁধা ছিল, যার রক্তকণিকা ছিল বঙ্গবন্ধুর ঐতিহ্য, তার সে ঐতিহ্যের প্রতি দায়বোধ। এ যেন সেই সেøাগানে ব্যক্ত প্রত্যয়ের বাস্তব রূপÑ এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে। নেতাদের অনেকেরই ভয়-প্রলোভনের ফাঁদে পা পিছলে গেলেও কর্মীবাহিনী ছিল অটল, তারাই ছিল সংগ্রাম ও সংগঠনের প্রাণ, রক্তবীজ।
এভাবে লড়াই করে টিকে থেকে স্বৈরাচারকে হটিয়ে ১৯৯১-এর নির্বাচনে কিন্তু ছন্দপতনের মতো পরাজিত হলো আওয়ামী লীগ। পরাজয় নিয়ে নানা ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব আছে, আমরা তাতে না গিয়ে সময়ের ভিন্ন বাস্তবতাকে আওয়ামী লীগ কীভাবে রাজনীতিতে গ্রহণ করল তা-ই দেখি। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার কাজে নির্ভর করেছিল আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ওপর, তাদের দল কখনও জামাত কখনও পুরনো মুসলিম লীগ। অনেক ভাষ্যকারের বিচারে তাই জিয়ার দল আদতে ভিন্ন নামে বিলুপ্ত মুসলিম লীগ, তার দেশ-চেতনাও পাকিস্তানের আদলেই গড়ে উঠেছে। ফলে রাজনীতিতে ধর্ম অর্থাৎ ইসলামি পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও রক্ষণশীলতার ঘোলা হাওয়ার ঘূর্ণি তৈরি করা হলো। এটাও লক্ষ করা গেল, পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছে তা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথে যতটা রাষ্ট্রবিপ্লব সংঘটনে এগিয়েছে ততটা সমাজ সংস্কার বা সমাজমানস পরিবর্তনের কাজ করেনি। ফলে দীর্ঘ দুই দশকের ধর্মান্ধ জাতীয়তাবাদের রাজনীতির আড়ালে সমাজে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা চাপা পড়েছে, মুক্তবুদ্ধির চর্চা হয়েছে ব্যাহত। যেন সুচতুর দুরভিসন্ধি নিয়ে সমাজকে ধর্মীয় জাতীয়তার পথে ঠেলে পশ্চাৎমুখী করা হলো। এ সময়ে আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রতিকূলতা তৈরি হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটেছে, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের রমরমা শুরু হয়েছে এবং আফগান সংকট ও ইরাক-সিরিয়া-লিবিয়া সংকট নিয়ে ক্রমেই মুসলিম জাতীয়তার রাজনীতিতে জঙ্গিবাদের উপাদান প্রবেশ করেছে। তবে এটি আমাদের সমাজে শক্তিশালী অবস্থান না পেলেও বা সমাজ থেকে প্রতিরোধের সম্মুখীন হলেও ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতি ও রাজনীতিচর্চার এক বাস্তবতা তৈরি হয়ে গেল, এটি পঞ্চাশ-ষাটের দশক অর্থাৎ আওয়ামী লীগের বিকাশ-পর্বের বাস্তবতার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন এক পরিবেশ।
বাম প্রগতির অবক্ষয়ের পটভূমিতে চলমান এই বাস্তবতাকে প্রতিরোধের কোনো শক্তি সমাজে আর সক্রিয় আছে বলে মনে হয় না। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। অন্তত ষাট-সত্তর দশকের আদর্শের প্রতি নিবেদিত নেতা-কর্মীদের জন্য এটি নতুন বাস্তবতা, আওয়ামী লীগের সনাতন সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্যও এর অনেকটাই নতুন প্রবণতা যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও বক্তব্য রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে, ভাষা-সংস্কৃতির ব্যবহার ও চর্চায় সেভাবে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
ধর্ম গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম উপাদান হিসেবে হয়তো টিকে থাকবে, পশ্চিমের কোনো কোনো উদার গণতান্ত্রিক দেশেও এমনটা দেখা যায়। মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন শপথগ্রহণের আগে গীর্জায় গিয়ে প্রার্থনা করেছেন এবং শপথ নিয়েছেন পূর্বপুরুষের বাইবেলে হাত রেখে। সমস্যা হলো ধর্মান্ধতা নিয়ে, যা প্রায়ই সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়, অন্য ধর্মের প্রতি বৈরী অবস্থান নিয়ে সমাজে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার জন্ম দেয়। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা প্রথম থেকেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার কঠোরতা বজায় রেখেছেন, বারবার তার ও সরকারের অসাম্প্রদায়িক অবস্থানের কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আমরা লক্ষ করছি, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অপশক্তির রূপ ধারণ করলেই যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতেও দেরি হচ্ছে না। হয়তো ভাবা হচ্ছে এভাবে প্রশাসনকে গতিশীল রেখে রাজনীতিকে সময়ের সাথে এবং কখনও সময়ের চেয়ে এগিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব সফল হবে। হয়তো এর শুভ প্রভাব পড়বে রাজনীতিতে, রাজনৈতিক আবহে।
তবুও বলব পরিস্থিতি খুবই জটিল, শুভনুধ্যায়ীরা কিছুটা হতাশা ও অনেকটা শঙ্কা নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি লক্ষ করছেন। এটুকু বোঝা যায় কাজ অনেক বাকি, আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষা এবং একবিংশ শতাব্দীর উপযুক্ত মানবসম্পদ তৈরির জন্য সমাজে সংস্কারমূলক কাজের বিকল্প নেই। রাজনীতিকে সেই দায় নিতে হবে। কথা হলো, আওয়ামী লীগ ছাড়া সে দায়িত্ব আর কে নেবে? আমরা জানি সমাজের পুরনো অচলায়তন, সংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের জগদ্দল ভাঙার কাজে নাগরিক সমাজ থেকে চিন্তাবিদ ও সৃষ্টিশীল মানুষদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। বর্তমান সমাজে সেই জায়গায় দুর্বলতা, সংকট ও শূন্যতা বেশ গভীর। এ অবস্থায় আলোকিত রাজনীতিই পারে সামাজিক পরিসরে অগ্রবর্তী ভূমিকা নিয়ে পরিবর্তনের জোয়ার আনতে, যেমনটা ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঘটেছিল। প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ এবারেও সময়ের দাবি পূরণে সক্ষম হবে তো! মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন।
 
লেখক : বুদ্ধিজীবী

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK