বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ২ আষাঢ় ১৪২৮
ঢাকা সময়: ১৫:৫২

বিশ্ব শান্তির প্রতীক ‘জুলিও কুরি শেখ মুজিব ’

তোফায়েল আহমেদ
আজ সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৩ সালের এদিন ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় শান্তি সম্মেলনে বিশ্ব শান্তি পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা শ্রী রমেশ চন্দ্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'জুলিও কুরি শান্তি পদকে' ভূষিত করেন। মর্যাদাপূর্ণ এই সম্মান প্রাপ্তির পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'এ সম্মান কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য নয়, এ সম্মান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী শহীদদের, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানীদের। 'জুলিও কুরি' শান্তি পদক সমগ্র বাঙালি জাতির।'
 
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের মুক্তিকামী, নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। শান্তি, সৌভ্রাতৃত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন নিয়মতান্ত্রিক পথে সংগ্রাম করেছেন। জেল, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেছেন। তার অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা, রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, মানবিক মূল্যবোধ, সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব বাঙালি জাতিকে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করে। তার নির্দেশে নিরস্ত্র বাঙালি জাতি সশস্ত্র হয় এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
 
১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সভপতিমণ্ডলীর সভায় বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম এবং বিশ্ব শান্তির সপক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদানের জন্য শান্তি পরিষদের মহাসচিব শ্রী রমেশ চন্দ্র প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে 'জুলিও কুরি শান্তি পদক' প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
 
এই ঘোষণার পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বত্র আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। এরপর ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ গণপরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জ্ঞাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেছিলাম, "মাননীয় স্পিকার সাহেব, আজকের কার্যসূচির ১০ নম্বর বিষয় অনুযায়ী- আমাদের প্রিয়নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সোনার বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তি পেয়েছে, যার নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলার মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে বীরবিক্রমে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে সোনার বাংলা মুক্ত হয়েছে, সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশ্ব শান্তি পরিষদ 'বিশ্ব শান্তির জুলিও কুরি পুরস্কার' প্রদান করেছে। আজকের এই স্বাধীন বাংলার গণপরিষদে আমরা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সেজন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সোনার বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তি হয়েছে। আজকের বিবদমান বিশ্বের বিবেকগুলি- আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার মানুষকে যে নেতৃত্বের পথ দেখিয়েছেন, সারা বিশ্বের প্রতিটি নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষ বঙ্গবন্ধুর সেই নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা অভিনন্দন জ্ঞাপন করছি এই পুরস্কারের জন্য। সারা বিশ্বের নিপীড়িত, নির্যাতিতদের পক্ষ থেকে যারা এই সম্মানে ভূষিত করেছেন, তাদেরকে এই পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা অভিনন্দন জ্ঞাপন করছি।"
 
সেদিন 'বিশ্ব শান্তির জুলিও কুরি পুরস্কার' প্রাপ্তিতে বঙ্গবন্ধুকে প্রদত্ত আমার প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয় এবং পরিষদের স্পিকার বলেন, "জনাব তোফায়েল আহমেদ সাহেব দিনের কার্যসূচি শেষে 'জুলিও কুরি পুরস্কার' উপলক্ষে পরিষদের নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আমরাও এই পরিষদ থেকে উক্ত পুরস্কার দেওয়ার জন্য বিশ্ব শান্তি পরিষদকে অভিনন্দন জানিয়ে একটা প্রস্তাব পাস করতে চাই। এই প্রস্তাব গৃহীত হলো।"
 
বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্যে পরিণত করেছেন। যেখানেই মানবতার অবক্ষয় দেখেছেন, সেখানেই তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, বিশ্ব বিবেককে জাগানোর চেষ্টা করেছেন এবং বিশ্বসভায় তার প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে সংবিধানে গ্রহণ করেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংঘাতময় পরিস্থিতি উত্তরণে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কর্তৃক শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের গৌরব ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশ বিশ্ব সভায় ন্যায়নীতি অনুসৃত দেশ হিসেবে মর্যাদার আসন লাভ করে। সকলের প্রতি বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বৈদেশিক নীতি ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।' আঞ্চলিক ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, 'আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে শান্তি, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ এলাকায় পরিণত করার প্রতি সমর্থন জানাই।' 'আমরা বিশ্বাস করি যে, সমবেত উন্নয়নশীল দেশসমূহ শান্তির স্বার্থকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগুরু জনগণের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তারা প্রকাশ করেছেন।' 'মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি অত্যন্ত জরুরি এবং তা সমগ্র বিশ্বের নরনারীর গভীর আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটাবে। এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত শান্তিই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।' 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিবেশী সকল দেশের সাথে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের অঞ্চলে এবং বিশ্ব শান্তির অন্বেষার সকল উদ্যোগের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।'
 
বিশ্ব শান্তি পরিষদ ১৯৫০ সাল থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে, মানবতার কল্যাণে শান্তির সপক্ষে বিশেষ অবদানের জন্য বরণীয় ব্যক্তি ও সংগঠনকে জুলিও কুরি শান্তি পদকে ভূষিত করে আসছে। বঙ্গবন্ধুর আগে যারা জুলিও কুরি শান্তি পদক লাভ করেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন, কিউবা বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো, ভিয়েতনাম বিপ্লবের নেতা হো চি মিন, স্বাধীন প্যালেস্টাইন আন্দোলনের নেতা ইয়াসির আরাফাত, চিলির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা সালভেদর আলেন্দে, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা প্রমুখ।
 
নিপীড়িত একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকপন্থায় আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন বঙ্গবন্ধু। যেদিন নিরস্ত্র বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছে, সশস্ত্র শক্তি দ্বারা নির্বিচারে আক্রান্ত হয়েছে, ঠিক সেদিনই বঙ্গবন্ধু প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেছেন, 'এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারী মোকাবিলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।'
 
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিরাজিত সকল সমস্যার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিই ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আরাধ্য এবং এখানেই তার রাজনৈতিক চেতনার মাহাত্ম্য। সেজন্য সারাজীবন শান্তিপূর্ণ সংগ্রামের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব শান্তি পরিষদ কর্তৃক মর্যাদাপূর্ণ 'জুলিও কুরি শান্তি পদক' প্রদান করা হয় তাকে। বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেছি। স্বচক্ষে দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর মতো বরেণ্য নেতাকে বিশ্বনেতৃবৃন্দ দেখতেন বিশ্ব শান্তির প্রতীক হিসেবে। 'জুলিও কুরি শান্তি পদক' প্রদানের ৪৮তম বার্ষিকীতে বিশ্ব শান্তির প্রতীক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।
 
লেখক : সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ
Email: tofailahmed69@gmail.com
 

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK