বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ২৩ বৈশাখ ১৪২৮
ঢাকা সময়: ১৩:০৯

নবাবি মাছ শিকার

উত্তরণ বার্তা প্রতিবেদক : 'মৎস্য মারিব, খাইব সুখে'-মধ্যযুগের এই শ্নোক এখনও বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। যদিও ব্যস্ততম ইট-পাথরের এই ঢাকা মহানগরে এমন কোনো খাল-বিলও নেই, যেখানে মনের সুখে মাছ শিকার করা যাবে। অবশ্য দু'একটি বড় পুকুর এখনও আছে। সেই দু-একটি বড় পুকুরই এখন অন্ধের নড়ি এই শহরের মাছ শিকারিদের। একটু অবসর মিললেই তারা চলে যান পুরান ঢাকার ইসলামপুরের নবাববাড়ি পুকুরে। মাছ ধরেন বড়শি ফেলে। নবাববাড়ির পুকুরে গিয়ে দেখা গেল, তার চার পাশজুড়ে বাঁশ ও কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বানানো আছে ৭১টি মাচা। একেকটি মাচার টিকিটের দাম ছয় থেকে ১০ হাজার টাকা। এক টিকিটে মাছ ধরা যায় দুই দিন। দেশের বিভিন্ন জাতীয় উৎসব ছাড়াও প্রতি মাসের যে কোনো দুই শুক্রবারে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন করা হয় এখানে।

কিন্তু চলতি বছর মহামারি করোনার কারণে এ পর্যন্ত মাছ শিকারের আয়োজন করা হয়েছে মাত্র দু'বার। সর্বশেষ মাছ ধরার আয়োজন করা হয়েছিল গত ২৫ ও ২৬ মার্চ। লকডাউনের জন্য এবার পহেলা বৈশাখে মাছ শিকারের আয়োজন করা যায়নি বলে জানালেন কর্তৃপক্ষ। নবাববাড়ির পুকুরে রয়েছে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, কালবাউশ, চিতলসহ হরেক রকমের দুই কেজি থেকে ১৪ কেজি ওজনের মাছ। সবচেয়ে বেশি ওজনের মাছ যিনি ধরেন, প্রথম পুরস্কার এসে যায় তার হাতের মুঠোয়। অবশ্য অংশগ্রহণকারী সবার জন্যই পুরস্কারের ব্যবস্থা করে আয়োজক কমিটি।

পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যে মাছ ধরার এমন নিরিবিলি পরিবেশ সত্যিই অকল্পনীয়। পুকুরের পাড়জুড়ে লাগানো অর্ধশতাধিক নারকেল গাছ ছায়া ফেলেছে চারপাশে। তা ছাড়াও সবুজ রেশমের আভা মেলে আছে নানা ঔষধি গাছ। পুকুরের টলটলে পানির মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টোপলাগানো ছিপ ফেলে বসে থাকতে কোনো ক্লান্তিই আসে না মাছ শিকারিদের। কখন মাছ টোপ গিলবে, তার অপেক্ষাতেই যত মজা, যত আনন্দ তাদের। নবাববাড়ির খাজা মোহাম্মদ ওয়াসিম উল্লাহ জানান, মাছ শিকার তার পারিবারিক ঐতিহ্য। বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় শখের বসে মাছ শিকার করতে যেতেন। এখন মাছ ধরা তার নেশা হয়ে গেছে। গতবার মাছ শিকারের আয়োজনে টানা দু'দিন একনাগাড়ে বসে ছিলেন তিনি। তার বড়শিতে গেঁথেছিল সর্বোচ্চ ১২ কেজি ওজনের একটি রুই মাছ।

তেইশ বছর বয়সী নূর ইসলাম টিপু নবীন মৎস্যশিকারি। মাছ ধরেন সেই ছোটবেলা থেকে। তিনি বলেন, এখানে মাছ ধরতে এসে মনে হয় শৈশবে ফিরে গেছি। ছিপে মাছ গাঁথানোর নানা কৌশলের সঙ্গে প্রবল ধৈর্য থাকতে হবে। মাছ যে পেতেই হবে তা বলছি না, তবে মাছ পাওয়া অনেক আনন্দের। সেই মাছ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সপরিবারে খাওয়া দ্বিগুণ আনন্দের। পুরান ঢাকার মৎস্য শিকারি আলম বলেন, নবাববাড়ি পুকুরে টিকিট ছাড়লে মাছ ধরতে যাই। করোনাকালে, কর্মব্যস্ত নগরজীবনে বিনোদন আর সময় কাটাতে যাই। দিনভর ছিপ ফেলে কোনোবার ভাগ্যে জোটে খলই ভর্তি মাছ, আবার কখনও বাড়ি ফিরতে হয় সামান্য মাছ নিয়ে। তবে মাছ ধরা পড়ূক আর নাই বা পড়ূক, বিনোদনের কমতি থাকে না।

আবার এই পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে পাঁচ টাকায়, আবার কোনো বিশেষ সময়ে বিনা টাকায় গোসল ও সাঁতার কাটার ব্যবস্থা রয়েছে। পুকুরটি সংরক্ষণের জন্য চার পাড় তিন ফুট দেয়ালের ওপর গ্রিল দিয়ে ঘেরাও করা। সাধারণত নবাববাড়ি পুকুরে ইসলামপুর, শাঁখারীবাজার, পাটুয়াটুলী, তাঁতীবাজার, নয়াবাজার এলাকার বিভিন্ন দোকান বা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত লোকজন বেশি গোসল করেন। অনেকে নিয়মিত গোসল করেন। এখানে অনেক বিয়ের হলুদের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা ও বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানে পুকুরটি ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বর্তমানে দিনে প্রায় ২০০-৩০০ জন এ পুকুরে গোসল করেন।

ইসলামপুরের হোটেলে কাজ করেন মিজান। তিনি বলেন, আমার গোসল করার জায়গা নেই। আমি নিয়মিত এখানেই গোসল করতে আসি। প্রায় ১৩৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরটির অবস্থান ঢাকার ইসলামপুরের নবাববাড়ি রোডে। মৌলভি খাজা আবদুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মালিকানাধীন এ পুকুরটি 'নবাববাড়ি পুকুর' নামেই পরিচিত। দেখতে গোলাকার, তাই অনেকে 'গোল তালাব' পুকুরও বলে এটিকে। ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের প্রতিষ্ঠাতা নবাব আব্দুল বারী। কয়েকবার সংস্কার করা হলেও এ পুকুরের আয়তনে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। পাড়সহ পুকুরের আয়তন প্রায় আট বিঘা।

এটি পরিচালনা করছেন নবাব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত নবাববাড়ি ট্যাঙ্ক কমিটি। এই কমিটির সভাপতি মোহম্মাদ কাউয়ুম  বলেন, করোনার কারণে মাছ শিকারের আয়োজন কম হওয়ায় পুকুর থেকে মাসিক আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে প্রতি মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা আয় হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে বিশ হাজারে। এ কারণে বর্তমানে পুকুরে কর্মরত সদস্যরাও বেতন পাচ্ছেন অর্ধেক। কমিটি আশা করে, দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে। কমিটির সভাপতি বলেন, সরকার এটি 'ঐতিহ্যবাহী' ঘোষণা করায় রাঘববোয়ালরা চোখ দিয়েও কিছু করতে পারেনি। কমিটির পরিকল্পনা রয়েছে, পুকুরের ভেতরের চার পাড়ে নারীদের জন্য হাঁটার পথ তৈরি করার। এটি নির্মাণ করতে প্রায় ৬০ লাখ টাকা খরচ হবে। ইতোমধ্যেই এর নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে। মহামারি কমলে ট্রাস্টের অর্থায়নে কাজ শুরু করব।
উত্তরণ বার্তা/এআর


 

  মন্তব্য করুন
     FACEBOOK