পুসকাস! তারপরও দুঃখ যার সঙ্গী

  জুন ১৩, ২০১৮     ০     ৯:০২ অপরাহ্ণ     বিশ্বকাপের টুকিটাকি
--

আরিফ সোহেল : ১৯৫৭ সালে এই ওজন আর বয়সের (৩১) কারণে বেশ ফাঁপড়ে পড়লেন পুসকাস। কমিউনিস্টদের বিপক্ষে আওয়াজ তুলে দেশ ছেড়েছেন প্রায় ৩ বছর। হাঙ্গেরিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের আদেশ অমান্য করে স্পেন ও পশ্চিম ইউরোপে বুদাপেস্ট হনভেডকে নিয়ে ম্যাচ খেলেছেন। ফলে ২ বছরের জন্য তাকে সাসপেন্ড করে উয়েফা। সাসপেনশন শেষ হল যখন, বয়স ৩১। শরীরে চর্বি জমেছে অনেক। ইতালিয়ান লিগে কোনো ক্লাব খুঁজে পেলেন না পুসকাস। ১৯৫৮ সালে মিউনিখের সেই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বহু খেলোয়াড় মারা গেল। পুসকাসকে দলে ভিড়িয়ে নতুন করে শুরু করতে চাইলেন খন্ডকালীন ম্যানেজার জিমি মারফি। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কি এক আইনের কারণে আটকে গেলেন তিনি। পুসকাস আবার ভালো ইংরেজিও বলতে পারেন না। জায়গা হল না ইংলিশ লিগে। কয়েক মাস পর রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিলেন পুসকাস। ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮, লা লিগায় নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই স্পোর্টিং গিজনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক। ৪ জানুয়ারি ১৯৬০, আলফ্রেডো ডি স্টেফানো ও পুসকাস দুজনেই হ্যাটট্রিক করলেন লাস পালমাসকে ১০-১ গোলে উড়িয়ে দিল রিয়াল মাদ্রিদ। সেই শুরু। এর পরের ছয় বছর পুরো ইউরোপে ঝড় বইয়ে দিলেন পুসকাস-স্টেফানো। ১৯৬০-৬১ মৌসুমে এলচি এফ সি’র বিপক্ষে ৪ গোল করলেন পুসকাস। পরের মৌসুমে একই দলের বিপক্ষে আবার ৫ গোল। ১৯৬০, ’৬১, ’৬৩, ’৬৪ চারবার লা লিগায় যথাক্রমে ২৬, ২৭, ২৬ ও ২০টি গোল করেন পুসকাস। এর মধ্যে ১৯৬৩ সালে বার্সেলোনার বিপক্ষে প্রথমে বার্নাবো, পরে ন্যু ক্যাম্পেও হ্যাটট্রিক করার অবিশ্বাস্য এক রেকর্ড করেন, যা এখনও অক্ষুণ্ন আছে। ডাকটিকিটে ‘মেজর’ পুসকাস। ১৯৬১-’৬৫ টানা ৫ বার শিরোপা জিতে রিয়াল মাদ্রিদ। ৬ মৌসুমে ১৬০ ম্যাচে ১৫৬ গোল। সব ম্যাচ মিলিয়ে রিয়ালের হয়ে ৩৭২ অ্যাপিয়ারেন্সে ৩২৪ গোল। ১৯৫৯ সালে তার গোলে সেমিতে অ্যাথলেটিকোকে হারিয়ে ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে উঠে রিয়াল মাদ্রিদ। ইনজুরির কারণে ফাইনালটি খেলতে পারেননি পুসকাস। সে ঝাল মিটিয়েছেন ১৯৬১-এর ফাইনালে আইনট্র্যাখ্ট ফ্র্যাংকফুটের জালে ৪ গোল ঢুকিয়ে। স্টেফানোর তিনটি মিলিয়ে জার্মানদের ৭-৩ গোলে বিধ্বস্ত করে রিয়াল মাদ্রিদ। ৬ বছরে তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ জেতার পথে ৪ হ্যাটট্রিকসহ ৩৯ ম্যাচে ৩৫ গোল করেন পুসকাস। ১৯৬২-এর ফাইনালেও হ্যাটট্রিক আছে তার। যদিও বেনফিকার কাছে ৩-৫ গোলে হেরে যায় রিয়াল। এখন পর্যন্ত কেউ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে দু’টি হ্যাটট্রিক করতে পারেনি। এর আগে বুদাপেস্ট হনভেডের হয়ে জিতেছেন ৫টি লিগ শিরোপা, এর মধ্যে চারবার সর্বোচ্চ স্কোরার। সব মিলিয়ে হনভেডের হয়ে ৩৪১ ম্যাচে ৩৫২ গোল! ‘তার পুরো একটি ক্যারিয়ার ছিল হাঙ্গেরিতে। সেটারই পুনরাবৃত্তি করলেন রিয়াল মাদ্রিদে। সে জন্য সে শুধু বিশ্বমানের নয়। এক স্বপ্নরাজ্যের মানুষ’ বলেছেন হাঙ্গেরিয়ান গোলরক্ষক গুয়ালা গ্রোসিস, ’৫০-এর দশকে যিনি ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্সদের পোস্ট আগলাতেন। ১৯৪৯ থেকে ’৫৪ চার বছর বিশ্বকাপ ফাইনালের আগ পর্যন্ত টানা ৩২ ম্যাচ অপরাজিত ছিল হাঙ্গেরি। এর মধ্যে ১৯৫৩ সালে ৩-০ গোলে ইতালিকে হারিয়ে জিতে নেয় সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। ১০ গোল করে সর্বোচ্চ স্কোরার হন পুসকাস। ১৯৫৪-এর বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডের ম্যাচে জার্মানি (৮-৩) ও দক্ষিণ কোরিয়াকে (৯-০) গুড়িয়ে দেয় হাঙ্গেরি।

কোরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, পরের ম্যাচে আরেকটি, সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পড়ে যান ‘হেয়ারলাইন ফ্রেকচার’ ইনজুরিতে। ফাইনাল পর্যন্ত বিশ্রামে ছিলেন। ইনজুরি নিয়েই খেলতে নেমেছিলেন ফাইনালে। ৬ মিনিটে তার গোলে লিড নেয় হাঙ্গেরি। দুই মিনিট পর সিবরের আরেকটি গোল। তারপরেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে কিভাবে জিতে গেল জার্মানি তা এখনও ফুটবল পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয় হয়ে আছে। ম্যান ইউর সাবেক কোচ স্যার আলেক্স ফার্গুসন ঘটনাটি এখনও বিশ্বাস করতে পারেন না, ‘সন্দেহাতীতভাবে তার দিনে বিশেষ একজন ছিলেন পুসকাস। হাঙ্গেরি কেন ’৫৪-এর বিশ্বকাপ জিততে পারল না- তা এখনও আমার বোধগম্য নয়।’ বিশ্বকাপের ঠিক আগে ইংল্যান্ডকে প্রথমে উইম্বলিতে ৬-৩, পরে বুদাপেস্টে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল গ্যালোপিং মেজরের দল (পুসকাসের প্রথম সিনিয়র ক্লাব কিসপেস্ট একসময় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। নাম হয় বুদাপেস্ট হনভেড। তখন ফুটবলারদেরও র‌্যাংক দেওয়া হতো। পুসকাসের র‌্যাংক ছিল মেজর। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার শরীরে এত মোটা ভুড়ি, সে জন্যই পুসকাসের নিক নেম ছিল গ্যালোপিং মেজর)। ওই দুই ম্যাচে দুই দু’গুণে চারটি গোল করেছিলেন মেজর। ১৯৫২ সালে হেলসিংকিতে যুগোশাভিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে অলিম্পিকের স্বর্ণ জিতেছিল হাঙ্গেরি। প্রথম গোলটি ছিল মেজরের। আলবেনিয়াকে সে সময় ১২-০ গোলে হারিয়েছিল ম্যাগিয়ার্সরা, পুসকাস একাই করেন চার গোল। ১৯৬২-এর বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে চারটি ম্যাচ খেলেছিলেন পুসকাস। একটি গোলও পাননি। অতঃপর ৩৯ বছর বয়সে চিরদিনের জন্য খুলে রাখেন বুটজোড়া। কয় বছর আলজেইমার রোগে ভোগার পর ২০০৬ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই হাঙ্গেরিয়ান গোল মেশিন। এর ১৩ বছর আগে হাঙ্গেরিয়ান সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে নেয় পুসকাসকে। সে বছরই জাতীয় দলের আপাতকালীন দায়িত্ব নেন। খেলোয়াড়ি জীবনের পর কোচ হিসেবে প্রতিটি মহাদেশ ঘুরেছেন পুসকাস। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন দলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এর মধ্যে গ্রিসের প্যানাথিনাইকস ১৯৭০ সালে তার অধীনেই ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনাল খেলেছিল। সিবর, ককচিচ, বসিচ্দের নিয়ে হাঙ্গেরিকে বানিয়েছিলেন মাইটি ম্যাগিয়ার্স। আর আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদে গড়ে তুলেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকিং জুটি। ‘ও ছিল সুপার ট্যালেন্ট, মানুষ হিসেবেও চমৎকার। আমার বন্ধুকে হারালাম, একজন মেধাবী খেলোয়াড়কেও। সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিল সে। কিন্তু হায় আমার বন্ধু, যখন তুমি একদমই আশা করবে না, তখনই থেমে যায় জীবন।’ পুসকাসের মৃত্যুর পর দুঃখ ভারাক্রান্ত আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। বুদাপেস্টের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের নাম এখন ফেরেঙ্ক পুসকাস স্টেডিয়াম। দেরিতে হলেও শ্রেষ্ঠ সন্তানকে মৃত্যুর আগে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এক ঐতিহাসিক ভুল এড়াতে পেরেছে হাঙ্গেরি। ‘পুসকাসের মৃত্যুতে কেউ শোকাগ্রস্ত হননি এমন কোনো হাঙ্গেরিয়ান কি আছে? বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ হাঙ্গেরিয়ান আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। তবে তার কীর্তি বেঁচে থাকবে আজীবন।’- পুসকাসের মৃত্যুর পর বলেছেন হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট। নিজের উচ্চতা নিয়ে সবসময় দুঃশ্চিন্তায় থাকতেন পুসকাস। মজাও করতেন। ‘ম্যাচের দিন নার্ভাস ছিলাম না, এমনটি বললে মিথ্যা বলা হবে। নিজের সরঞ্জাম (কিটস) পরে ড্রেসিংরুমের করিডোরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম- এমন সময় ইংলিশ ড্রেসিংরুমে এডি টেইলরকে দেখতে পেলাম। ও বেশি লম্বা ছিল না। তৎক্ষণাৎ আমাদের ড্রেসিংরুমে মুখ ঢুকিয়ে বললাম, এই শোনো আমাদের সমস্যা হবে না। ওদের দলে এমন একজন আছে যে আমার চেয়েও খাটো!’ পরে বিবিসিকে বলেছেন পুসকাস। এটাই সেই ম্যাচ যে ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ৬-৩ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল হাঙ্গেরি।
উত্তরণবার্তা/আসো



পুরাতুন খবর