ফুটবলের রাজা কালো মানিক পেলে

  জুন ১৩, ২০১৮     ৫১     ৮:৪৬ অপরাহ্ণ     বিশ্বকাপের ভিন্নকিছু
--

আরিফ সোহেল : বুড়ো বয়সে কসমসে গিয়েছিলেন পেলে। এর আগে স্যান্টোস ছেড়ে ইউরোপে আসলেন না কেন? রিয়াল, জুভেন্টাস, ম্যান ইউ তো মুখিয়ে ছিল। আসবেন কিভাবে? পেলেকে যে দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না। জাতীয় সম্পদকে বাইরে রফতানি করা যায় না। ১৯৬১ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে কালো মানিককে ‘ন্যাশনাল ট্রেসারার’ হিসেবে ঘোষণা দেন ব্রাজিলিয়ান প্রেসিডেন্ট জুনিয়ো কোয়াড্রোস। পুরো ইউরোপের কেউ যে একদিনের জন্যও কোয়াড্রোসের ভালো স্বাস্থ্য কামনা করেনি তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে! তিনটি বিশ্বকাপ ও সর্বোচ্চ ৫৪১টি লিগ গোল, ন্যাশনাল কালারে ৯২ ম্যাচে ৭৭, স্যান্টোসের হয়ে ১০টি পওলিস্টা চ্যাম্পিয়নশিপ, ১৯৬২ ও ’৬৩ উপর্যুপরি দুই মৌসুমে কোপা লিবারটেডর্স, ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ, আর সব মিলিয়ে জীবনে ১২৮১ (১৩৬৩ ম্যাচে) গোল-পরিসংখ্যানে মোটামুটি এই হলেন এডসন অ্যারান্টেস দো নাসিমেন্টো। বিজ্ঞানী আলভা এডিসনের নামে নাম রেখেছিলেন বাবা। পরে ‘আই’ বাদ দিয়ে এডসন করা হয়। পেলের পর জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৮৪টি গোল করেছেন ফেরেঙ্ক পুসকাস। হাঙ্গেরিয়ান গ্রেট বলেছেন, ‘পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড় আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। পেলের কথা বাদ। ও তালিকার বাইরে!’ ১৯৫৮ সালে পেলে যখন সুইডেনে আসেন তখন তার বয়স মাত্র ১৭, বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। পওলিস্টা চ্যাম্পিয়নশিপে পাগলের মত গোল করে এসেছেন (এক মৌসুমে ৫৮, যে রেকর্ড ৫৫ বছরেও কেউ ভাঙ্গতে পারেনি)। ফলে ইউরোপিয়ান মিডিয়া স্বভাবতই সতর্ক। হাঁটুর ব্যাথার কারণে প্রথম দু’টি ম্যাচ খেলতে পারেননি পেলে। তৃতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ সোভিয়েত রাশিয়া। তার পাসেই ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি করেন ভাভা। ওয়েলসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথম বিশ্বকাপ গোলের দেখা পান। সেমিতে পন্টিয়ানো, ফন্টেইনের ফ্রান্স যখন (১-২ গোলে পিছিয়ে) ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করছে তখন এক, দুই, তিন গুণে হ্যাটট্রিক করে ফেললেন পেলে। ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্বাগতিক সুইডেন। প্রসঙ্গত, ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ওই বয়সেই ব্রাজিলের বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিটি পেয়ে যান পেলে। ১৭ বছর ২৪৯ দিন। আবেগ আর অভিমান নিয়ে সংগ্রাম করতেই তো বেলা পেরিয়ে যায় এই বয়সের তরুণদের। সেখানে বিশ্বকাপ ফাইনাল। পেলে কি কাঁপছিলেন? হয়তো বা, হয়তো না। তবে সুইডেন যে কাঁপতে কাঁপতে ধ্বসে পড়ল সে তো ইতিহাস। বক্সের ভেতর বল রিসিভ করে চমৎকার লবে ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিলেন, বলটি মাটিতে পরার আগেই পারফেক্ট ভলি, পেলের প্রথম গোল। সুইডেনকে ‘জোগো বোনিতো’র মোটামুটি এক পাঠ শিখিয়ে ৫-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মত জুলেরিমে ট্রফি জেতে ব্রাজিল। পরে সুইডিশ ফুটবলার শিভগার্ড পারলিং বলেছিলেন, ‘পেলে যখন দ্বিতীয় গোলটি (দলের পঞ্চম) করল, সত্যি বলছি, মনে মনে প্রশংসা করছিলাম আমি! সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পাশাপাশি সিলভার বলটিও পেয়েছিলেন পেলে। ১৯৬২-এর বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে প্রথম গোলটি করানোর পর দ্বিতীয় গোলটি নিজেই করেন। দ্বিতীয় ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে একটি দূরপালার শট নিতে গিয়ে ইনজুরড হন, আর ফিরতে পারেননি।

পেলেকে ছাড়াই দুর্দান্ত দাপটে শিরোপা জিতে নেন গ্যারিঞ্চা, আমোরিল্ডোরা। পরের বিশ্বকাপের নাম ‘পেলেকে ঠেকাও’ দেওয়া যেত। ১৯৬৬-এর আসরে ইউরোপ যেন পণ করে নেমেছিল ওকে খেলতে দেওয়া যাবে না। খেলতে দিলেই গোল করবে সুতরাং ‘অ্যাটাক হিজ লেগস রাদার দ্যান দ্য বল’! বুলগেরিয়ার বিপক্ষে (২-০) প্রথম ম্যাচে গোল করলেন। সে জন্য সারাক্ষণ ডিফেন্ডারদের শকুনি চোখ এড়াতে হয়েছে। ১১ জনই যদি মারতে চায়, তাহলে আর কতক্ষণ?

অ্যাঙ্কেলে, হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে কোনো রকমে ম্যাচ শেষ করলেন পেলে। ব্যথার কারণে মিস করলেন পরের ম্যাচ। হাঙ্গেরির কাছে হেরে গেল ব্রাজিল। গ্রুপের শেষ ম্যাচ ইউসেবিওর পর্তুগালের সঙ্গে। ব্রাজিলের জন্য ‘ডু অর ডাই’। আতঙ্কিত হয়ে ইনজুরড পেলেকে একাদশে ফেরালেন ব্রাজিলয়ান কোচ ভিসেন্টে ফিওলা। পর্তুগালের জোয়াও মরিয়াস মারাত্মক ফাউল করলেন পেলেকে। ধারাভাষ্যকাররা বললেন, ‘ইট ইজ অ্যা ব্রুটাল অ্যাটাক।’ তবুও লাল কার্ড দেখালেন না রেফারি জর্জ ম্যাকাবে। ৩-১ গোলে জিতে গেল পর্তুগাল।

মারাত্মক ইনজুরি নিয়ে সারাক্ষণ মাঠে খোঁড়াচ্ছিলেন পেলে। তখন খেলোয়াড় বদলের নিয়ম ছিল না। সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম করুণ দৃশ্য ছিল সেটা। ম্যাচ শেষে পেলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আর জীবনেও বিশ্বকাপে খেলবেন না। ওই ফাউল সর্ম্পকে মিডিয়া লিখেছিল, ‘পর্তুগাল খুন করে বেঁচে গেল!’ ১৯৬৯ সালের ১৩ নভেম্বর স্যান্টোসের হয়ে ক্যারিয়ারের ১০০০তম গোল করেন পেলে। তখন থেকে স্যান্টোস ১৩ নভেম্বর পেলে দিবস হিসেবে পালন করে। পরের বছর দেশবাসীর অনুরোধে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে বিশ্বকাপে ফেরেন পেলে। ১৯৭০ বিশ্বকাপ, মেক্সিকো। গ্যারিঞ্চা, স্যান্টোস, ডালমা স্যান্টোস ও গিলমার অবসরে। তবুও আলবার্টো টরেস, টোস্টাও, জোয়ারজিনহো, গারসন, রিভেলিনো ও পেলেকে নিয়ে যে ব্রাজিল দল সেটাকে এখনও অনেকেই সর্বকালের সেরা স্কোয়াড বলে থাকেন। শেষের পাঁচজন প্রত্যেকেই ১০ নম্বর জার্সিটি দাবি করতে পারতেন। প্রথম ম্যাচে পেলের গোলে ২-১ গোলে এগিয়ে গেল ব্রাজিল। পরপরই প্রায় মাঝমাঠ থেকে দারুণ এক লব করেছিলেন, সামান্যও জন্য বাইরে দিয়ে চলে যায় বল। ৪-১ গোলে হারে চেকোস্লোভাকিয়া। পরের ম্যাচে পেলের দারুণ এক হেড অসম্ভব দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন ইংলিশ গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাংকস, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ‘সেভ’-এর আখ্যা পায়। পেলের পাসে জোয়ারজিনহোর একমাত্র গোলে জিতে যায় ব্রাজিল। রোমানিয়ার বিপক্ষে আবার প্রথম গোল পেলের, বক্সের বাইরে থেকে পাওয়ারফুল ফ্রিকিকে আরেকটি। ৩-২ গোলে হারে রোমানিয়া। কোয়ার্টার ফাইনালে পেরুর বিপক্ষে কোনো গোল নেই। তবে টেস্টাওর তৃতীয় (দলীয়) গোলটি হয় তার পাসে। সেমিতে প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে, যারা ১৯৫০ সালে মারাকানায় লক্ষাধিক ব্রাজিলয়ানদের হৃদয় ভেঙে জিতেছিল দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। জোয়ারজিনহো, পেলে, রিভেলিনো উরুগুয়ান ডিফেন্সকে মাখনের মতো কেটে পিস পিস করে ফেলেন। পেলে বাদে গোল করেন দু’জনই। ৩-১ গোলে জিতে ব্রাজিল। গোল না পেলেও ক্যারিয়ারের সম্ভবত সেরা মুহূর্তটি উপহার দেন পেলে। টোস্টাওর থ্রো ছিল, ধরার জন্য এগিয়েছেন পেলে, উরুগুয়ান কিপার চোখ রাখছিলেন পেলের দিকে, আশপাশে কোনো ডিফেন্ডার নেই, এগিয়ে আসতে বাধ্য হন তিনি। এবারে শেষ মুহূর্তে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যান পেলে, স্বভাবতই মাজুরকিউয়িচ ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করেন বলে টাচ করেননি পেলে, সেটি ডান দিকে বেরিয়ে গেছে। কিপারের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন পেলে, যদিও অতিরিক্ত ঘুরে যাওয়ার কারণে তার শট সামান্যর জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। সম্ভবত এটাই বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর মিস! ফাইনালে ইতালি দাঁড়াতেই পারেনি। টারসিচিয়ো বার্গনিকের মাথার উপর দিয়ে দারুণ হেডে পেলের প্রথম গোল। তার পাসেই পরে দু’টি গোল করেন জোয়াজিনহো ও রিভেলিনো। চার নম্বর গোলটি ছিল দারুণ সুন্দর দলীয় প্রচেষ্টার ফল। চিরদিনের জন্য জুলেরিমে ট্রফিটি ব্রাজিলের হয়ে গেল। ১৯টি গোলের ১৪টিতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থেকে টুর্নামেন্ট সেরা পেলে। ফাইনালে পেলেকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল বার্গনিকের। ‘ম্যাচের আগে নিজেকে বলছিলাম, এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আর সবার মত পেলেও হাড়মাংস দিয়েই তৈরি। আই ওয়াজ রং!’- ফাইনাল শেষে বলেছেন, ইতালিয়ান ডিফেন্ডার। পেলের সঙ্গে ম্যারাডোনার তুলনা ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মুখরোচক একটি বিষয়। ১৯৯৯ সালে ফিফা আয়োজিত ‘ফুটবলার অব দ্য সেঞ্চুরি’ ভোটাভুটিতে জুরিদের রায় পান পেলে, আর অডিয়েন্স পোলে সেরা নির্বাচিত হন ম্যারাডোনা। এ ব্যাপারে পেলের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার- ‘পৃথিবীতে একজনই পেলে। তার মত আর কেউ নেই। কারণ আমার বাবা-মা বহু আগেই উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন!’ -হাসতে হাসতে বলছিলেন।

‘আমাকে বলুন সে (ম্যারাডোনা) ডান পা ও মাথা দিয়ে কয়টা গোল করেছে? আপনারা পরিসংখ্যান দেখুন, রেকর্ড দেখুন, তাহলে সহজেই বুঝবেন কে সেরা?’ পেলে সম্পর্কে ম্যারাডোনার বক্তব্য এখানে দিলাম না। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৩টি (যা এখনও বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে) গোল করেছিলেন জাস্ট ফন্টেইন। পেলে সম্পর্কে এই ফরাসি বলছেন, ‘ওর খেলা দেখলে মনে হয় নিজের বুটজোড়া খুলে রাখি!’ টোটাল ফুটবলের জনক ক্রুয়েফ কোনো যুক্তি দিয়েই পেলের কাণ্ডকীর্তি ব্যাখ্যা করতে পারেন না, ‘সে একমাত্র ফুটবলার যে যুক্তির সীমা পেরিয়ে গেছে।’ আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্রিটিশ গ্রেট ববি চালর্টন বললেন, ‘আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় ফুটবল খেলার জন্মই হয়েছে পেলের জন্য।’ ’৭০ বিশ্বকাপে হঠাৎ একজন টিভি ধারাভাষ্যকার বললেন, পেলের বানান কি? তৎক্ষণাৎ উত্তর এল, এ-ঙ-উ! তবে পেলেই সম্ভবত নিজের সম্পর্কে সেরা উক্তিটি করে রেখেছেন, ‘পৃথিবীর বহু জায়গা আছে যেখানে মানুষ যীশুকে চেনে না, পেলেকে চেনে!’
উত্তরণবার্তা/আসো



ম্যাচ পয়েন্ট

সেমিফাইনাল

১০ জুলাই, ২০১৮ মঙ্গলবার

ফ্রান্স–বেলজিয়াম, রাত ১২.০০টা, সেন্ট পিটার্সবার্গ

১১ জুলাই, ২০১৮ বুধবার

ইংল্যান্ড–ক্রোয়েশিয়া, রাত ১২.০০টা, মস্কো

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী

১৪ জুলাই, ২০১৮ শনিবার

সেমিফাইনালের পরাজিত দুই দল, রাত ৮.০০টা, সেন্ট পিটার্সবার্গ

ফাইনাল

১৫ জুলাই, ২০১৮

রোববার দুই সেমিফাইনাল জয়ী, রাত ৯.০০টায়, মস্কো

* সকল খেলার সময় বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী

পুরনো খবর