ইংল্যান্ডকে ২৮৬ রানের টার্গেট দিল অস্ট্রেলিয়া     ১১ বছরে ৩৩৯টি কলেজ সরকারিকরণ করা হয়েছে : দীপু মনি     রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের সহযোগিতা চাইলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী     প্রমাণিত হয়েছে ইভিএমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব : ড.হাছান মাহমুদ     হজ-ফ্লাইট শুরু ৪ জুলাই     মাশরাফি-সাকিবদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে : প্রধানমন্ত্রী     নড়বড়ে সেতু তাড়াতাড়ি মেরামত করুন     বাংলাদেশকে চারটি পণ্যবাহী জাহাজ দেবে ডেনমার্ক    

‘রাফিরে, আমার মা রে...’

  এপ্রিল ১১, ২০১৯     ৪৪৬     ১০:২৭ পূর্বাহ্ন     জাতীয় সংবাদ
--

উত্তরণবার্তা প্রতিবেদক : ‘রাফিরে, আমার মা রে... ’ বলে বিলাপ করতে করতে আবারও জ্ঞান হারান অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারানো মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির (১৮) মা শিরিন আক্তার।

মেয়ের মৃত্যুর পর থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউর বাইরে বসে কাঁদছেন নুসরাতের মা, বাবা মাওলানা একেএম মুসা।

বাবার সঙ্গে চেয়ারে বসে কাঁদছেন নুসরাতের বড় ভাই নোমান। কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। জ্ঞান ফেরার পর আবার কাঁদছেন।

বুধবার রাত সোয়া ১০টায় আইসিইউর বাইরে তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। তাকে দেখে নুসরাতের বাবা ও ভাই জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকেন।

জ্ঞান ফেরার পর ‘রাফিরে, আমার মা রে... মা’ বিলাপ করতে করতে আবারও জ্ঞান হারান। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হয়।

এদিকে রাত সাড়ে ১১টায় রাফির বাবা একেএম মুসা মানিক ও ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানসহ অন্য স্বজনদের গাড়িতে করে একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

গাড়িতে ওঠার আগে দেশবাসীর কাছে তার মেয়ের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া চান রাফির বাবা।

মেয়ে হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। রাতেই খবর পৌঁছায় সোনাগাজীতে। সেখানেও শোকের ছায়া নেমে আসে। গ্রামের বাড়িতে তার কাছের আত্মীয়রা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভিড় বাড়তে থাকে নিকট আত্মীয়দের।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, নুসরাতকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না। রাফিকে রাতে মর্গে রাখা হবে।

বৃহস্পতিবার সকালে ময়নাতদন্তের পর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর পর তার মরদেহ ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হবে। ডিপ বার্ন হওয়ায় প্রথম থেকেই রাফির বাঁচার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। তিনি বলেন, আগুনে তার শরীর পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল।

বুধবার সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা হয়েছে। সামন্ত লাল সেন জানান, রক্ত ও ফুসফুসের মারাত্মক সংক্রমণ থেকে কার্ডিও রেসপিরেটরি ফেইলিয়র (হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ) হয়। এতেই তার মৃত্যু হয়।

তিনি বলেন, ৮০-৮৫ শতাংশ বার্ন হওয়া রোগীর বডিতে অনেক রকম সমস্যা হয়। এই রোগীকে বাঁচানো খুব মুশকিল। বুধবার তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। এ ধরনের পেশেন্টের হঠাৎ মৃত্যু হয়। আমরা সিঙ্গাপুরে কথা বলেছিলাম- তারাও বলেছিল চান্স অব সারভাইবেল কম।

নুসরাত জাহান রাফির চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম বলেন, রাফিকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি আমরা।

বুধবার সকাল থেকে তার অবস্থা অবনতি হতে থাকে। একাধিকবার তার হার্ট অ্যাটাক হয়, তার পরও সে সার্ভাইভ করেছিল। কিন্তু রাত সাড়ে ৯টার দিকে সব শেষ হয়ে যায়। মারা যায় রাফি।

ঢামেক হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, ‘নুসরাতের শরীরের ৮৫ শতাংশ মেজর বার্ন। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ গভীর পোড়া। তার শ্বাসতন্ত্র পোড়া ছিল। কেরোসিন নিজেই টক্সিক। এটি ফুসফুস ও ব্রেনের কার্যক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এসব কারণই তার মৃত্যু হয়েছে বলা যায়।’

নুসরাতের চাচাতো ভাই ওমর ফারুক বলেন, দুপুরে রক্তের দরকার পড়েছিল, তখন আমরা রক্ত সংগ্রহ করে দিই। কিন্তু চিকিৎসকরা সকাল থেকে বারবার রাফির অবস্থার অবনতির কথা বলছিলেন। চিকিৎসকদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। রাফির অপর চাচাতো ভাই ফরহাদ হোসেন বলেন, আমরা রাফি হত্যার বিচার চাই, আর কিছু বলার নেই। যারা এমন একটি কাজ করল, তাদের শাস্তি চাই।

৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসাছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে, এমন সংবাদে তিনি ছাদে যান।

সেখানে বোরকাপরা ৪-৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।

অস্বীকৃতি জানালে তারা রাফির গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সোমবার রাতে অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

এর আগে ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা।

এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

রাফিকে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা মামলার প্রধান আসামি ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাসহ তিনজনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সরাফ উদ্দিন আহম্মেদ এ আদেশ দেন।

কোর্ট ইন্সপেক্টর গোলাম জিলানী জানান, এসএম সিরাজউদ্দৌলাকে সাত দিন, একই মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবছার উদ্দিন ও সহপাঠী আরিফুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এর আগে মঙ্গলবার একই আদালত আসামি নুর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও শাহিদুল ইসলামকে পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

প্রত্যেককেই সাত দিন করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানানো হয়েছিল। এদিকে মঙ্গলবার রাতে আটক উম্মে সুলতানা পপি (অধ্যক্ষের শ্যালিকার মেয়ে) এবং বুধবার সন্ধ্যায় মামলার এজাহারনামীয় আসামি যোবায়ের হোসেনকে আদালতে হাজির করে সাত দিন করে রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। আবেদনের ওপর আজ শুনানি হবে।

উত্তরণবার্তা/এআর
 



পুরনো খবর