করোনায় দেশে আরও ২৮ জনের প্রাণহানি, আক্রান্ত ১৫৪০     ধনী-গরিব সব দেশ যেন করোনার ভ‌্যাকসিন পায় : রাষ্ট্রপতি     কানাডায় শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ: জাস্টিন ট্রুডো     অবশেষে শান্তি ফিরল লাদাখে     জেদ্দা-রিয়াদে বিমানের বিশেষ ফ্লাইট ২৬-২৭ সেপ্টেম্বর     জলবায়ু ও করোনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় হুমকি     অবশেষে জার্মানে আজানের অনুমতি পেলেন মুসলিমরা     ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অটুট থাকবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী    

‘স্মরণের আবরণে আমার বুঁচুসোনা শেখ রাসেল’

  আগস্ট ১৫, ২০২০     ৮১     ১২:১২     প্রবন্ধ
--

গীতালি দাশগুপ্তা

বুঝতে পারলাম, বাসার সকলেই ওকে আর আমাকে খেয়াল করছে। এছাড়া, আমার মনে হলো, ওকে আর আমাকে নিয়ে সকলেই খানিকটা চিন্তিত আছে। রাসেলকে বুঝতে আমার খুব সময় নেয়নি। এর পেছনেও গল্প রয়েছে। সেই গল্পটা হলো, ওকে ‘আ-কার’, ‘ই-কার’ শেখাতে ‘আদর্শ লিপি’ বইখানা ব্যবহার করছিলাম। বলছিলাম-
: এগুলো যদি সব শিখতে ও মনে রাখতে পার, তবে তুমি যে কোনো বই পড়তে পারবে। বুঝলাম, আমার কথাটা ওর পছন্দ হয়েছে। ‘আদর্শ লিপি’ বইয়ের পাতা এক এক করে উল্টে যাচ্ছি আমি। মাঝে মাঝে ছবিগুলোও দুজনে মিলে দেখছি, সে-সাথে ‘আ-কার’, ‘ই-কার’গুলো শেখাতে শুরু করি। ‘য’ ফলা ও ‘র’ ফলাতে এসে একটা ছবির ওপর রাসেলের চোখ পড়ল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল-
: এই পাতায় কী আছে? এগুলো কী?
: একে বলে ‘য’ ফলা ও ‘র’ ফলা। ঐ পাতায় একটা ছবি ছিল, (আজকের ‘আদর্শ লিপি’তে এ ছবি আছে কি না আমি জানি না) সেই ছবিটার ওপর তর্জনী দিয়ে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল-
: এইটা একটা বাঘ না আপা?
: হ্যাঁ। বাঘকে ‘ব্যাঘ্র’ বলে, তাই এই ছবি। আমি এ-কথা বলে ব্যাঘ্র বানানের ‘য’ ফলা ও ‘র’ ফলা কোনটা তাই দেখালাম। রাসেল কি ঐসব দেখছে?
ওর চোখ বাঘের দিকে। ছবিটা ছিল বাঘের মুখে একটা ছাগল, আর অনেকগুলো ছাগল ভয়ে চারদিকে দৌড়ে পালাচ্ছে। এই ছবিটা রাসেলকে আকর্ষণ করেছে। ছবিটার দিকে সে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে।
এটা আমি খেয়াল করলাম। বাঘের মুখে যে ছাগলটা সেই ছবিটার ওপরে ছোট তর্জনীটা রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করল-
: দ্যাখেন আপা, বাঘটা কি বোকা, মুখের ছাগলটা তো বাঘের কামড়ে মইড়্যাই গেছে, ছাগলটা তো আর দৌড়াইতে পারবে না, বাঘটা তো অর মুখের ছাগলটা মাটিতে রাইখ্যা অন্য ছাগলগুলিরে ধরতে পারে। বাঘটা কি বোকা তাই না আপা?
এরপর কি আমার ছোট্ট বুঁচুকে চিনতে ভুল হয়?
আমার চিনতে ভুল হয়নি তো! ওর ভেতরে রয়েছে ওর মতোই একটি শিশুমন, যে মনটি ছবি দেখে এমন কথা বলতে পারে। ঐ মনটিকে বস করাই হবে আমার শিক্ষকতার অলংকার। ঐ অবুঝ মনটা আমার চাই।
এই মর্মার্থটাই আমি সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম। সুতরাং বই-খাতা যখন রাসেল মাটিতে ফেলেছে, তখন আমার কোনো রাগ বা বিরক্ত হয় নাই। এখানে ছিল আমার নিজের ওপরে নিজের পরীক্ষা। বলা যায় চ্যালেঞ্জ। বাইরের লোক এ ঘটনা জেনে-শুনে হয়তোবা কোনো মন্তব্য করবেন, কিন্তু ওটা আমার কাছে ছিল নিছক একটা বাচ্চার অবুঝ কা-। অবুঝ বলেই তো করেছিল, বুঝতে পারলে এ কাজ সে করত না। অবুঝ বলেই না আমাকে বারবার ‘রাগ’ করতে বলেছে। এ-কথা শিশুমুখেই শোভা পায়।
ছোট ছোট অংক শেখার পর, তাকে অংক করতে দিলে সে মোটেও খুশি হ’তো না। অংকের প্রতি তার প্রবল অনীহা। দুটো-তিনটার বেশি অংক করতে চাইতো না। এমনি একদিন, তাকে ঐ রকম ছোট ছোট পাঁচটি অংক করতে দিয়েছি, সে অংক করে খাতাটা আমার দিকে ঠেলে দিল। আমি দেখি সে তিনটা অংক করেছে, দুটো করেনি। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম-
: তুমি তিনটে করেছো, আর দুটো করে ফেলো।
: ইচ্ছা করছে না।
: ও দুটো কে করবে?
: জানি না। বেশ জোরেশোরেই বলে দিল।
মহা মুশকিল হলো এবার। ওকে আরও বড় অংক শিখতে হবে। একেবারে শুরু থেকেই সব শিখাতে হচ্ছে ও হবে। খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি। বার্ষিক পরীক্ষাও এসে যাচ্ছে সামনে! এ চিন্তা আমার সে-মুহূর্তের নয়, এ চিন্তা প্রথম থেকেই আমার মাথায় ঢুকে রয়েছে। কী করি, কী করি? কীভাবে সব কটা অংক করানো যায়? ভাবছি আর ভাবছি! ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে একটা গল্প ফেঁদে নিলাম। অংকের খাতাটা আমার হাতের নিচে রেখে, রাসেলকে প্রশ্ন করলাম-
: তোমার স্কুলে কোনো বন্ধু আছে?
: ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল, আছে। ক্যান?
: তুমি তাদের সাথে কী কর?
: ক্যান? খেলি, গল্প করি। আরও অনেকে কিছু করি।
: ও…। তুমি চকলেট খুব পছন্দ কর, তাই না?
: হ্যাঁ। এই কথা জিজ্ঞাসা করতেছেন ক্যান?
: স্কুলে চকলেট নিয়ে যাও?
: হ্যাঁ, যাই তো চকলেট নিয়া।
ও কিন্তু ভ্রু যুগল কুঁচকেই উত্তরগুলো দিয়ে যাচ্ছে।
: তুমি স্কুলে চকলেট নিয়ে যাও তাহলে?
: স্কুলে চকলেট নেই তো।
: কোথায় পাও চকলেট? মানে কোথা থেকে নিয়ে যাও চকলেট?
: ক্যান, বাসার থিকা নিয়া যাই।
: বাসা থেকে কি একটা চকলেটই নিয়ে যাও?
মাথা নেড়ে বেশ বিরক্ত হয়ে বললÑ
: না… একটা চকলেট নেব ক্যান? অনেকগুলি নিয়া যাই।
: তুমি তোমার বন্ধুদের সামনেই চকলেটগুলো খাও?
: হ্যাঁ… বলে, আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
: বন্ধুদের দাও না? একা একা সব চকলেট ওদের সামনেই খাও?
এবার আমার বুঁচু গর্জে উঠে বলে-
: আপনি কিচ্ছু জানেন না। আমি ক্লাসের সবাইকে আগে দিয়া তারপর খাই। কোনোদিন আমার জন্য একটাও থাকে না।
: আমি ততোধিক শান্তভাবে বললাম, ও…! তুমি তাহলে সকলকে দাও চকলেট?
: আমি সবাইকে দিয়া খাই।
ঠিক এই সময়ে আমি আস্তে করে আমার হাতের তলা থেকে অংকের খাতাটা বের করে ওকে বললাম-
: দেখো, পাঁচটা অংকের মধ্যে তুমি তিনটে করেছো, দুটোকে করোনি, ঐ দুটো অংক কষ্ট পেল না? ওরা মনে মনে কষ্ট পেয়ে ভাবছে, রাসেল ভাই তিনজনকে (তিনটে অংক) করলো, আমরা দুজন বাদ পড়ে গেলাম। আমাদের দুজনকে করলো না! ঐ অংক দুটো তো কষ্ট পেল! এখন বলো, আমি কীভাবে বুঝবো তুমি তোমার বন্ধুদের চকলেট দাও?
ছোট্ট মানুষ! আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলে উঠল-
: অংক কি বুঝতে পারে? অংকের কি প্রাণ আছে? ওরা কি কথা বলতে পারে? ওদের তো প্রাণ নাই, তাইলে ওরা কষ্ট পাবে ক্যান?
: তুমি ঠিক বলেছো। ওরা আমাদের মতো কথা বলতে পারে না ঠিক, কিন্তু ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারে। মানে, অংকে অংকে কথা বলতে পারে। দেখো না, একটা পিঁপড়া আর একটা পিঁপড়ার গা ছুঁয়ে যায়, এভাবেই ওরা কথা বলে। ওটাই ওদের কথা বলার ভঙ্গি।
একটু যেন চিন্তায় পড়ে গেল আমার ছোট্ট ছাত্রটি। বলে উঠল-
: এইটা ক্যামনে হয়?
: বারে, হবে না কেন? আমাদের যেমন ‘বাংলাদেশ’ আছে, অংকেরও হয়তোবা একটা ‘অংকের দেশ’ আছে। ওরাও আনন্দ পায়, কষ্ট পায়, দুঃখ পায়।
কথাগুলো শেষ করার সাথে সাথে সে বলল-
: দ্যান, খাতাটা দ্যান।
হাতের তলা থেকে খাতাটা ওর দিকে ঠেলে দিলাম। টান মেরে খাতাটা নিয়ে ঝট্পট্ অংক দুটো করে খাতাটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল-
: ন্যান আপনার অংক। এখন তো ওদের কষ্ট হবে না।
সব ক’টা অংক সেদিন সে ঠিকভাবে করেছিল। কত মায়া-মমতায় ভরা ওই ছোট্ট বুকখানি। আমার ছলনায় সে নিজে কষ্ট পেয়ে, অংক দুটোর কষ্ট অনায়াসে মুছে দিল।
এমন আর একটা ব্যাপার পরের দিন ঘটেছিল। সেদিন সব বিষয় পড়ানো হয়ে গেছে, এবার অংকের পালা। আর আমার পালা হচ্ছে কীভাবে ওকে অংক করার কথা বলা যায়! আমি চেয়ার থেকে নিজেকে একটু নাড়া দিয়ে টেনে টেনে বললাম-
: এ-বা-র আমাদের অ-ঙ্কের পালা।
খেয়াল করলাম ওর মুখের অভিব্যক্তি। না, কোনো অনীহার প্রকাশ ঘটল না। আমি নিশ্চিত হয়ে ওর খাতাটা নিলাম। খাতাটা নেবার সাথে সাথে রাসেলের জিজ্ঞাসা-
: আইজ আমারে কয়টা অংক দেবেন?
: দেখি ক’টা দেই! তুমি ক’টা করতে চাও?
কোনো উত্তর নেই। একেবারে চুপ। আমি ছয়টা কি সাতটা অংক লিখে ওর দিকে খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বললামÑ
: মন দিয়ে দেখ তারপর অংকগুলি কর, সব ক’টাই পারবে।
আমার কথা শুনে ওর ভ্রু দুটো একটু কুঁচকে গেল।
বুঝলাম, পছন্দ হয়নি। বেশ তাড়াতাড়ি আমাকে খাতাটা ফেরত দিল। আমি খুশিমনে খাতাটা টেনে নিলাম। ওমা! খাতাটার দিকে তাকিয়ে দেখি আজও সে সবগুলো অংক করে নাই। এ অবস্থা দেখে আমি বললামÑ
: এ কি! সবগুলো অংক করোনি কেন?
উদাসমনে উত্তর দিল-
: না, আর করবো না।
: কেন…?
: ভালো লাগে না। রোজ রোজ অংক করতে ইচ্ছা করে না।
একটু অনুরোধের সুরেই বললাম-
: করে ফেলো না…! মাত্র তো দু-তিনটে আছে!
: বললাম তো ভালো লাগে না।
এ-কথা বলেই সে খাতার পাতাটা ছিঁড়ে ফেলে দিল এবং পাতাটাকে আরও দু-টুকরো করে ছিঁড়ে ছোট্ট হাতে দলামোচা করে মেঝেতে ফেলে দিল। আমার তখনকার অবস্থা বা অনুভূতির কথা নাইবা বললাম!
আমি চুপচাপ! টেবিলের উপর আমার হাত দুটো অসহায়ের মতো ফেলে রেখে বসে থাকলাম।
রাসেল বলে উঠল-
: আমারে বকবেন এখন? বকেন!
আমি মাথা নেড়ে বুঝালাম, না বকবো না। এ সময় ফরিদ (কাজের ছেলে) চা-জলখাবার নিয়ে ঢুকলো।
টেবিলের উপর ট্রেটা রেখে, কাগজের ছেঁড়া টুকরোগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলোÑ
: আপা, এগুলো কী?
আমি কিছু বলার আগেই রাসেল বলে উঠল-
: আমি খাতা ছিঁড়ছি।
: ভাইয়া, আপনি (ওরা রাসেলকে তুমি না আপনি বলতো আজ মনে নেই। তাই আপনি লিখছি) খাতা ছিঁড়ছেন? ক্যান?
ভাইয়ার উত্তর-
: আমার ইচ্ছা।

(২য় পর্ব)


( চলমান....... পরবর্তী অংশ আগামীকাল)

লেখক : ১৯৭২ থেকে ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত রাসেলের গৃহশিক্ষিকা; তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পরে অধ্যাপনা করে অবসর নিয়েছেন। এখন সিডনি প্রবাসী।



অবশেষে শান্তি ফিরল লাদাখে

  সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০

২৪ সেপ্টেম্বর, হাসতে নেই মানা

  সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০     ১০৪

অবশেষে শান্তি ফিরল লাদাখে

  সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০     ৭৯

দেশের বাজারে আবারও কমলো স্বর্ণের দাম

  সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০     ৪৩

২৪ সেপ্টেম্বর, টিভিতে আজকের খেলা সূচি

  সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০     ৪২

পুরনো খবর