আওয়ামী লীগের জনসভায় মানুষের ঢল     জাতীয় ঐক্য শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা সন্দেহ আছে: সেতুমন্ত্রী     ৭ অক্টোবর থেকে ২২ দিন ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ     আন্দোলনের মুরোদ নেই ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত : ওবায়দুল কাদের     সরকার উৎখাতে দুর্নীতিবাজরা জোট বেঁধেছে: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা     মিরপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত     নিউ ইয়র্কে পৌঁছালেন প্রধানমন্ত্রী     আফগানদের হারিয়ে ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল বাংলাদেশ    

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়

  জুলাই ১১, ২০১৮     ৯২     ৭:৫৯ অপরাহ্ণ     প্রবন্ধ
--

ড. নূহ-উল-আলম লেনিন:
পূর্বকথা
আজকের সেমিনারের শিরোনাম ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’। আমি কোনো ব্যাখ্যা না করেই বলব, সেমিনারের শিরোনাম ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন কোনো যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে না বা এ অঞ্চলটি এখন আর শান্তিচুক্তি-পূর্ব আশির দশকের রক্তাক্ত উপত্যকা নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও বিদ্রোহীদের আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পণের ভেতর দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দীর্ঘ দুই দশকের রক্তপাত ও সংঘাতের অবসান হয়েছে। বিপুল সংখ্যক (প্রায় ৬৪ হাজার) চাকমা উদ্বাস্তুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং তাদের পুনর্বাসন, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন, সর্বোপরি গত দুই দশকে শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারার বাস্তবায়নের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি রচিত হয়েছে। এ কারণেই আমি সেমিনারের শিরোনামকে সম্প্রসারিত করাকে যথার্থ বলে মনে করি।
না, আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শান্তির প্রশ্নটিকে সরলীকরণ করে দেখছি না। যুদ্ধাবস্থা/গৃহযুদ্ধের অবসান এবং পার্বত্য অঞ্চলে সংবিধানের আওতায় স্বশাসনের একটা ঐতিহ্য গড়ে উঠলেও, বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে এখনও পাহাড়ে অনাকাক্সিক্ষত সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটছে। দ্বিতীয়ত; পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষাক্ষেত্রে এবং জনগণের জীবনমানের দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হওয়া সত্ত্বেও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টির পরিকল্পিত অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি। আমি বিষয়টির এই জটিলতা তথা ডায়নামিকসকে বিবেচনায় রেখেই শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন এবং অসম্পূর্ণ করণীয় সম্পর্কে আলোপাত করব।
 
ঐতিহাসিক পটভূমি
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তির প্রশ্নটি কোনো একাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়। এটি একটি বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যার রয়েছে ঐতিহাসিক পটভূমি এবং রক্তাক্ত ইতিহাস। এ কথা আমরা সবাই জানি, পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা আকস্মিকভাবে দেখা দেয়নি। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের নৃতাত্ত্বিক, ভাষা ও সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জীবনধারা বাংলাদেশের সমভূমি অঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মতো নয়। তাদের সমস্যার প্রকৃতিও আলাদা। আমি প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস সম্পর্কে বলছি না। মনে রাখতে হবে, ১৭৫৭ সালে পলাশীর পরাজয়ের পরপরই কিন্তু পুরো বাংলা ইংরাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রত্যক্ষ শাসনাধীন হয়নি। তবে পলাশী যুদ্ধের পর মীরজাফরকে হটিয়ে বাংলার নবাবী দখল করেন মীরকাশিম। তার ক্ষমতা দখলে ইংরেজরা সহায়তা করায় ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর মীরকাশিম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে উপহার হিসেবে চট্টগ্রাম দান করে। বস্তুত; ১৭৬০ থেকেই চট্টগ্রাম (পার্বত্য চট্টগ্রামসহ) ইংরেজ কোম্পানির প্রত্যক্ষ শাসনাধীন হয়। ১০০ বছর শাসনের পর ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসকরা চট্টগ্রামকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম তখন থেকে স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে। তবে লুসাই পাহাড় ইংরেজ অধিকারে আসার পর ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে জেলার মর্যাদা থেকে মহকুমায় নামিয়ে আনা হয়। ১৯০০ সালে পুনরায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মর্যাদা ফিরে পায়।
১৮৮১ সালের ১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে ৩টি সার্কেলে চাকমা, মোং ও বোমং সার্কেলে বিভক্ত করে। পরবর্তীকালে প্রতিটি সার্কেলকে অনেকগুলো মৌজায় ভাগ করা হয়।
১৮৮১ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ফ্রন্টিয়ার পুলিশ অ্যাক্ট’ চালু করে পাহাড়িদের সমন্বয়ে স্বতন্ত্র স্থানীয় পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হয়।
১৯০০ সালের ১ মে ব্রিটিশ সরকার বহুল পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ (Chittagong Hill Tracts Regulation 1900 Act) জারি করে। পরবর্তীকালে বহুবার এই আইন সংশোধিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের অন্তর্নিহিত কতিপয় ধারা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য চরম অবমাননাকর ও প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি নেতৃবৃন্দ কিন্তু ওই এলাকার ভূমিতে তাদের অধিকারসহ পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলোর সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণে ১৯০০ সালের শাসনবিধিকে রক্ষাকবচ হিসেবে মনে করেন।
১৯০০ সালের আইন ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের সাথে সংগতিপূর্ণ করে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। ১৯০০ সালের আইন সংশোধিত হলেও এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠীকে সমতলের জাতীয় সংগ্রামের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হলেও এই আইন পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-উপজাতীয়দের অভিবাসনের প্রবল স্রোতকে বহুলাংশে রোধ করতে সক্ষম হয়।
 
পাকিস্তান আমল
পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে গত শতাব্দীর গোড়া থেকেই স্বাতন্ত্র্যবোধের চেতনা সাংগঠনিক রূপ নিতে থাকে। দেশভাগ ও রেডক্লিফ রোয়েদাদের ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে দেশভাগের আগে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী চাকমা রাজা ও উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। স্মর্তব্য যে, এই চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় ও মারমা রাজাসহ উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের অনেকেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেন। যদিও ‘ত্রিপুরা’ উপজাতি ও মানিকছড়ির মোং প্রু সাইন চৌধুরীসহ অনেক উপজাতীয় তরুণ এবং নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে।
চাকমা ও উপজাতীয়দের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে দুই সামরিক শাসক শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করে।
পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক, চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন জেনারেল আইউব খান উপজাতীয়দের পাকিস্তান থেকে বিতাড়নের গোপন অভিলাষে ১৯৫৮ সালে কাপ্তাই বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেয়। কৃত্রিমভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল এলাকায় বাঁধ দিয়ে জলাধার বা লেক তৈরি করা হয়। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়ার পরিণতিতে ১ লাখ পাহাড়ি মানুষ বাস্তুভিটা ও জমিহারা হয়ে পড়ে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট চাষযোগ্য জমির ৫৬.০৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৪ হাজার একর জমি পানিতে তলিয়ে যায়। পুরনো রাঙ্গামাটি শহর চিরদিনের মতো কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ডুবে যায়। ৫৪ হাজার একর প্রথম শ্রেণির জমির পরিবর্তে উদ্বাস্তুদের বনাঞ্চল থেকে ১ হাজার একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। বিপুল সংখ্যক (প্রায় লক্ষাধিক) চাকমা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এমন কী আইউব খাঁ পার্বত্য চট্টগ্রামের (১৯০০ সালের আইনে) উপজাতীয় এলাকার মর্যাদাটুকু ছিনিয়ে নেয় ১৯৬৩ সালে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অভিবাসন শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে যেখানে উপজাতি ও অ-উপজাতি জনসংখ্যার অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৯৭ শতাংশ ও অনূর্ধ্ব ৩ শতাংশ, ১৯৭০ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮৫ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ।
স্বাধীনতাত্তোর কালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্রিদিব রায়কে পদচ্যুত করে দেবাশীষ রায়কে চাকমা রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি চাকমা, ম্রোং-সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে জাতীয় মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। কোনোরকম প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা থেকে বাঙালিদের বিরত করেন।
পক্ষান্তরে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা, তাদের ভূমি দখল, স্বশাসনের আকাক্সক্ষা প্রভৃতি ইস্যুকে পুঁজি করে ১৯৭৩-এ সংসদ সদস্য নির্বাচিত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা মাওবাদী ভাবাদর্শে প্রভাবিত হয়ে ‘জু¤œ জাতীয়তাবাদের’ সেøাগান তোলেন। ১৯৭২ সালে তিনি জনসংহতি সমিতি নামে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালে গঠিত হয় জনসংহতি সমিতির সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী।
জনসংহতি সমিতিকে আত্মঘাতী হানাহানি ও রক্তপাতের পথ থেকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। এমএন রায় বঙ্গবন্ধু গঠিত বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি সফরে গিয়ে সর্বপ্রথম উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে ‘জাতীয় সংখ্যালঘু’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার তাদের সংস্কৃতি, জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনধারাকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।
 
অশান্তির জনক জিয়াউর রহমান
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের দৃশ্যপট বদলে যায়। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান তার পূর্বতন প্রভু আইউব খানের ইসলামি ভাবাদর্শ এবং প্রতিহিংসা পরায়ণতা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হন। পার্বত্য সমস্যার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পথে না গিয়ে সামরিক শক্তি দিয়ে এবং একইসঙ্গে জাতিগত সংকীর্ণতা দিয়ে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর কণ্ঠরোধ করার পথ গ্রহণ করেন। একদিকে সেনাবাহিনীকে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর কায়দায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে দমন করার কাজে ব্যবহার, অন্যদিকে সমতল থেকে লাখ লাখ বাঙালিকে পার্বত্য অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে এনে জবরদস্তি করে উপজাতীয়দের জমি-ভিটেমাটি থেকে উৎখাত এবং অ-উপজাতীয়দের বসতি গড়ে তোলেন। ‘১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে এক গোপন বৈঠকে ৩০ হাজার বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য অঞ্চলে পুনর্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এর জন্য ৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ১৯৮১ সালে ১ লাখ বাঙালি পরিবারকে ৫ একর জমি ও নগদ ৩ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত বাঙালির সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষাধিক। ১৯৭৪ সালে পাহাড়ি-বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত যেখানে যথাক্রমে ৭৩ শতাংশ এবং ২৪ শতাংশ ছিল, ১৯৮১ সেই অনুপাত এসে দাঁড়ায় ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশে। জিয়াউর রহমানের এই নীতি পাহাড়ি বাঙালিদের মধ্যে সংখ্যাগত ভারসাম্য আনতে সক্ষম হলেও পাহাড়িদের সশস্ত্র আন্দোলন বা ইনসার্জেন্সি বন্ধ করতে পারেনি। বরং তা আরও ব্যাপক ও তীব্র করে তোলে।’ [জুম পাহাড়ে শান্তির ঝরণাধারা : ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, সম্পাদক নূহ-উল-আলম লেনিন, পৃ. ৩৫]
এই ছিল পাহাড়ে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি এবং শান্তিবাহিনী কর্তৃক ‘শান্তি’ বিনষ্টের প্রেক্ষাপট। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর, এমএন লারমা আত্মগোপনে চলে যান। সেনাশাসকরা জাতিগত নিপীড়নের এবং সামরিক সমাধানের পথ গ্রহণ করে। জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীও সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। দুই দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনবরত রক্তক্ষরণ হতে থাকে। বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকাজুড়ে ইনসার্জেন্সি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। যুদ্ধাবস্থা ও গৃহযুদ্ধের ফলে ৬৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশের নাগরিক, চাকমা শরণার্থী ভারতের ত্রিপুরায় আশ্রয় গ্রহণ করে। ২০ বছরব্যাপী এই সহিংসতায় প্রতিদিন বাংলাদেশের ১ কোটি টাকা ব্যয় হতে থাকে। সশস্ত্র সংঘাতে বাঙালি, উপজাতীয়, সেনা সদস্য ও শান্তিবাহিনীর সম্মিলিত নিহত ও আহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। লাখ লাখ টাকার সম্পদ ধ্বংস হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিণত হয় মৃত্যু উপত্যকায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়।
 
জননেত্রী শেখ হাসিনার শান্তি উদ্যোগ : শান্তিচুক্তি সম্পাদন
১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের ঘোষণা দেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার দেড় বছরের মাথায় সম্পাদিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই চুক্তি বিপুল প্রশংসা অর্জন করে। জননেত্রী শেখ হাসিনা শান্তি স্থাপনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করায় ইউনেস্কো জাতিসংঘের সবচেয়ে সম্মানজনক ‘হুফে বয়েনি’ পিস অ্যাওয়ার্ডে তাকে ভূষিত করে। দীর্ঘ দুই দশকের রক্তপাতের অবসান হয়। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র যোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। শান্তিবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়। ভারতে আশ্রিত ৬৪ হাজার শরণার্থী মাতৃভূমিতে ফিরে আসে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য শান্তিচুক্তির অঙ্গীকার মোতাবেক পরিবার পিছু ৫০ হাজার নগদ টাকা এবং ঘরবাড়ির ব্যবস্থা করা হয়।
প্রসঙ্গত একটা কথা স্মর্তব্য। নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি, সে সময়ের বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের মিত্র জামাতসহ সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কী ধরনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে এ কথাও বলেছিলেন যে, ‘শান্তিচুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের দখলে চলে যাবে।’ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর শান্তিবাহিনীর প্রথম আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পণের দিনটিতেও বিএনপি-জামাত জোট পার্বত্য চট্টগ্রামে হরতাল আহ্বান করেছিল। পার্বত্য অঞ্চলে অভিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত উগ্রতার দিকে ঠেলে দিয়ে তারা পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখনও এই অপশক্তি পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য গোপনে ও প্রকাশ্যে বহুমুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
 
শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে অর্জিত সাফল্য
শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর দুই দশক পেরিয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে শান্তিচুক্তি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে। শান্তিচুক্তি সম্পাদনের এই প্রায় ২১ বছরের মধ্যে বিএনপি-জামাত জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থেকেছে প্রায় সাড়ে সাত বছর। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল সাড়ে তিন বছর। ২০০১ সালের অক্টোবরে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পাঁচ বছর বিএনপি-জামাত জোট ও ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাত বছর ক্ষমতায় ছিল। স্বভাবতই এই দুটি সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহী ছিল না। ফলে ২১ বছরের সাড়ে সাত বছরই জাতীয় জীবন থেকে অপচিত হয়। শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়।
এই অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও এখন নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, শতভাগ না হলেও শান্তিচুক্তির সিংহভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। সাধারণভাবে পাহাড়ে শান্তি বিরাজ করছে। যুদ্ধ, হিংসা ও রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক এবং ৯টি ধারা বাস্তবায়নাধীন আছে।’ শান্তিচুক্তির একটি প্রধান শর্ত ছিল শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ এবং অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া। শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করেছে বটে, তবে জনসংহতি সমিতির একাংশের বিরোধিতা এবং তাদের মধ্যে ইউপিডিএফ নামে নতুন সশস্ত্র গ্রুপের উত্থানের ফলে কিছু কিছু সন্ত্রাসীর হাতে অস্ত্র রয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘২৫২টি অস্থায়ী ক্যাম্পের মধ্যে গত ১৭ বছরে ২৩৮টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকিগুলোও ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান ইস্যু হচ্ছে ভূমি সমস্যার সমাধান। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৯ থেকে এ পর্যন্ত ৫টি ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে। গভীর জটিল এবং স্পর্শকাতর এই ভূমি সমস্যার সমাধানে অপ্রত্যাশিতভাবে বেশ সময় লাগছে। পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি মালিকানার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, কৃষিব্যবস্থা এবং সমাজ সংগঠনের স্বরূপ অনুধাবন করতে না পারলে এই সমস্যার জট সকলের বোধগম্য হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঔপনিবেশিক যুগে বলা হতো খধহফ ড়ভ এড়ফ। সমতলের মতো পাহাড়ে যেমন কোনো ভূমি জরিপ এবং জমির মালিখানার রেকর্ড হয়নি, তেমনি জুমচাষে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীর ঘন ঘন চাষাবাদ এলাকা ও বসতি পরিবর্তনের ফলে স্থায়ী ভূমি মালিকানার ধারণাটিও সেখানে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং ভূমির ওপর ব্যক্তিগত স্বত্বের পরিবর্তে পার্বত্য অঞ্চলে গোত্রীয় বা কমিউনিটি মালিকানার একটি প্রাক-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
কিন্তু কালের বিবর্তনে বর্তমানে এই প্রিমিটিভ ব্যবস্থাটি সমকালীন বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। চুক্তির একটি বড় অনুষঙ্গ হচ্ছে, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে পার্বত্য অঞ্চলের জমির ওপর ভূমিপুত্রদের ব্যক্তিগত-পারিবারিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করা। এ উদ্দেশ্যে প্রণীত হয় ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১’। ইতোমধ্যে সকল পক্ষের সম্মতিতে এই আইনের কতিপয় সংশোধনীও গৃহীত হয়েছে। আইনটি এখন ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধিত) আইন-২০১৬’ বলে অভিহিত হবে। এখন এই আইনের ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক বিধিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। ভূমির ওপর স্থানীয় উপজাতীয় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভূমি জরিপের কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ এবং ৩টি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদসমূহের হাতে চুক্তি মোতাবেক স্থিরিকৃত বিষয়াবলী হন্তান্তর করা হয়েছে এবং হচ্ছে। চুক্তির অঙ্গীকার অনুযায়ী ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের মতো পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের অধীনে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভূমি, বন ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়াবলিও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের কাছে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আশা করা যায়, উল্লিখিত বিষয়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মনে আস্থার সংকট থাকবে না।
অনেক আগেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে। একজন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। এই পদক্ষেপ সংবিধানের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ কমিটি করে দিয়েছেন।
গত দুই দশকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিপুল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলছে। তিন পার্বত্য জেলায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্গম পার্বত্য এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণ, তিন জেলায় তথ্যপ্রযুক্তির (মোবাইল ফোন) ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি, রাঙ্গামাটিতে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা, ১৭৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সংস্কার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষি পণ্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার, পর্যটন শিল্পের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি, বিভিন্ন নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা সংরক্ষণের উদ্যোগসহ বহুমুখী উন্নয়নমূলক কর্মকা- এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের জন্য কোটা সংরক্ষণের ফলে ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন স্তরে, উচ্চপদে উপজাতীয়গণ নিয়োগ পাচ্ছেন।
পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জাতিসত্তাগত সাংবিধানিক স্বীকৃতি, বাংলাদেশে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধন এবং ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” পূর্বে ধারণা ছিল ইউনিটারি রাষ্ট্রব্যবস্থায় উপজাতি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার এই ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন করেছেন।
 
aaকতিপয় প্রতিবন্ধকতা ও করণীয় প্রসঙ্গে
এতসব অগ্রগতি ও সাফল্যের পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ নয়, ভুক্তভোগী সকলেই তা অবগত আছেন। আজকের সেমিনারে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে প্রতিবন্ধকতা ও করণীয় সম্পর্কের বিষয়টি ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে আনা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার ধারণাসমূহ ইতোমধ্যে আমি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামে মূলগতভাবে শান্তি স্থাপিত হয়েছে, যুদ্ধাবস্থার অবসান এবং রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত এবং অগ্রগতির ধারা অব্যাহত আছে। কিন্তু তারপরও শান্তি, সম্প্রীতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু প্রতিবন্ধকতার প্রশ্নটি অবান্তর নয়।
প্রথমত; শান্তির কথাই ধরা যাক। ২১ বছর আগে পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি এবং রক্তপাতের জন্য দুটি প্রতিপক্ষ ছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও জনসংহতি সমিতির সামরিক উইং শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের ভেতর দিয়ে এখন আর ইনসার্জেন্সি যেমন নেই, তেমনি রাষ্ট্র ও পার্বত্য জনগোষ্ঠী আর পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় জনসংহতি সমিতি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র কার্যত একপক্ষে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তারপরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষত খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলায় বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে কিছু সহিংস ঘটনা ঘটেছে। তবে সহিংসতা রাষ্ট্র বনাম অন্যদের মধ্যে নয়। সহিংসতার কারণ জনসংহতি সমিতির যে অংশটি অস্ত্র পরিত্যাগ করেনি তারা এবং ইউপিডিএফ নামক বিভ্রান্ত ও বৈরী গোষ্ঠীটির সন্ত্রাসী কর্মকা-। এই সংঘাতও মূলত নিজেদের মধ্যে। এখানে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সেনাবাহিনী কারও প্রতিপক্ষ নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর পরস্পরবিরোধী অংশের এই অন্তর্দলীয় সহিংস তৎপরতা এবং শান্তি বিঘিœত করার অপচেষ্টার দায় কার? পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ, শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এ ব্যাপারে জনসংহতি সমিতি ও অন্যান্য আঞ্চলিক দলকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা, অস্ত্র ও সহিংসতা পরিহার এবং শান্তিচুক্তির প্রতি শর্তহীন আনুগত্যই পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী ও টেকসই শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত; আমরা এ কথাও বিস্মৃত হই না যে, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন ব্যাহত করার মতো উসকানিদাতার অভাব আছে। অ-উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি কৃত্রিম দরদ দেখাতে গিয়ে বিএনপি-জামাত জোট ও উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো যে এখানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে না, এ কথা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। এ ব্যাপারে অভিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত ও প্ররোচিত করার সকল অপচেষ্টাকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং তাদের মধ্যে সম্প্রীতির মনোভাব গড়ে তোলার জন্য একদিকে সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং অন্যদিকে উপজাতীয় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
তৃতীয়ত; আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দেশের বাইরে থেকেও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো খোদ উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ভিতরে সহিংসতার উসকানি দিতে পারে। বাইরে থেকে অস্ত্র-অর্থ দিয়ে তারা উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এবং অ-উপজাতীয়দের ভেতরে সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে তোলা, সংঘাতে প্ররোচিত করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণœ এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরোধী তৎপরতা চালাতে পারে। এদের ব্যাপারে সবাইকে সমভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
চতুর্থত; শান্তিচুক্তির অবশিষ্ট ধারাগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও আস্থার সংকট দূর করতে না পারলে, যে ‘ক্ষত’ সৃষ্টি হয়েছে, তা সারানো যাবে না। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী বাস্তবায়নাধীন ও প্রক্রিয়াধীন ১৫ + ৯টি ধারার সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে।
বস্তুত; ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রশ্নটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানই হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মর্মবাণী।
পঞ্চমত; পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে আরও সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী অবশিষ্ট যে বিষয়গুলো পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের হাতে ন্যস্ত করার কথা, তা সম্পন্ন করা হলে এ নিয়ে অহেতুক অসন্তোষ ছড়ানো এবং আস্থাহীনতা সৃষ্টির প্রয়াস বন্ধ হবে। মনে রাখতে হবে, সমস্যা জিইয়ে রাখলে আখেরে তা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।
এই ৫টি মূল করণীয় ছাড়াও আরও কিছু ছোটখাটো সমস্যা আছে যেগুলোর সমাধান শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সহায়ক হবে।
 
শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে সহায়ক আরও কিছু পদক্ষেপ
ক. পার্বত্য অঞ্চলে চাষাবাদ, বাগান সৃষ্টি ও শিল্পের নামে একদল ভূমিদস্যু সরকারের খাসজমি এবং উপজাতীয় জনগণের বসতভিটা ও জমি দখল করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবেও জানি অবৈধ দখলদাররা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে উপজাতীয়দের জমি-ঘরবাড়ি গ্রাস করছে। ফলে অনেকেই দেশান্তরি হচ্ছে। এই বে-আইনি অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
খ. পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আচরণ এবং সরকারের নীতি বাস্তবায়নে তাদের সততা ও দক্ষতা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। বহিরাগত ঔপনিবেশিক শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের হৃদয়-মন জয় করা যাবে না। বরং মনে রাখা দরকার উপজাতি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষগুলো এ দেশেরই মানুষ, আমরা তাদের প্রভু নই। তাদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে পারলে অনেক কাজ সহজ হয়ে যাবে।
গ. পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বহুপাক্ষিক অথরিটি বা কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব, সমস্যার সৃষ্টি করে। পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সেনা কর্তৃপক্ষ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন পরিষদÑ প্রভৃতির মধ্যে কাজের সমন্বয় থাকা অপরিহার্য।
ঘ. পাবর্ত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র উন্নয়ন বোর্ড আছে। তবে পর্যটন শিল্পসহ এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা একসময় আলোচিত হয়েছে। আমি সম্যক জানি না, এ ব্যাপারে আলাদা কোনো অগ্রগতি আছে কি নেই।
ঙ. কর্ণফুলি পেপার মিলটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সাথে এটি জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই পেপার মিলটি পুনরায় চালু করতে পারলে একদিকে যেমন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে আমাদের সংবাদপত্র শিল্প ও পুস্তক শিল্পের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। একইসঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলে বন-সংরক্ষণ ও বনায়নের ধারা বেগবান করতে হবে।
চ. পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’-এর একটি শাখা পার্বত্য অঞ্চলে স্থাপন করা যেতে পারে। অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব মৌখিক ভাষা থাকলেও তাদের বর্ণমালা নেই। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মতামত ও পছন্দের ভিত্তিতে লিপি বা বর্ণমালা প্রচলন, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা এবং তাদের জীবনধারার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণÑ সামগ্রিকভাবে পাহাড়িদের মধ্যে বাংলাদেশের মূলধারার জনগণের সাথে সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও সংহতিবোধ বাড়াতে সহায়ক হবে।
ছ. পার্বত্য জনগণের জীবনধারা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস, লোক সংস্কৃতি এবং তাদের আধুনিক জীবনধারায় উত্তরণের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
 
‘সবার উপরে মানুষ সত্য’
শেষ করতে চাই এ কথা বলে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনি উপজাতীয়, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠীও বাংলাদেশের অবিচ্ছিন্ন মানবসত্তা। আমাদের সংবিধানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ‘মানবসত্তাকে সর্বোচ্চ’ স্থান দেওয়া হয়েছে। বাঙালি জাতি তার ঐতিহ্যগত ধর্ম সহিষ্ণুতা, সংশ্লেষণের ধারা এবং ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’Ñ এই বোধ থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থপূর্ণ মেলবন্ধন রচনা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একইভাবে বাংলাদেশের বড়-ছোট সকল জাতিসত্তা, সকল ধর্মানুসারী এবং সংস্কৃতির মানুষ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে গড়ে তুলবেÑ এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।
(উত্তরণ/আইস)



নতুন আর্জেন্টিনা পুরনো ব্রাজিল

  সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৮     ৭৮০৭

যমজ লাল্টু-পল্টুর দাম ২০ লাখ

  আগস্ট ১২, ২০১৮     ৪৫৪৩

রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের সূচি

  জুন ০৬, ২০১৮     ৪২৩৩

পুরনো খবর