পালিয়ে ভারতে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদ     খুনি মাজেদের দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী     নারায়ণগঞ্জের পর গাজীপুর জেলা লকডাউন     করোনায় আক্রান্তদের বহনে প্রস্তুত বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার     আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে মাজেদের ফাঁসি কার্যকর : আইনমন্ত্রী     আইজিপি হচ্ছেন বেনজীর, র‌্যাবের ডিজি মামুন     মুজিববর্ষেই বাকি চার খুনিকেও ফেরত আনার আশা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর     দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে    

অসহযোগ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

  মার্চ ০৮, ২০২০     ৬৯     ১৯:০৯     প্রবন্ধ
--

অজয় দাশগুপ্ত: মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী ১৯২০ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন। এ বছরেই জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অসহযোগ কর্মসূচির সফল প্রয়োগ করেছিলেন ১৯৭১ সালে। কাকতালীয় হতে পারে আরও একটি তথ্য- মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগিতার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন ৫১ বছর বয়সে। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই অনন্য ঘোষণাও দিয়েছিলেন ৫১ বছর বয়সেই। সশস্ত্র সংগ্রামের পথ অনুসরণের প্রথম ধাপে তিনি উপস্থাপন করেছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি, যা ছিল সর্বাত্মক ও শান্তিপূর্ণ।
বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে মহাত্মা গান্ধী প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘সত্যিই ভদ্রলোক জাদু জানতেন।’ [পৃষ্ঠা-৮১]
বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গেও নির্দ্বিধায় বলা চলে, তিনি কেবল ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ নন- বাঙালিরা তার কথা শুনত মুগ্ধ হয়ে, যেন জাদুর সোনার কাঠির স্পর্শ মিলেছে। তিনি সাত কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন। সংকল্পবদ্ধ করেছেন। তারা শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি সর্বাত্মক সফল করেছিল। আবার যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে সম্মুখ রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় এলো, তখনও বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছিল না। ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক’- এমনটিই বাস্তবে ঘটেছিল। আর এটাই মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা-কৌশলে মৌলিক পার্থক্য টেনে দেয়। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনে প্রকৃত অর্থেই আসমুদ্রহিমাচলের কোটি কোটি নারী-পুরুষ-শিশু শামিল হয়ে যায়। কেঁপে ওঠে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত। কিন্তু ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশ রাজ্যের চৌরিচেরায় পুলিশ-জনতার সংঘর্ষের জেরে মহাত্মা গান্ধী ১২ ফেব্রুয়ারি এ আন্দোলন আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করে নেন। ব্রিটিশ শাসকদের নির্দেশে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গুলি করে হত্যার প্রত্যাঘাতে ক্ষুব্ধ জনতার থানায় হামলা চালানোর ঘটনা তিনি মেনে নিতে পারেননি। যে কোনো মূল্যে স্বাধীনতা আন্দোলন শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে- এটাই ছিল তার সংকল্প। একই কারণে নেতাজী সুভাষ বসু ও মাস্টারদা সূর্যসেনের সশস্ত্র সংগ্রামের কৌশলও তার অনুমোদন পায়নি। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ‘সংলাপ’-এ বসতে যেমন দ্বিধা করেননি, তেমনি ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর খবর নিশ্চিত হয়েই পূর্ব নির্ধারিত বার্তা প্রেরণ করেন সর্বত্র-‘দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান।… পবিত্র মাতৃভ‚মি থেকে শেষ শক্রকে বিতাড়িত করুন।’ শান্তিপূর্ণ অসহযোগ থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম, যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন তিনি।
মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাতে প্যাসিভ রেজিট্যান্স বা ‘অক্রিয় প্রতিরোধের পথ’ বেছে নিয়েছিলেন। নিষ্ঠুর শাসকদের বিরোধিতায় তিনি সক্রিয় পন্থা অনুসরণ করেননি। বরং শাসকদের নির্দেশ, আইন ইত্যাদি অমান্য করার পথ গ্রহণ করেন। বাস্তবে এ কৌশল খুবই কার্যকর প্রমাণিত হয়। জনগণ আরও বেশি বেশি করে আন্দোলনে শামিল হয়ে যায়। তিনি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে স্বাধীনতার সংগ্রামে ধাপে ধাপে সংগঠিত করার লক্ষ্যে বহু ধরনের কর্মপন্থা গ্রহণ করেন। জনগণের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য হয়। সে-সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশও আমরা স্মরণ করতে পারি। ১৯১৯ সালের ১৮ মার্চ ব্রিটিশ সরকার বিচারপতি সিডনি রাওলাটের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সুপারিশ অনুসারে চরম নিপীড়নমূলক আইন জারি করে। রাওলাট অ্যাক্ট নামে পরিচিত এ আইন বলে ভারতবর্ষের যে কোনো লোককে গ্রেফতার ও যত দিন খুশি আটক রাখা, গোপন বিচার অনুষ্ঠান, সংবাদপত্র ও বাগ্-স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি ক্ষমতা শাসকদের প্রদান করা হয়। মহাত্মা গান্ধী এ আইনের প্রতিবাদে ভারতবর্ষ জুড়ে হরতাল আহ্বান করেন ৩০ মার্চ। পরে নতুন তারিখ নির্ধারিত হয় ৬ এপ্রিল। ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের জালিওয়ানাবাগে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ-মিলিটারি গুলি চালিয়ে গণহত্যা সংঘটিত করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নাইট উপাধি পরিত্যাগ করেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে রাজপথের সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং পদযাত্রার প্রস্তাবও করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারতবাসী কতটা সংকল্পবদ্ধ, এ ঘটনায় তার প্রমাণ মেলে। রাওলাট অ্যাক্ট জারি ও জালিয়ানাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদের মহাত্মা গান্ধী ১৯২০ সালের ১ আগস্ট থেকে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতার আহ্বান জানান। একই সময়ে ভারতবর্ষের মুসলিম নেতৃত্বের আহ্বান খিলাফত আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল। তুরস্কে খিলাফত পুনর্বহালের দাবিতে পরিচালিত এ আন্দোলনের প্রতি মহাত্মা গান্ধী সমর্থন জানান। বিনিময়ে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সমর্থন মেলে। আন্দোলনের প্রভাবে একে একে ব্রিটিশ সরকারি অফিস ও কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। ভারতীয়দের সরকারি স্কুল ও সরকারি চাকরি ত্যাগে উৎসাহিত করা হয় এবং তাতে বিপুল সাড়া মেলে। অনেকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। আইনজীবীরা আদালত বর্জন করেন। বিদেশি পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী বর্জন করা হয়। চালু হয় স্বদেশি খাদি কাপড়। মাত্র এক বছরে বিদেশি কাপড় আমদানি ১০২ কোটি টাকা থেকে ৫৭ কোটি টাকায় নেমে আসে। শাসকদের দেওয়া ‘রায় বাহাদুর-খান বাহাদুর’ এবং আরও অনেক ধরনের খেতাব বর্জনের আহ্বানও সফল হয়।
মহাত্মা গান্ধী সে-সময়ে ছিলেন কংগ্রেস দলের সভাপতি। দলকে সংগঠিত করার কাজেও তিনি মনোযোগ দেন। কংগ্রেসের সদস্যপদ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক দল সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে। অনেক স্থানে খাজনা-ট্যাক্স প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ আন্দোলনে নারী সমাজ বিপুলভাবে অংশগ্রহণ করে। তরুণ-যুবারাও দলে দলে শামিল হয়।
আন্দোলনের তীব্রতা ছিল অভাবনীয়। এর আগে আর কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ভারতবাসীকে এক সূত্রে গাঁথতে পারেনি। শহর-বন্দর-গ্রাম, সর্বত্র মানুষের জাগরণ স্বাধীনতার জন্য। ব্রিটিশ শাসনের মেরুদন্ড ভেঙে পড়ছিল। চৌরিচেরার সহিংস ঘটনার পর মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন। এরপরও তাকে গ্রেফতার করে দুই বছর কারাদন্ড প্রদান করা হয়। কংগ্রেস দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীও কারাগারে। তরুণ-সমাজ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি আস্থা রাখতে পারছিল না। কিন্তু অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের কৌশলের প্রতি মহাত্মা গান্ধীর আস্থায় বিন্দুমাত্র চির ধরেনি। তিনি নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ১৯৩০ সালে সামনে আসে নতুন ইস্যু- লবণ-কর। ভারতীয়রা লবণ উৎপাদন ও বিপণন করলে বাড়তি শুল্ক দিতে হবে, ব্রিটিশ শাসকদের এ আইনের তীব্র প্রতিবাদ করেন তিনি। কংগ্রেস শুরু করে লবণ-আইন অমান্য আন্দোলন। মহাত্মা গান্ধী গুজরাট রাজ্যের সবরমতি আশ্রম থেকে সমুদ্র উপকূলে পায়ে হেঁটে রওনা হলে দলে দলে নারী-পুরুষ তাতে সাড়া দেন। গোটা দেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। লবণ সত্যাগ্রহ বা ডান্ডি মার্চ শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালের ৩০ মার্চ। এটা ছিল ব্রিটিশ সরকারের লবণ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। ২৪ দিনের এ মার্চ শুরু হয় ৭৮ জন বিশ্বস্ত স্বেচ্ছাসেবককে সঙ্গে নিয়ে। ৩৮৪ কিলোমিটারের এ যাত্রা যতই ডান্ডির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, অংশগ্রহণকারী বাড়তে থাকে। ১৯৩০ সালের ৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৬টায় মহাত্মা গান্ধী যখন লবণ আইন ভাঙেন, গোটা দেশ ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় লবণ আইনের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। আন্দোলনে শামিল হয়ে যায় কোটি কোটি ভারতবাসী। আইন লঙ্ঘন করে মহাত্মা গান্ধী এগিয়ে চলেন সমুদ্র উপক‚ল ধরে। তাকে ৪ মে মধ্যরাতে গ্রেফতার করা হয়। বিশ্বব্যাপী তার গ্রেফতারের খবরের পাশাপাশি লবণ সত্যাগ্রহ ও ব্রিটিশ সরকারের লবণ আইন নিয়ে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। এ আন্দোলনে ৬০ হাজারের বেশি ভারতীয় গ্রেফতার বরণ করেছিলেন।
মহাত্মা গান্ধীর পরবর্তী সাড়া জাগানো আন্দোলন ছিল ভারত ছাড় বা কুইট ইন্ডিয়া। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। তিনি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পাশে দাঁড়ানোর পূর্বশর্ত হিসেবে দাবি করলেন ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা। ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট কংগ্রেসের মুম্বাই অধিবেশনে ‘ডু অর ডাই’ স্লোগান তোলেন। ব্রিটিশ সরকার দ্রুতই দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কংগ্রেসের গোটা নেতৃত্বকে জেলে পাঠানো হয় এবং তাদের বেশিরভাগ আটক থাকেন ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে বিশ্বযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। ব্রিটিশ সরকারের এ নিষ্ঠুর পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন দিয়েছিল কিছু সংখ্যক ভারতীয়কে নিয়ে গঠিত ভাইসরয় কাউন্সিল, মহম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার সমর্থক ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অনেক সদস্য। একদল ভারতীয় ব্যবসায়ীও ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে দাঁড়ায়। কারণ যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে তাদের ধনসম্পদ রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠছিল।
ব্রিটিশ শাসকরা দমননীতি চালিয়ে ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন সাময়িকভাবে দমন করতে পারে। কিন্তু উপনিবেশিক শাসকরা বুঝতে পারে- ভারতবর্ষকে দামিয়ে রাখা যাবে না।
জনসম্পৃক্ততা : মহাত্মা গান্ধী প্রতিটি আন্দোলনেই সচেষ্ট ছিলেন যত বেশি সম্ভব মানুষকে অংশগ্রহণ করাতে। নারী-পুরুষ-শিশু, অচ্ছুৎ হিসেবে অবহেলিত জনগোষ্ঠী, ছাত্রছাত্রী-তরুণ-যুবক- সকলকে তিনি আন্দোলনে শামিল করতে পেরেছেন। স্বাধীনতার জন্য প্রকৃত অর্থেই তিনি সৃষ্টি করতে পারেন গণজাগরণ। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি অসহযোগ ও শান্তিপূর্ণ আইন অমান্য আন্দোলনে তার লক্ষ্য ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- স্বাধীন দেশের জন্য অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি। বিদেশি পণ্য বর্জনের পাশাপাশি তিনি স্বদেশি পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ দেন। ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জনের সমান্তরালভাবে গড়ে উঠতে থাকে স্বদেশি বিদ্যালয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দুটি পর্যায় সম্পর্কে জেনেছেন মূলত ইতিহাস পাঠ থেকে। কিন্তু ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন ঘটেছে তার চোখের সামনে। কোটি কোটি নারী-পুরুষকে স্বাধীনতা আন্দোলনে শামিল করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। তখন তিনি কলিকাতায় ইসলামিয়া কলেজে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছেন। ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে জড়িত। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ নেতাকে আদর্শ মানেন। সে-সময়ের ইসলামিয়া কলেজকেন্দ্রিক মুসলিম ছাত্র-আন্দোলনে তিনিই ছিলেন পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ। রাজনীতির অঙ্গনেও সক্রিয়। ২৫-২৬ বছর বয়স হতে না হতেই অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ কমিটিতে সম্পাদকের পদের জন্য তার নাম বিবেচিত হয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে অনেকটা অপরিচিত পরিবেশের শহর ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে। নতুন পরিবেশে ছাত্রদের মধ্যে নিজের শক্ত অবস্থান করে নিতে তার সময় লাগেনি। ঢাকায় আসার কয়েক দিন যেতে না যেতেই তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন, যে সংগঠনটি মাত্র দুই মাসের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ডাকা ছাত্র ধর্মঘট ও হরতাল (১১ মার্চ ১৯৪৮) সফল করে তোলায় ছিল সামনের সারিতে। হরতালে পিকেটিং করার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। এক বছর পর তিনি ফের কারাগারে। এবারে অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিম্নবেতনভুক কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন। কেবল কারাগারে প্রেরণ নয়, তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। এ সম্মান ফিরে পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ-এর অভ্যুদয় পর্যন্ত। এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহান সংগ্রামে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার ছাত্রত্ব কেড়ে নিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও তাদের নির্বাচিত ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এ সংগ্রামে পালন করে অনন্যসাধারণ ভূমিকা। বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এবং এ পতাকা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আত্মদান করে এ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০০ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মচারী-কর্মকর্তা। এও যে অনন্য মর্যাদা।
বঙ্গবন্ধু মাত্র ২৯ বছর বয়সে আওয়ামী মুসলিম লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারি বা যুগ্ম সম্পাদক। তখন তিনি কারাগারে। মুক্তি পেতে না পেতেই নতুন মিশন- পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে, পশ্চিম পাকিস্তানের সমমনা গণতান্ত্রিক শক্তিকেও তাতে শামিল করে পাকিস্তানভিত্তিক একক রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। এ মিশন নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নির্দেশে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তান। তিনি এ দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসার পর তার স্থান হয় কারাগারে- একটানা প্রায় আড়াই বছর। এ-সময়ের মধ্যেই ২১ ফেব্রুয়ারির অমর গাঁথা রচিত হয়ে গেছে। কারাগারে কিংবা মাঝেমধ্যে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে থাকার সুযোগে তিনি নিজেকে কেবল আন্দোলনেই সম্পৃক্ত রাখেননি, যথাযথ দিক-নির্দেশনাও দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে তিনি জেলে থেকেই তাতে একাত্মতা ঘোষণার জন্য অনশন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এ আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিচ্ছে- এমনটিই তিনি চেয়েছিলেন। ‘জনসমর্থন ছাড়া বিপ্লব হয় না- আমার দেখা নয়াচীন (পৃষ্ঠা ২৪) গ্রন্থে তিনি লিখেছেন। ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগেরই ছিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা তাদের হাতে ক্ষমতা দিতে চায়নি। দিনের পর দিন রাজপথের সংগ্রামের কারণে তারা অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য। আর এই আন্দোলন সংগঠনের প্রধান কৃতিত্ব ছিল দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের। সে-সময়ের সান্ধ্য দৈনিক ‘চাষী’ খবর দিয়েছিল এভাবেÑ আওয়ামী লীগ রাজপথের আন্দোলন জোরদার করতে থাকে। ৪ সেপ্টেম্বর ১৪৪ ধারা অমান্য করে প্রাদেশিক রাজধানীতে ক্ষুধার্থ মানুষের মিছিল বের হয়। গুলিতে কয়েকজন হতাহত হয়। গুলিতে নিহত একজনের লাশ নিয়ে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বিশাল মিছিল রাজপথ প্রদক্ষিণ করে।
প্রকৃতপক্ষে এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জনসমর্থনপুষ্ট ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে বের হয়ে আসেন। রাজপথের আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্র হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে প্রাদেশিক গভর্নর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানকে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান



পুরনো খবর